মধ্যপ্রাচ্যের অচলাবস্থা দেশের জ্বালানি সংকটকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আসন্ন ঈদযাত্রায়। পণ্য পরিবহণও হুমকির মুখে। পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না বাস, ট্রাক ও লঞ্চ মালিকরা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষও (বিআইডব্লিউটিএ) পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছে না। আশঙ্কা করা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের এই সংকট অব্যাহত থাকলে ঈদে পরিবহণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। এতে ঘরমুখী মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরির শঙ্কা রয়েছে। প্রভাব ফেলতে পারে পণ্য পরিবহণেও। বাজারের বেশির ভাগ পণ্য ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে পরিবহণ করা হয়। এছাড়া ট্রেন এবং দক্ষিণাঞ্চলসহ অনেক জেলার পণ্য পরিবহণ করা হয় নৌরুটে।

পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের অভাবে এখন পর্যন্ত বাস, লঞ্চ বা ট্রেনের ট্রিপ বাতিল হয়নি। তবে এসব পরিবহণে যে পরিমাণ তেলের প্রয়োজন হয়- তা পাচ্ছেন না তারা। লম্বা সময় কেটে যাচ্ছে তেল সংগ্রহে। ঈদযাত্রায় মাঝপথে গাড়িতে তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হলে বাসের অনেক ট্রিপ বাতিল করতে হবে। কারণ ঈদে একই দিনে একটি বাস একাধিক ট্রিপ দিয়ে থাকে।

ঈদ সামনে রেখে ১৮ মার্চ থেকে শুরু হচ্ছে সরকারি ছুটি। মূলত ওইদিন থেকে ঈদ পর্যন্ত ঘরমুখো মানুষের ভিড় শুরু হবে। ঈদের পর আবার গ্রাম থেকে ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় নিজ কর্মস্থলে ফিরবেন যাত্রীরা। এই পুরো সময়টা যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, দূরত্ব যতটুকু হোক, গাড়ি চালাতে তেলের বিকল্প নেই। কিন্তু তেল নিয়ে যা শুরু হয়েছে- তা অবশ্যই সংকট। বিষয়টি নিয়ে আমরা সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখছি। সরকারকে অনুরোধ করেছি- যেন ঈদে যে কোনো অবস্থায় তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়। সবাই যেন ঈদের উৎসব নির্বিঘ্নে করতে পারে। তেলের কারণে যাত্রীদের যেন ঈদযাত্রায় ভোগান্তি না হয়। বিষয়টি নিয়ে সরকার আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছে-ঈদের আগে-পরে কোনো সংকট হবে না। আমরা আপাতত সরকারের কথায় আশ্বস্ত হয়েছি। মহাখালী বাস মালিক সমিতির কার্যকরি সভাপতি আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, আমরা সব পাম্পে এবং সব জায়গায় জ্বালনি তেল পাচ্ছি না। ঢাকায় পেলেও ফেরার পথে যে পরিমাণ তেল দরকার- তা পাওয়া যাবে কিনা এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। আমরা চাই সরকার দ্রুত সমাধান করবে। শেষ পর্যন্ত সরকার কি সিদ্ধান্ত নেবে-তা আমরা দুই-তিন দিন দেখব। এরপর আমরা আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করব। নইলে যাত্রীদের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।

পরিবহণসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে বলে আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন মিলছে না। পাম্পগুলোতে তেল নিতে ট্রাক ও বাসের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। কোথাও লাইন দুই থেকে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত। ঢাকার আশপাশের পাম্পগুলোতে তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক ও বাসচালকদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক স্থানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি তাদের। ড্রাইভারদের কাছ থেকে টাকা পয়সা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক মালিক ও ড্রাইভাররা রাস্তায় নামতে চাচ্ছে না। ফলে ঝুঁকি বিবেচনায় অনেক চালক দূরপাল্লার রুটে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মনির তালুকদার যুগান্তরকে বলেন, একদিকে রমজান, অন্যদিকে ঈদ, এই সময়ে তেলের সংকট ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি করছে। ঘণ্টা পর ঘণ্টা সিরিয়াল দিয়ে অনেকে তেল পাচ্ছেন না।

তেলের সংকট নৌযাত্রায় : এদিকে, জ্বালানি তেলের সংকট নৌযাত্রায় পড়তে যাচ্ছে বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো তেল পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এমনকি সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহণ কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছে না। এ দুটির সংস্থার প্রধান ইতোমধ্যে বিষয়টি নৌ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।

লঞ্চ মালিকেরা জানান, পদ্মা সেতু চালুর পর নৌপথে যাত্রী কমে গেছে। তবে ঈদ এলে নৌপথে যাত্রী সংখ্যা বাড়ে। এই ঈদ মৌসুমে জ্বালানি সংকটে যাত্রী পরিবহণ করতে পারবেন কীনা- এ নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় আছেন। সুন্দরবন-১৫ লঞ্চের ম্যানেজার দুলাল সোমবার দুপুরে যুগান্তরকে জানান, ওই লঞ্চটি ঢাকা থেকে পটুয়াখালী যাবে আবার ঢাকায় ফিরে আসবে। এজন্য চার হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। কিন্তু তিনি তিন হাজার ৪০০ লিটার ডিজেল পেয়েছেন। বাকি এক হাজার লিটার তেলের জন্য বিভিন্ন জায়গায় ধর্না দিচ্ছেন। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত তেল পাওয়া না গেলে লঞ্চ ছাড়া যাবে না। কারণ তেলের অভাবে মাঝপথে লঞ্চ বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হবে।

এদিকে বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, উদ্ধারকারী জাহাজ, ড্রেজার ও সহায়ক অন্যান্য জাহাজ পরিচালনার জন্য জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয়। সংস্থাটির ২১ লাখ লিটার রিজার্ভ রাখার সক্ষমতা আছে। বর্তমানে সংস্থাটির কাছে ৫ থেকে ৬ লাখ লিটার তেল মজুদ রয়েছে। আরও ১২ লাখ লিটার তেল সরবরাহের জন্য পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু ওই তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে যে মজুত রয়েছে তাতে মার্চ মাস চলবে।

কর্মকর্তারা জানান, দেশে ফেরি রুট, উপকূলীয় এলাকায় জাহাজ পরিচালনা করতে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন। কিন্তু তাদের চাহিদা অনুযায়ী সরকার তেল সরবরাহ করছে না। এতে ফেরি চলাচল বন্ধের আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকটি রুটের সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews