ভালোবাসা নিয়ে মানুষ সবচেয়ে বেশি কবিতা লেখে, আবার সবচেয়ে বেশি ঝগড়াও করে। কেউ বলে—ভালোবাসা মানেই নিঃস্বার্থ ত্যাগ, কেউ আবার চোখ রাঙিয়ে বলে—“ত্যাগ করতে করতেই তো জীবন শেষ!” এই দ্বন্দ্ব, হাসি-ঠাট্টা আর মজার তর্কের মধ্য দিয়েই  সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) অনুষ্ঠিত হলো এক ব্যতিক্রমী রম্য বিতর্ক। 

"কেমন তোমার ভালোবাসা” শিরোনামে বসুন্ধরা শুভসংঘ জাবি  শাখার আয়োজনে এই ব্যতিক্রমধর্মী বিতর্কে ভালোবাসার মতো আবেগঘন বিষয়কে একেবারে হালকা, রসাত্মক ও বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে উপস্থাপন করাই ছিল এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

আয়োজকরা জানান, আসন্ন ভালোবাসা দিবস ২০২৬ উদযাপনকে আরও রাঙিয়ে তুলতেই এই রম্য বিতর্কের আয়োজন। বিতর্কে অংশ মোট ৬ জন বিতার্কিক। নেন ৩ জন ছেলে ও ৩ জন মেয়ে। বিষয় একটাই- কেমন তোমার ভালোবাসা? তবে যুক্তির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় অভিজ্ঞতা, হাস্যরস আর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বাস্তব গল্প।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘ জাবি শাখার উপদেষ্টা নাহরিন ইসলাম খান, অধ্যাপক জাকির হোসেন এবং সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও শুভসংঘের উপদেষ্টা ড. নজরুল ইসলাম। গণিতের কঠিন সূত্রের শিক্ষক হলেও এদিন তাকে দেখা যায় বেশ হাসিখুশি মেজাজে।

সভাপতির বক্তব্যে ড. নজরুল ইসলাম বলেন, “গণিতে যেমন সমাধান একাধিক পথে আসতে পারে, ভালোবাসার ক্ষেত্রেও তেমনই। এখানে একক কোনো উত্তর নেই—এই বিতর্ক সেটাই সুন্দরভাবে দেখাবে বলে আশা করি। প্রেম সব মানুষের জীবনেই আসে, কিন্তু সেটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে সেটা ওই ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। বসুন্ধরা শুভসংঘের এমন আয়োজন ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার পাশাপাশি আনন্দের একটি দিন কাটানোর সুযোগ করে দিয়েছে।”

টসে জিতে প্রথমে কথা বলার সুযোগ পায় ছেলে দল। বসুন্ধরা শুভসংঘ জাবি শাখার  সাংগঠনিক সম্পাদক পরাণ চন্দ্র রায় নিজের বন্ধুর প্রেমকাহিনি দিয়ে শুরু করেন। তার ভাষায়, এক ‘খুব সাধারণ’ মেয়ে প্রেমে পড়ে পরে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে “ভুল করলেও কীভাবে দোষ স্বীকার না করতে হয়” সেটা শেখায়! “তুমি রেগে আছো?”-প্রশ্নের উত্তরে মেয়েটির ‘না’ শব্দটাই এত ভারী ছিল যে বন্ধুর তিন দিন ঘুম উড়ে যায়! শেষ পর্যন্ত ভুলটা কী জানে না, তবু ফুল-চকলেট নিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়। তার মতে, “মেয়েদের কাছে ভালোবাসা মানে-ভুলটা তুমি করো, রাগটা ওরা করে, আর সমাধান খুঁজে বেড়াও তুমি!”

প্রচার সম্পাদক রিফাত বিন নুর বলেন, মেয়েদের ভালোবাসা অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। প্রেমিকা কথা কম বললে ছেলেরা শত প্রশ্ন করে মন খারাপের কারণ খোঁজে। কিন্তু ছেলে চুপ থাকলে অভিযোগ আসে- সে আর আগের মতো ভালোবাসে না! তাই প্রশ্ন ওঠে- এ কেমন ভালোবাসা?

দপ্তর সম্পাদক জাদিদ বিন খালিদ নিজের সাবেক সম্পর্কের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার প্রেমিকা নিজেকে ‘খুব ম্যাচিউর’ বললেও রাগ করলে তিন ঘণ্টা অনলাইনে থেকেও রিপ্লাই দিত না। তার চাওয়া ছিল সামান্য যত্ন, খোঁজখবর আর চিঠির মতো কিছু আন্তরিকতা। কিন্তু যত্ন মানে ছিল রেস্টুরেন্ট, আর চিঠি মানে বিলের কাগজ!

এরপর মেয়ে পক্ষও ছাড় দেয়নি। বসুন্ধরা শুভসংঘ জাবি শাখার সদস্য জান্নাত খন্দকার বলেন, প্রেমের আগে ছেলেরা একেকজন কবি-দার্শনিক হয়ে যায়। ছন্দ, উপমা, রোমান্টিক লাইন-সবই থাকে। কিন্তু সম্পর্কে যাওয়ার কিছুদিন পর সেই কবিত্ব উধাও। তাই তার প্রশ্ন- এ কেমন ছেলেদের ভালোবাসা?

শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক সুমাইয়া আরিফা বলেন, ছেলেরা বলে “আমি যেমন আছি, তেমনই থাকো।” কিন্তু মেয়েরা সাজলে সন্দেহ, না সাজলে মন খারাপ-দুটোতেই সমস্যা! ফলে ভালোবাসার ভেতরেই তৈরি হয় অদ্ভুত দ্বন্দ্ব।

সবশেষে নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক প্রতিভা তঞ্চঙ্গা বলেন, ছেলেদের ভালোবাসা অনেকটা মোবাইল গেমের মতো-শুরুর লেভেলে ভীষণ মনোযোগ, সব নোটিফিকেশন বন্ধ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন লেভেল এলে পুরনো আগ্রহ কমে যায়। অভিযোগ করলে জবাব- “তুমি তো জানোই আমি কেমন!”

পুরো বিতর্কজুড়ে যুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে হাসি, ব্যঙ্গ আর ঠাট্টা। দর্শকরা কখনো হাততালি দিয়েছেন, কখনো হেসে গড়িয়ে পড়েছেন। একসময় মঞ্চ আর দর্শকের মধ্যেই যেন তৈরি হয় প্রাণবন্ত সংলাপ।

শাখার সাধারণ সম্পাদক সানজিদা খানম বলেন, “হাসির ছলে আমরা বর্তমান বাস্তবতার চিত্র দেখি। আগে ভালোবাসা ছিল চিঠিতে, এখন ভালোবাসা থাকে ‘Online – Last seen 2 days ago’-তে। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু ভালোবাসা আছে—ধরনটা শুধু ভিন্ন।”

সভাপতি প্রত্যাশা রানী বলেন,“এই বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে-ভালোবাসা শুধু অনুভূতি নয়, এটি দায়িত্ব, সম্মান ও মানবিকতার প্রতিফলন। এমন আয়োজন তরুণ সমাজকে আরও সচেতন ও মানবিক করে তুলবে।”

দীর্ঘ বিতর্ক শেষে যখন ফল ঘোষণার সময় আসে, দর্শকদের মধ্যেও ছিল তীব্র কৌতূহল- কে জিতবে? ছেলে পক্ষ নাকি মেয়ে পক্ষ? তবে বিচারকদের সিদ্ধান্ত ছিল ভিন্নধর্মী। ঘোষণা করা হয়- এই বিতর্কে কেউ হারেনি। ভালোবাসার মতো বিষয়কে জয়-পরাজয়ের খোপে ফেলা যায় না। তাই দুই পক্ষকেই যৌথভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

ভালোবাসাকে ঘিরে এমন হাস্যরসাত্মক কিন্তু ভাবনাপ্রসূত আয়োজন জাবি ক্যাম্পাসে এনে দেয় ভিন্ন স্বাদের এক আনন্দঘন বিকেল।

বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews