আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং আকাশপথের সীমাবদ্ধতার প্রভাব এবার সরাসরি পড়েছে কানাডা-ভারত বিমান চলাচলে। ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া তাদের কানাডাগামী একাধিক ফ্লাইট কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে দুই দেশের লাখো যাত্রী, বিশেষ করে ভারতীয় বংশোদ্ভুত কানাডীয়দের জন্য ভ্রমণ আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে।
এয়ার ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ক্যাম্পবেল উইলসন কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক অভ্যন্তরীণ বার্তায় জানিয়েছেন, জেট ফুয়েলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিল ও মে মাসে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পরিসর ছোট করা হয়েছে। একই সঙ্গে জুন ও জুলাই মাসেও আরও ফ্লাইট কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
- Advertisement -
উইলসনের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিই নয়, কিছু আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক রুটে বিমানের পথ দীর্ঘ হয়েছে। এতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক রুট অলাভজনক হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকামুখী দীর্ঘ দূরত্বের ফ্লাইটগুলো এখন এয়ারলাইন্সটির জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে।
এভিয়েশন ডেটা ট্র্যাকার সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাসে টরন্টো ও দিল্লির মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার ৪৮টি রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইট নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মে মাসে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১টিতে। অর্থাৎ, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩৫ শতাংশ ফ্লাইট কমেছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে ভ্যানকুভার-দিল্লি রুটেও। বছরের শুরুতে যেখানে প্রতিদিন সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করত এয়ার ইন্ডিয়া, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে সপ্তাহে প্রায় পাঁচটিতে। এতে পশ্চিম কানাডার যাত্রীদের জন্য বিকল্প অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়েছে।
ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে টিকিটের দামে। কানাডা ও ভারতের মধ্যে যাতায়াতকারী যাত্রীরা এখন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছেন। ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে কানাডা-দিল্লি রুটে ইকোনমি শ্রেণির রাউন্ড ট্রিপ ভাড়া গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম ছিল। তবে এপ্রিলের শেষ নাগাদ পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন গড় ভাড়া ২৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৯৬৩ কানাডিয়ান ডলারে। চাহিদা অপরিবর্তিত থাকলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন ছুটি, পারিবারিক সফর এবং শিক্ষার্থীদের যাতায়াত মৌসুম সামনে থাকায় আগামী মাসগুলোতে ভাড়া আরও বাড়তে পারে।
২০২১ সালের কানাডিয়ান জনশুমারি অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ১৪ লাখ ভারতীয় বংশোদ্ভুত মানুষ বসবাস করেন। ফলে ভারত-কানাডা রুট শুধু একটি আন্তর্জাতিক ভ্রমণপথ নয়, এটি পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগেরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে দেখা করা, ব্যবসায়িক কাজ, শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেক যাত্রী বাধ্য হচ্ছেন দীর্ঘ ট্রানজিট বা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল বিকল্প রুট বেছে নিতে। টরন্টোভিত্তিক এক ট্রাভেল পরামর্শক বলেন, “আগে যাত্রীরা সহজেই সরাসরি ফ্লাইট পেতেন। এখন অনেক ক্ষেত্রে দুবাই, লন্ডন বা ইউরোপের অন্য শহর হয়ে যেতে হচ্ছে। এতে সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।”
বর্তমানে এয়ার কানাডা দিল্লি থেকে টরন্টো রুটে দৈনিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভ্যানকুভার-দিল্লি সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত করার পর এখনো সেটি পুরোপুরি পুনরায় চালু হয়নি। ফলে পশ্চিম কানাডার যাত্রীদের জন্য বিকল্প আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাজারে প্রতিযোগিতা কম থাকায় টিকিটের দাম বাড়ার প্রবণতা আরও তীব্র হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
বিশ্বজুড়ে জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির পেছনে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক আকাশপথে নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কিছু আকাশসীমা এড়িয়ে চলতে হওয়ায় অনেক আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের উড়ান সময় বেড়ে গেছে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে এবং বিমানের পরিচালন দক্ষতাও কমে যাচ্ছে। যদি জ্বালানির বাজার দ্রুত স্থিতিশীল না হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো আরও রুট কমাতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক বিমান ভ্রমণ খাত নতুন করে চাপের মুখে পড়বে।
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট কমানোর সিদ্ধান্ত শুধু একটি করপোরেট পদক্ষেপ নয়; এটি আন্তর্জাতিক বিমান শিল্পের বর্তমান সংকটেরও প্রতিফলন। আর এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর, যাদের জন্য এখন আকাশপথের ভ্রমণ দিন দিন আরও ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
- Advertisement -