নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার সরকারি পরিকল্পনাকে বাস্তবসম্মত নয় বলে অভিমত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, সব শিক্ষার্থীর জন্য একই ধরনের কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি এই স্তরে এর প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নসাপেক্ষ। তারা বলেন, বৃত্তিমূলক (Vocational) ও কারিগরি (Technical) শিক্ষার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে এই দুই ধারণাকে এক করে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক পেশায় আগ্রহী করতে বর্তমানে ‘জীবন ও জীবিকামুখী শিক্ষা’ নামে যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেটি আরও কার্যকর করাই বেশি বাস্তবসম্মত। নতুন নামে পুরোনো বিষয় উপস্থাপন না করে বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়নেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, সরকার নতুন শিক্ষাক্রমে ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষাসহ যেসব বিষয় যুক্ত করার কথা বলছে, তার অনেক কিছুই বাস্তবে নতুন নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এসব উপাদান দীর্ঘদিন ধরেই পাঠ্যক্রমে রয়েছে। ফলে এগুলোকে একেবারে নতুন উদ্যোগ হিসাবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়।
কারিগরি শিক্ষা চতুর্থ শ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা এক নয়। বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে কৃষিকাজ, পশুপালন, দর্জি কাজ বা অন্যান্য জীবিকাঘনিষ্ঠ দক্ষতার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা হয়। অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষা তুলনামূলক উচ্চস্তরের প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, যা সাধারণত পলিটেকনিক বা ডিপ্লোমা পর্যায়ে দেওয়া হয়।
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ‘জীবন ও জীবিকামুখী শিক্ষা’ চালু রয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পেশা ও দক্ষতাভিত্তিক কাজ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়। তবে সেখানে সরাসরি কোনো কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না; বরং ভবিষ্যতে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, সরকার যদি সত্যিই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে শক্তিশালী করতে চায়, তবে বিদ্যমান ব্যবস্থার উন্নয়নই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নাম দিয়ে নতুন কাঠামোর চেয়ে বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষা কোনো আলাদা বিষয় হিসাবে না এনে পুরো শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করা উচিত। তিনি বলেন, আনন্দময় শিক্ষা মানে শুধু নতুন একটি বিষয় যুক্ত করা নয়; বরং পাঠ্যক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ এবং মূল্যায়ন-সব ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের জন্য চাপমুক্ত ও আনন্দদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, নৈতিকতা ও মূল্যবোধও আলাদা বিষয় হিসাবে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি বিষয়ের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব-গণিত, বাংলা, ইংরেজি বা বিজ্ঞান সব বিষয়েই তা প্রতিফলিত হতে পারে।
অধ্যাপক মজিবুর রহমান আরও বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের আগে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় শিক্ষা নীতি নির্ধারণ করা জরুরি। শিক্ষা সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে শিক্ষার লক্ষ্য, পাঠ্যক্রম কাঠামো, কারিগরি শিক্ষা, তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন।
কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের বিষয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, দেশের অনেক বিদ্যালয়ে এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এসব বিবেচনায় না নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষাব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এসব উদ্যোগ সফল করতে হলে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে দক্ষ শিক্ষক তৈরি ও যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করা হলে এসব সংস্কার কার্যকর হবে না।
দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী ও বাস্তবমুখী করতে ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চারটি নতুন বিষয় (ক্রীড়া, সংস্কৃতি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’) যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।