আধুনিক জীবনের অস্থির দৌড়ঝাঁপ যেন থামার নামই জানে না। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, দায়িত্বের চাপ ও অগণিত প্রত্যাশার ভারে মানুষ ক্রমেই নিজের ভিতরের স্থিরতা হারিয়ে ফেলছে। চারপাশের শব্দ, সংবাদ, প্রতিযোগিতা ও উৎকণ্ঠা আমাদের অন্তর্গত শান্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এমন এক সময়ে মানুষ থেমে দাঁড়াতে চায়-নিজেকে শুনতে চায়, নিজের অন্তর্দৃষ্টির কাছে ফিরে যেতে চায়।
এই সন্ধিক্ষণে আমাদের পথ দেখাতে পারে প্রাচীন চীনের মহান দার্শনিক লাও জু এবং তাঁর অমর গ্রন্থ তাও তে চিং। এটি শুধু একটি দর্শনগ্রন্থ নয়; এটি এক জীবনবোধের আলো, যা আজও মানুষকে শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মিলিয়ে, জোরজবরদস্তি ছাড়াই, সহজ ও স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা যায়। এর প্রতিটি বাণী যেন নীরব বাতাসের মতো হৃদয়ে প্রবাহিত হয়, মানুষের ভিতরের জটিলতা সরিয়ে দিয়ে জানিয়ে দেয়, জীবনের গভীর সত্য লুকিয়ে আছে সরলতার মধ্যেই।
লাও জুর দর্শন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জীবনের প্রতিটি সংকট ও অস্থিরতা আসলে আমাদের প্রজ্ঞার পরীক্ষা। আমরা যখন প্রকৃতির প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করি, যখন হৃদয় ও মনকে প্রশান্তির পথে ছেড়ে দিই, তখন অনেক জটিলতাই আপনা-আপনি মুছে যায়। জীবন তখন আর শুধু টিকে থাকার সংগ্রাম নয়; বরং হয়ে ওঠে এক ছন্দময় যাত্রা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তের সৌন্দর্য ধরা পড়ে। তাও তে চিং-এর অন্যতম মৌলিক ধারণা হলো উ ওয়ে-অর্থাৎ জোর না করেও কাজ সম্পন্ন করার পথ। আধুনিক মানুষ মনে করে, সাফল্যের জন্য অবিরাম সংগ্রাম, চাপ ও অতিরিক্ত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। কিন্তু লাও জু শেখান, প্রকৃত শক্তি আসে স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মধ্য দিয়ে।
নদীর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। নদী কখনো পাথরের সঙ্গে যুদ্ধ করে না; সে মৃদু স্রোতে বাঁক নিয়ে এগিয়ে যায়। বাধাকে ঘিরেই সে নিজের পথ তৈরি করে। উ ওয়ে ঠিক তেমনই-সংঘর্ষ নয়, বরং সামঞ্জস্যই জীবনের প্রকৃত কৌশল। এই দর্শন আমাদের জানায়, অতিরিক্ত চাপ মানসিক ক্লান্তি বাড়ায়, কিন্তু সহজতা মনকে স্থির রাখে। যখন আমরা স্বাভাবিক ছন্দে কাজ করি, তখন লক্ষ্য অর্জন হয় আরও সুচারুভাবে। উ ওয়ে কোনো নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি হলো সচেতনভাবে প্রকৃতির সঙ্গে সুর মেলানোর শক্তি।
তাওবাদী দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সরলতা। আধুনিক মানুষ ভাবে-যত বেশি তথ্য, তত বেশি জ্ঞান। কিন্তু বাস্তবে গভীর উপলব্ধি আসে কম অথচ অর্থবহ বোধ থেকে। লাও জু বলেন, প্রকৃত জ্ঞান কখনো জটিল নয়। সরলতা মানে অজ্ঞতা নয়; বরং অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি ছেঁটে ফেলে জীবনের মূল সত্যে পৌঁছানো। যখন চিন্তা সরল হয়, দৃষ্টি পরিষ্কার হয়, তখন মানুষ সহজেই বুঝতে পারে কোন বিষয়টি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। নিরিবিলি সকালে নদীর ধারে বসে প্রকৃতিকে দেখার মতো-যখন মন তথ্যের ভারে জর্জরিত থাকে, তখন সৌন্দর্য ধরা পড়ে না। কিন্তু শান্ত মন সবকিছু অনুভব করতে পারে। জীবনেও তাই, কম অথচ গভীর মনোযোগই এনে দেয় পরিপূর্ণতা। তাওবাদী দর্শনে নেতৃত্বের ধারণাও ব্যতিক্রমী। আধুনিক ধারণায় নেতা মানেই কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু তাও তে চিং-এ নেতা হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নিঃশব্দ প্রজ্ঞায় পথ দেখান।
প্রকৃত নেতা নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করেন না। তিনি আদেশে নয়, উদাহরণে নেতৃত্ব দেন। তাঁর উপস্থিতিই মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। এটি কোনো জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং এমন এক নীরব প্রভাব, যা মানুষের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের শেখায়-নেতৃত্ব মানে দাপট নয়, বরং স্থিরতা, নম্রতা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক।
পরিবার হোক বা কর্মক্ষেত্র-এ ধরনের নেতৃত্ব সমাজকে আরও সুসংহত ও মানবিক করে তোলে। জীবন আমাদের বারবার অস্থিরতার ঢেউয়ে নিক্ষেপ করে। কঠিন সময়ে শান্ত থাকা সহজ নয়। কিন্তু লাও জু শেখান-শান্তি আসে পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করে নয়, বরং তা গ্রহণ করার মাধ্যমে। ঝড়ের মাঝেও নদী যেমন তার পথ ছাড়ে না, মানুষও তেমনি স্থির থাকতে পারে-যদি সে প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে। বলপ্রয়োগ নয়, সামঞ্জস্যই জীবনের প্রকৃত শক্তি।
লাও জুর শিক্ষার সবচেয়ে বড় সত্য হলো, প্রকৃত প্রজ্ঞা কখনো পুরোনো হয় না। এটি মানুষকে শুধু চিন্তা করতে শেখায় না, অনুভব করতেও শেখায়। ছোট ছোট মুহূর্তেই শান্তি খুঁজে নিতে শেখায়। যে ব্যক্তি এই দর্শন হৃদয়ে ধারণ করে, সে শুধু সংকটে স্থির থাকে না; সে জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে, সম্পর্কের মূল্য বোঝে এবং নিজের অন্তর্গত শক্তিকে আবিষ্কার করে। কাজেই, তাও তে চিং আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের দৌড়ঝাঁপ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানসিক প্রশান্তি ও আত্মজ্ঞান চিরস্থায়ী। এই দর্শন আমাদের শুধু বাঁচতে শেখায় না; শেখায় সুন্দরভাবে বাঁচতে।
লেখক : আইনজীবী ও গবেষক