যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের ওপর আস্থা হারিয়ে এশীয় অঞ্চলের দেশগুলো এখন বিকল্প প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। ফিলিপাইনের ব্রহ্মোস মিসাইল মোতায়েন থেকে শুরু করে দক্ষিণ কোরিয়ার ফাইটার জেটের দিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দ্রুত ঝুঁকে পড়ার ঘটনাটি ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির টালমাটাল অবস্থাকেই স্পষ্ট করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে সিঙ্গাপুরে শুরু হওয়া এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা সম্মেলন ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ এবার পরাশক্তিগুলোর শক্তি প্রদর্শনের মঞ্চ থেকে কৌশলগত আত্মরক্ষার এক বড় বাজারে পরিণত হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে একের পর এক সংঘাত, পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে তৈরি হওয়া গভীর সংশয়ের কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা কৌশল নতুন করে সাজাতে বাধ্য হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) আয়োজিত তিন দিনের এই সম্মেলনটি দীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলের নিরাপত্তা আলোচনার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসলেও এবারের আয়োজনটি এক অত্যন্ত নাজুক ও সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সম্মেলনের মূল মঞ্চে আগত বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষা প্রধানদের আনুষ্ঠানিক ভাষণগুলো মনোযোগ কাড়লেও, এবারের ফোরামের প্রকৃত তৎপরতা ও দরকষাকষি চলছে হোটেলের করিডোর এবং রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলোতে। বিশ্বজুড়ে নানা প্রান্তে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া ওয়াশিংটনের কারণে আঞ্চলিক খেলোয়াড়রা তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে এবং বিকল্প উৎস খুঁজতে এই বন্ধ দরজার পেছনের আলোচনাগুলোকেই বেছে নিচ্ছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সংলাপের মূল চিন্তার বিষয় হলো ওয়াশিংটন কি আদৌ একসঙ্গে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি না। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে যাওয়া ইরানের সংঘাতের অনিষ্পন্ন ফলাফল এই সন্দেহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্র ও নিরপেক্ষ রাষ্ট্র উভয় পক্ষই মার্কিন নিরাপত্তা গ্যারান্টির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামো মার্কিন মিত্রদের যে ধরনের নিরেট আশ্বাসের প্রয়োজন ছিল তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই কৌশলগত প্রভাবের কারণে ছোট-বড় সব দেশই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হবে, যা শেষ পর্যন্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে কোনো একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল না করে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দিকে ধাবিত করবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনীতিকদের মধ্যে বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির অননুমেয় ও বারবার পরিবর্তনশীল রূপ। ওয়াশিংটন মুখে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার বললেও কাজে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যকে স্থিতিশীল করতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্পদ সরিয়ে নিচ্ছে এবং তাইওয়ানে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে বিলম্ব করছে।

এই দোদুল্যমান পরিস্থিতির কারণে আঞ্চলিক অস্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লব তরান্বিত হচ্ছে। মার্কিন হার্ডওয়্যার বা যুদ্ধাস্ত্রের জন্য অপেক্ষা না করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত তাদের অস্ত্রাগার বহুমুখী করছে, যার বড় উদাহরণ হলো ফিলিপাইনে ইন্দো-রুশ ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলের মোতায়েন এবং একই পথ অনুসরণে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন।

আমেরিকার তৈরি করা এই ভূ-রাজনৈতিক শূন্যস্থান পূরণে জাপানের আগ্রাসী মনোভাব এখন বেইজিংয়ের জন্য নতুন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার দেশগুলো এখন বুঝতে পারছে যে পরাশক্তিগুলোর অনির্ভরযোগ্যতার এই যুগে আত্মনির্ভরশীলতাই একমাত্র টেকসই কৌশল, যা এবারের শাংরি-লা সংলাপে এক খণ্ডিত ও নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার রূপরেখা উন্মোচন করছে।

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ

বিডি প্রতিদিন/এনএইচ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews