‘মা রে, দুইডা কথা কমু, আমি আর কথা কমু না রে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি, মরে যাচ্ছি।’ সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে পাঠানো ভয়েস মেসেজের এই কয়েকটি শব্দই এখন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের ময়না বেগমের কাছে সন্তানের শেষ স্মৃতি। এক আগুনেই নিভে গেছে তার দুই ছেলে মোহন ও সুমনের প্রাণ। বাড়িতে পাকা ঘর তুলে দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল তাদের। সেই স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সোফা কারখানার আগুনে। শুধু ময়না বেগমই নন, নওগাঁ ও নাটোরের অন্তত ১৬ ঘরে আজ একই মাতম। কারও একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে, কারও সদ্য বিয়ে করা স্বামী, কারও ৪০ দিন বয়সি শিশুর বাবা। সবাই গিয়েছিলেন সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে, ধারদেনা আর সুদের টাকায়। অনেকেরই দেশে ফেরার কথা ছিল এ বছরের শেষে; এখন তাদের লাশের অপেক্ষায় স্বজনরা।
স্থানীয় সময় রোববার দুপুরে রিয়াদের শিফা থানার মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় এই অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জন নিহত হন। এদের মধ্যে ১৩ জনের বাড়ি নওগাঁয়, বাকি তিনজন নাটোরের। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লাশের পরিচয় শনাক্তে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হবে; প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষাও করা হবে। এরপর স্বজনদের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে লাশ দেশে পাঠানোর বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং তাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানান, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ মিশনকে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ দূতাবাস জানায়, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাও উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কারখানাটির একমাত্র জীবিত কর্মী হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে তিনি চুল কাটানোর জন্য সেলুনে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে কারখানায় আগুন জ্বলতে দেখেন। হাবিবুরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের পরিচালনাধীন ওই কারখানায় মোট ১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজ করতেন। অগ্নিকাণ্ডে তাদের মধ্যে ১৬ জনই ঘটনাস্থলে মারা যান।
স্থানীয় সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা যায়, নিহতদের মধ্যে আটজন সরাসরি আগুনে পুড়ে এবং অপর আটজন ধোঁয়ায় শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যান। নিহতরা কারখানার একটি অংশে বসবাস করতেন।
দূতাবাস আরও জানায়, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের সবার পাসপোর্ট ও ইকামা পুড়ে গেছে। এ কারণে তাদের পরিচয় শনাক্তে বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
রিয়াদের শিফা থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ফয়সাল আলউতাইবি জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয়সংক্রান্ত ডকুমেন্ট নষ্ট হয়ে যাওয়ায় প্রথমে আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তাদের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হবে। সেটি সম্ভব না হলে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যু সনদ ইস্যু করবে। এরপর লাশগুলো সৌদি আরবে দাফন অথবা বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে নিহতদের পরিবারের লিখিত মতামতের ভিত্তিতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।
নওগাঁয় ১৩ নিহতের বাড়িতে শোকের ছায়া : নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, নিহতদের মধ্যে ১২ জন নওগাঁর আত্রাই উপজেলার, আরেকজন সদর উপজেলার। নিহতরা হলেন-আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের গাফ্ফারের ছেলে মোহন ও সুমন, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল হোসেন, মৃত বজলুর প্রামাণিকের ছেলে কলিম উদ্দিন, উদনপৈ গ্রামের মৃত ময়েন প্রামাণিকের ছেলে শেখ ফরিদ, ডুবাই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ ও মৃত বাদলের ছেলে সুমন, বোয়ালা গ্রামের হৃদয়, খরস্রোতা গ্রামের আব্দুল জলিল, মজনুর ছেলে মজিদুল, সাদনগর গ্রামের আজাহারের ছেলে সাগর ও মধ্য বোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ এবং নওগাঁ শহরের পারনওগাঁ পুরাতন রেজিস্ট্রি অফিস পাড়ার মৃত মজনুর ছেলে শাহিন।
গন্ডগোহালী গ্রামে মোহন ও সুমনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাদের বাবা গাফ্ফার ও মা ময়না বেগম আহাজারি করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন স্বজন তাদের বাতাস করছেন আর সান্ত্বনা দিচ্ছেন। এই দম্পতি জানান, সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে সাত বছর আগে বড় ছেলে মোহন সৌদি যান। কয়েক বছর পর যান ছোট ছেলে সুমন। রোববার সকালে ফোনে ছেলেদের সঙ্গে কথা হয় বাড়ির অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে। বাড়ির উঠানে আরসিসি পিলার উঠানো হয়েছে। বাড়ি তৈরি হলে ছেলেদের দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল। সারা দিন বিদ্যুৎ না থাকায় আর কথা হয়নি। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ এলে ভয়েস ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজে বলে-‘মা রে, দুইডা কথা কমু মা, আমি আর কথা কমু না রে মা। আগুন লেগে পুড়ে যাচ্ছি মা, মরে যাচ্ছি।’
একই গ্রামের কলিম উদ্দিন। ৬ মাস বয়সে তার বাবা মারা যান। এরপর মা কারিমা বেগম দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। শত কষ্টের মাঝে সন্তানকে বড় করেন। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ৯ বছর আগে ৯ লাখ টাকা ঋণ করে সৌদি যান কলিম। ইচ্ছে ছিলে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। বাড়ির উঠানে ছেলের ছবি বুকে নিয়ে বিলাপ করছিলেন তার মা কারিমা। তিনি বলেন, দুপুরে ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। বলেছিল একটু সমস্যা হয়েছে পরে কথা বলব। কিন্তু আর পরে ফোন দেয়নি। এ বছরের শেষের দিকে তার বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই ছেলের লাশ চলে আসবে। এ শোক কীভাবে সইব।
একই গ্রামের নিহত রুবেলের বাবা সাইদুর রহমান বলেন, আমরা গরিব মানুষ, সরকারের কাছে আর কী চাইব। আমার ছেলের লাশ যেন পৌঁছিয়ে দেয়, এটাই অনুরোধ।
গন্ডগোহালী গ্রামের ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী বলেন, লাশগুলো দেশে আনাসহ নিহতদের পরিবারকে সরকারি সহযোগিতার দাবি জানাই।
নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, লাশ দেশে আনতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে।
নাটোরের তিনজন নিহত : নাটোর প্রতিনিধি জানান, নিহতরা হলেন-নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরা ইউনিয়নের শ্রীপুরপাড়া এলাকার গোলাম রাব্বানীর ছেলে সাব্বির হোসেন শুভ (২৯), দিঘিরপাড় এলাকার জাকির হোসেনের ছেলে শামীম হোসেন (৩০) ও মহিষডাঙ্গা এলাকার আসলাম আলীর ছেলে রবিউল আওয়াল হৃদয় (২৮)। সোমবার তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসেন জানান, এই তিন রেমিট্যান্স যোদ্ধার একজন সাত মাস আগে সৌদি আরব যান। তার ৪০ দিন বয়সি একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। অপর দুজনের একজন পাঁচ বছর আগে, একজন তিন বছর আগে সৌদি যান। অতি সাধারণ কৃষক পরিবারের এসব সন্তানেরা মানুষের কাছ থেকে ধারদেনা করেই বিদেশ যায়। এখনো তাদের সেসব ঋণ শোধ হয়নি। সরকারের কাছে তিনি এসব ঋণ মাফ করার দাবি জানান।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান খান সোমবার বেলা ১১টায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেন।