ভোলা জেলার আলোচিত মনপুরা উপজেলায় মাছঘাটের ইজারা নিয়ে প্রকাশ্যে দিনের বেলা কয়েকশ মানুষের সামনে নির্মম অত্যাচারে ৪টি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এ মামলার রায়ে হতবাক স্বজনরা।
মঙ্গলবার ৫১ জন আসামির মধ্যে মাত্র একজনের যাবজ্জীবন ও ৫০ জনকে খালাস দিয়েছেন চরফ্যাশন চৌকি আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. শওকত হোসাইন।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামির নাম মো. ফারুক (ফারুক দালাল)। তিনি দ্বিতীয় চার্জশিটের প্রথম আসামি ছিলেন।
২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টায় মনপুরা উপজেলার চর নিজাম মাছঘাট এলাকায় ওই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন ঘাট ইজারাদার মো. আবু তাহের (হাজি আবু তাহের), মাছ ব্যবসায়ী ইউছুফ দালাল, ট্রলার চালক আলম সেরাং, আহত আবু তাহের আশ্রয় দেওয়ায় পিটিয়ে আহত করা জাহানারা বেগম।
ঘটনার ২২ বছর পর মামলার রায় শুনে অবাক ও হতাশ হয়েছেন নিহত আবু তাহেরের স্ত্রী ৭০ বছর বয়সি রিজায়া বেগম, মামলার বাদীর মেয়ে আলো বেগম, ইউছুফ দালালের স্ত্রী মোসাম্মৎ রাবেয়া বেগম। তারা সঠিক বিচার পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এপিপি মো. হযরত আলী হিরন যুগান্তরকে জানান, সাক্ষী না থাকায় ৫০ জন খালাস পেয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী কেউ সাক্ষী দেননি। যারা দিয়েছেন, কেবল তারা শুনেছেন বলেছিলেন। একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী ছিলেন নিহত জাহানারা বেগমের মেয়ে তাছনুর বেগম। তার বর্ণনায় দুই রকম হওয়ায় কেবল একজনের যাবজ্জীবন দিয়েছেন বিচারক। ৫০ জনই মুক্তি পেয়ে যান। এদিকে নিহত ৪ পরিবারের সন্তানরা জানান তারা আপিল করবেন। তারা ন্যায়বিচার পাননি।
ভোলা জেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) শেখ মামুন জানান, চরনিজাম ও চরফ্যাশন শ্যামরাজ ঘাটে দাদন ব্যবসায়ীদের হাত থেকে সাধারণ জেলেদের রক্ষায় হাজি আবু তাহের মনপুরা উপজেলার সর্ব বৃহৎ মাছঘাটখ্যাত চর নিজাম ঘাটের ইজারা নেন। ইজারা নেওয়ার পর ওই ঘাটে জেলেদের কোনো কর দিতে হবে না, দাদনে সুদ নেওয়া হবে না, নদীতে ট্রলার নিয়ে মাইকে এমন ঘোষণা দেন হাজি আবু তাহের। বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি প্রভাবশালী ইউপি চেয়ারম্যানসহ দাদন ব্যবসায়ীরা।
২০০৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ট্রলারযোগে মাইকিং করতে করতে ঘাটে এলেই চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা তাড়া করে আবু তাহেরের ট্রলারকে। আবু তাহের তার ট্রলার নিয়ে দ্রুত পাশের লতাখালি ঘাটে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেও শতাধিক সন্ত্রাসী তাদের ঘিরে ধরে। ওই ঘাটের পাশে আত্মীয় জাহানারা বেগমের ঘরে আশ্রয় নেওয়া আবু তাহেরকে ধরে এনে পিটিয়ে আহত করার পর তারের ব্রাশ দিয়ে শরীরের চামড়া তুলে তাতে লবণ দেওয়া হয়। পরে ট্রলারের মাছ রাখার খোলে বরফ দিয়ে চাপা দিয়ে ওই ট্রলারসহ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে হত্যা করা হয় ইউছুফ দালালকেও।
হাজি আবু তাহেরকে হত্যার জন্য ইউপি চেয়ারম্যানের লেখা চিঠি আদালতে উপস্থাপন করা হলেও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী জানান, ওই চিঠি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিখেছেন এটা প্রমাণ করা যায়নি। তাই আদালত তা গ্রহণ করেননি।
জাহানারা বেগমের মেয়ে জানান, তার চোখের সামনে তার মাকে মারধর করা হয়েছে, তার খালু হাজি আবু তাহেরকে হত্যা করা হয়, অথচ আদালত তাদের খালাস দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পরে হলেও তারা ন্যায়বিচার পাবেন- এমনটা আশা করেছিলেন; কিন্তু বিচার পাননি। আসামিদের ভয়ে সাক্ষীরা মুখ খুলতে সাহস পাননি।