ড. শাহরিয়ার হোসেন
বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প আমরা সাধারণত বলি- বর্ধিত জিডিপি, দ্রুত ডিজিটাল সম্প্রসারণ এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভাষায়। কিন্তু এই দৃশ্যমান অগ্রগতির আড়ালে ধীরে ধীরে জমছে এক নীরব, বিপজ্জনক সঙ্কট- যা এখনো প্রাপ্য গুরুত্ব নিয়ে জনপরিসরে আসেনি।
দেশ আজ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। হাতে স্মার্টফোন, ঘরে টেলিভিশন, অফিসে কম্পিউটার- ডিজিটাল সংযোগ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির এক অন্ধকার দিক আছে, যেটি আমরা দেখতে চাই না কিংবা দেখতে পাই না।
ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য এখন দেশের দ্রুততম বর্ধনশীল বর্জ্য প্রবাহগুলোর একটি। প্রতি বছর লাখ লাখ টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে এবং ডিভাইসের ব্যবহার বাড়া ও আয়ু কমার কারণে এই পরিমাণ আরো দ্রুত বাড়ছে। ইলেকট্রনিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য সেই অদৃশ্য সঙ্কট, যা প্রতিদিন জমছে- নীরবে, দ্রুত এবং বিপজ্জনকভাবে। প্রশ্নটা সহজ : আমরা কি জানি, একটি পুরনো মোবাইল বা ভাঙা টেলিভিশন ফেলে দেয়ার পর সেটির কী হয়? উত্তরটা যতটা অস্বস্তিকর, বাস্তবতাও ততটাই কঠিন। এর সরল অর্থ একটাই- প্রযুক্তি যত দ্রুত ব্যবহার করছি, তত দ্রুত আমরা বিষ তৈরি করছি।
সাধারণ বর্জ্যরে মতো নয়, ই-বর্জ্যরে ভেতরে থাকে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ব্রোমিনেটেড ফ্লেম রিটার্ড্যান্টের মতো বিপজ্জনক উপাদান। এগুলো সহজে নষ্ট হয় না; বরং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, জমা হয়, এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি করে। বাংলাদেশে এই প্রক্রিয়া চলছে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে।
পরিবেশ : দূষণের অদৃশ্য বিস্তার, প্রকৃতির নীরব ক্ষয়
বাংলাদেশে ই-বর্জ্যরে বড় অংশ কোনো আধুনিক প্ল্যান্টে যায় না; এটি চলে যায় শহরের প্রান্তে, অগোছালো, অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্যে। সেখানে বর্জ্য আর বর্জ্য থাকে না- তা রূপ নেয় বিষে।
ঢাকার উপকণ্ঠে কিংবা অন্যান্য শহরের আশপাশে ছোট ছোট খোলা জায়গায় ভাঙা হয় কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফ্রিজ। সার্কিট বোর্ড আগুনে গরম করা হয়, প্লাস্টিক পোড়ানো হয়, তার থেকে তামা বের করতে ধোঁয়ার ভেতর কাজ চলে। এই দৃশ্যগুলো শুধু দারিদ্র্যের চিত্র নয়- এগুলো একটি পরিবেশগত বিপর্যয়ের সূচনা।
খোলা আগুনে পোড়ানোর ফলে যে ধোঁয়া তৈরি হয়, তাতে থাকে ডাইঅক্সিন ও ফিউরান- যা বাতাসে মিশে আশপাশের বসতিতে পৌঁছে যায়। মানুষ তা শ্বাসের সাথে গ্রহণ করে, গাছের পাতায় বসে, মাটিতে জমা হয়। এরপর শুরু হয় আরো গভীর প্রক্রিয়া।
ভারী ধাতু- সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে যায়। এই মাটিতেই হয় সবজি চাষ, ধান উৎপাদন। বিষাক্ত পদার্থ শিকড়ের মাধ্যমে ফসলের ভেতরে প্রবেশ করে। আমরা যে খাবার খাই, তার মধ্যেই ঢুকে পড়ে এই অদৃশ্য বিষ। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক এলাকায় করা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব স্থানের মাটি ও পলিতে বিষাক্ত ধাতুর মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক উপরে।
বৃষ্টির পানি এই দূষণকে থামায় না; বরং ছড়িয়ে দেয়। মাটির উপর জমে থাকা বিষ নদীতে যায়, খালে যায়, জলাভূমিতে গিয়ে মেশে। এই দূষণ কোনো এক জায়গায় থেমে থাকে না। এটি খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে, মাছ ও গবাদিপশুর শরীরে জমা হয় এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরে ফিরে আসে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা- নদীনির্ভরতা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা এই সঙ্কটকে আরো জটিল করে তোলে। এখানে কোনো দূষণ এক জায়গায় আটকে থাকে না। এটি চলাচল করে, বিস্তার লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত পুরো বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে।
এটি আর শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়- এটি প্রকৃতির ভেতরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়া এক নীরব বিষক্রিয়া। নদীনির্ভর, বন্যাপ্রবণ এবং কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে এই দূষণ কখনোই স্থানীয় সমস্যা থাকে না, এটি হয়ে ওঠে একটি জাতীয় সঙ্কট।
জনস্বাস্থ্য : নীরবে জমে ওঠা ঝুঁকি
ই-বর্জ্যরে স্বাস্থ্যঝুঁকি তাৎক্ষণিকভাবে চোখে পড়ে না- এটিই এই সঙ্কটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক। অনানুষ্ঠানিক রিসাইক্লিং খাতে কাজ করা শ্রমিকরা সরাসরি এই ঝুঁকির মুখে থাকে। কোনো সুরক্ষা ছাড়া তারা বিষাক্ত ধোঁয়া শ্বাস নেয়, খালি হাতে ক্ষতিকর পদার্থ স্পর্শ করে এবং ধীরে ধীরে শরীরে জমা করে মারাত্মক ধাতু।
অনেক ক্ষেত্রেই এই শ্রমিকরা শিশু-দারিদ্র্য ও বিকল্প আয়ের অভাবে এই কাজে জড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের সংস্পর্শের ফলে দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ, স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি (বিশেষত সিসা ও পারদের কারণে), কিডনি ও লিভারের জটিলতা, ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
কিন্তু ক্ষতি শুধু শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এসব এলাকার আশপাশে বসবাসকারী মানুষ প্রতিনিয়ত দূষিত বাতাস, পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে কম মাত্রার বিষাক্ততার শিকার হচ্ছেন। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি- তাদের শরীর দ্রুত বিষ শোষণ করে এবং এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও প্রায়ই অপরিবর্তনীয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- এই স্বাস্থ্যঝুঁকির কোনো সুসংগঠিত নজরদারি নেই। রোগ ধরা পড়ে না, তথ্য তৈরি হয় না, ফলে সঙ্কটটি রাষ্ট্রীয় পরিসংখ্যানে প্রায় অদৃশ্য থেকে যায়। এটি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়- এটি একটি ধীরগতির জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়।
নীতিগত ঘাটতি : কাগজে নীতি, বাস্তবে শূন্যতা
বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা, কৌশলপত্র, এমনকি আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। কাগজে-কলমে সবকিছু যথেষ্ট সুসংহত দেখায়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অন্য গল্প বলে- একটি ভাঙা শৃঙ্খল, যেখানে নীতি শুরু হয়; কিন্তু প্রয়োগে এসে থেমে যায়।
ঢাকার উপকণ্ঠে বা দেশের বিভিন্ন জেলায় চোখ রাখলেই দেখা যায়- খোলা আকাশের নিচে পুরনো সার্কিট বোর্ড পোড়ানো হচ্ছে, অ্যাসিড দিয়ে ধাতু আলাদা করা হচ্ছে, শিশুরাও সেই কাজে জড়িয়ে পড়ছে। এখানে কোনো সুরক্ষা নেই, নেই কোনো পরিবেশগত মানদণ্ড। প্রশ্নটা তাই সরল- নীতি কি সত্যিই মানুষের জীবন বদলাচ্ছে, নাকি শুধু নথিতে সীমাবদ্ধ?
এই ব্যর্থতার পেছনে কাঠামোগত কারণগুলো স্পষ্ট। প্রথমত, আধুনিক ও নিরাপদ রিসাইক্লিং অবকাঠামোর ঘাটতি। যেখানে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাই নেই, সেখানে মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভর করবেই। দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা- পরিদর্শন সীমিত, জরিমানা অনিয়মিত, আর জবাবদিহি প্রায় অনুপস্থিত। তৃতীয়ত, উৎপাদকদের দায়বদ্ধতা কার্যত শূন্য। একটি পণ্য বাজারে বিক্রি হওয়ার পর তার ‘শেষ জীবন’ নিয়ে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই- যা বিশ্বজুড়ে Extended Producer Responsibility (EPR) নামে পরিচিত, সেটি এখানে এখনো শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
চতুর্থত, এই খাতের মানবিক বাস্তবতা- হাজার হাজার মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এই অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার সাথে। বিকল্প আয়ের পথ না দেখিয়ে শুধু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা বাস্তবে কার্যকর হয় না; বরং আরো অদৃশ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ চর্চার জন্ম দেয়।
ফলে একটি বিপজ্জনক স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে- ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও তা মেনে নেয়া। নীতি ও বাস্তবতার এই ফাঁক যতদিন থাকবে, ততদিন ই-বর্জ্য শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, একটি শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেই রয়ে যাবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা : সম্ভাবনা নষ্ট, ক্ষতি বাড়ছে
ই-বর্জ্যকে আমরা প্রায়শই শুধু ‘বর্জ্য’ হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি একটি চলমান খনি- শহরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মূল্যবান সম্পদের ভাণ্ডার। একটি পুরনো মোবাইল ফোনে সোনার ক্ষুদ্র অংশ, তামা, কোবাল্ট, অ্যালুমিনিয়াম- সবই রয়েছে, যা সঠিক প্রযুক্তি দিয়ে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এই খাতকে ‘urban mining’ হিসেবে দেখছে- একটি টেকসই অর্থনীতির অংশ হিসেবে। সেখানে ই-বর্জ্য থেকে সংগৃহীত ধাতু নতুন পণ্যের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, আমদানিনির্ভরতা কমাচ্ছে, কর্মসংস্থান তৈরি করছে।
বাংলাদেশে চিত্রটা উল্টো। এখানে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া অদক্ষ, প্রযুক্তিহীন এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। ফলে যে সম্পদ অর্থনীতিতে ফিরে আসার কথা, তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে বিষাক্ত পদার্থ ছড়িয়ে পড়ছে মাটি, পানি ও বাতাসে- যার খরচ বহন করতে হচ্ছে জনস্বাস্থ্য খাতে।
অর্থাৎ- আমরা দ্বিগুণ ক্ষতির মধ্যে পড়ছি। একদিকে সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছি, অন্যদিকে দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আর্থিক বোঝা বাড়াচ্ছি। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি।
করণীয় : বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত পরিবর্তন
এই সঙ্কটের সমাধান কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি- যেখানে নীতি, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং মানবিক বাস্তবতা একসাথে বিবেচনায় নেয়া হবে।
প্রথমত, অনানুষ্ঠানিক খাতকে শত্রু নয়, অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাদের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। এতে কর্মসংস্থান রক্ষা পাবে, একই সাথে ঝুঁকিও কমবে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদকদের জন্য বাধ্যতামূলক Extended Producer Responsibility চালু করতে হবে। পণ্য বিক্রির পর তার সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির দায় তাদের ওপরই থাকতে হবে। এতে বাজার নিজেই একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করবে।
তৃতীয়ত, আধুনিক রিসাইক্লিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগ জরুরি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে। প্রযুক্তি ছাড়া এই খাত কখনোই নিরাপদ বা লাভজনক হবে না।
চতুর্থত, সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য বর্জ্য জমা দেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে- সংগ্রহ কেন্দ্র, প্রণোদনা, এমনকি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে।
সবশেষে, আইন প্রয়োগকে ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান করতে হবে। একবার অভিযান চালিয়ে থেমে গেলে হবে না- নিয়মিত মনিটরিং, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শেষ কথা : উন্নয়নের পথ কোন দিকে?
বাংলাদেশ আজ একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি- উন্নয়ন কি শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান, নাকি মানুষের জীবন ও প্রকৃতির সুরক্ষার সাথে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি?
ই-বর্জ্য আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটিই স্পষ্ট করে তোলে। এটি আর কোনো দূরের সঙ্কট নয়- এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ, আমাদের ব্যবহৃত প্রযুক্তির অবশিষ্ট ছায়া। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে- বাতাসে, পানিতে, মাটিতে, এমনকি মানবদেহে।
সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই। কারণ দেরি হলে, এই সঙ্কট শুধু পরিবেশকে নয়- আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকেও গ্রাস করবে।
লেখক : পরিবেশবিজ্ঞানী