মাওলানা আবু সাঈদ
মানুষের জীবন খুবই সংক্ষিপ্ত। সেই তুলনায় কাজ অনেক বেশি। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে সকল প্রয়োজনীয় কাজ করতে হলে সময়ের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলোরও সযত্ন ব্যবহার জরুরি। নিয়মিত অধ্যবসায়, কৌশলী পদক্ষেপ সময় ও কাজের মাঝে সামাঞ্জস্য বিধানে সহায়ক হয়। যেহেতু দরসে নেজামির ওপরের জামাতের নেসাবগুলো বেশ দীর্ঘ। তাই এসব জামাতে বছরের শুরু থেকেই পরিকল্পনা করে পড়ালেখা করতে হয় ছাত্রদের। তাকমিল বা দাওরায়ে হাদীস দরসে নেজামির সর্বোচ্চ জামাত। এ জামাতের নেসাব যে পরিমাণ দীর্ঘ, সেই তুলনায় পরীক্ষার প্রস্তুতিমূলক পড়ালেখার সময়-সুযোগ অনেক কম। পরীক্ষার পূর্বে শুধু খেয়ারের সময়ে সবক’টি কিতাব শেষ করে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণ প্রায় অসম্ভব। ভালো ফলাফল করতে হলে বছরের শুরু থেকেই নিয়ম-মাফিক পরিকল্পিত পড়ালেখার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে প্রথমেই ছাত্রদের মাঝে কিছু বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।

১। আত্মপরিচয়ের অনুভূতি জাগ্রত করুন : আত্মপরিচয়ের অনুভূতি বলতে বোঝাতে চাচ্ছি, আপনি তাকমিল মারহালার শিক্ষার্থী। জেনারেলে যেটা মাস্টার্স বা পোস্টগ্রেজুয়েশন পর্যায়ের। তাই চলনে-বলনে, আচরণে-উচ্চারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কর্মসম্পাদনে আপনার কাছ থেকে সেই স্তরের রুচি ও বোধের বহিঃপ্রকাশ হওয়া চাই। আপনার কোনো কাজে যেন ছেলেমানুষি ভাব না থাকে, সে ব্যাপারে যত্নবান হবেন। বয়স ও একাডেমিক স্তর বিবেচনায় তাকমিল জামাতের সকল শিক্ষার্থীর মাঝে এতটুকু মেচিউরিটি চলে আসা কাম্য।

শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও নিজ অবস্থান ও স্তর সম্পর্কে অবহিত হওয়া জরুরি। শিক্ষার্থীদের স্বীকৃত তিন স্তরের কোনো স্তরে আপনার অবস্থান। আপনি কি ১ম স্তরের শিক্ষার্থী, নাকি মধ্যম স্তরের? নাকি দুর্বলদের তালিকায় আপনার অবস্থান? সর্বোচ্চ স্তরের শিক্ষার্থী হয়ে থাকলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন। নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখুন। ২য় বা ৩য় স্তরের হলে উস্তাযদের পরামর্শে নিজেকে আরো এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করুন। মনে রাখবেন, সাবলীলভাবে বিশুদ্ধ ইবারত পড়তে পারা এবং উস্তাযের দরস শুনে তাকরার বা শরাহ-শুরুহাতের সহযোগিতায় পাঠ আয়ত্ত করতে সক্ষম হওয়া তাকমিল জামাতের একজন শিক্ষার্থীর সর্বনিম্ন যোগ্যতা।

২। প্রতিদিনের কাজ প্রতিদিন করুন: যেহেতু দাওরায়ে হাদীসের কিতাবগুলো বড়ো বড়ো। নেসাবও বড়ো। আবার সময় খুবই স্বল্প। এজন্য কৌশলগত কারণেই কাজ জমিয়ে রাখা যাবে না। দৈনিকের কাজ দৈনিকই শেষ করার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। দরসের বিরতির সময়, খানা, গোসল, নাস্তা ও নামাজের সময়ে মূল কাজের পূর্বের ও পরের বেঁচে যাওয়া সময়গুলো কাজে লাগাতে হবে। কোনো কাজ পরে করার জন্য রেখে দেয়া যাবে না। আপনি যেদিনের জন্য আজকের কাজটা রেখে দিতে চাচ্ছেন; সেদিনেরও নির্দিষ্ট কাজ রয়েছে। আর কাজের ভিড় পড়ে গেলে অসুন্দর ও ত্রুটিপূর্ণ হয়কাজ। মনে রাখবেন, সময়ের স্বল্পতার অজুহাত আপনাকে ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারবে না। অতএব অজুহাত না খুঁজে মেহনতে প্রবৃত্ত হোন। বৃহস্পতিবার-শুক্রবারসহ সময়ের ভগ্নাংশগুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করুন।

৩। নিয়মিত দরসে উপস্থিত থাকুন : বছরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি দরসে উপস্থিতির ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনোক্রমেই দরসে অনুপস্থিত থাকা যাবে না। উপস্থিতি দুই রকমের। ১। মনঃসংযোগের সাথে উপস্থিতি। ২। মনঃসংযোগ ছাড়া শুধু শারীরিক উপস্থিতি। মনঃসংযোগসহ উপস্থিতিই প্রকৃত উপস্থিতি। শুধু শারীরিক উপস্থিতি অনুপস্থিতির শামিল। দরসে বসে ঘুমানোও একধরনের অনুপস্থিতি। অতএব দরসে যেন ঘুম না আসে সেই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কৌশল অবলম্বন করতে হবে। দাওরায়ে হাদীসে দরসে উপস্থিতিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে গণ্য করতে হবে। কারণ দরসের বাইরে পৃথকভাবে পড়ার খুব বেশি একটা সময় পাওয়া যায় না। উস্তাযদের মুখ থেকে শোনা তাকরির এবং ত্বরিৎ নজরে দেখা বিষয়গুলোই হবে আপনার পরীক্ষার পুঁজি।

৪। প্রয়োজনীয় তথ্য নোট করুন : গুরুত্বপূর্ণ তাকরির ও প্রয়োজনীয় কথাগুলো সংরক্ষণ ও পরবর্তীতে ব্যবহারের সুবিধার্তে প্রত্যেকটি কিতাবের জন্য পৃথক পৃথক খাতা ব্যবহার করুন। উস্তাযের দরস থেকে প্রাপ্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তারিখ ও বারসহ প্রতিদিন নোট করুন। এগুলো পরীক্ষার পূর্বে স্বল্প সময়ে প্রস্তুতি গ্রহণে যথেষ্ট সহায়ক হবে ইনশাআল্লাহ।

৫। নোট-গাইড বর্জন করুন : বাংলা কোনো নোট বা গাইড সাথে রাখবেন না। একে তো এগুলো ইলমী শানের খেলাফ। দ্বিতীয়ত এগুলোর ওপর নির্ভরতা অন্তর থেকে দরসের গুরুত্ব রহিত করে দেয়। মূল কিতাব আয়ত্ত করার আগ্রহ নষ্ট করে। ইলমি ইস্তে’দাদ অর্জনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

৬। আরবিতে পরীক্ষা দেয়ায় অভ্যস্ত হোন : শরহে বেকায়া, মেশকাত, দাওরায় আরবিতে উত্তর প্রদানের জন্য পৃথক নম্বর বরাদ্দ থাকে। এই মারহালাগুলোতে ভালো ফলাফল করতে হলে এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে আরবিতে উত্তর দেয়া বাঞ্চনীয়। এজন্য বছরের শুরু থেকেই গুরুত্বের সাথে আরবিতে পরীক্ষা দেয়ার কলাকৌশলগুলো রপ্ত করুন। মাদরাসার প্রতিটি পরীক্ষা আরবিতে প্রদানের চেষ্টা করুন।

৭। পেন্সিল ও টেক্সটলাইটার সাথে রাখুন : সবসময় পেন্সিল বা টেক্সটলাইটার সাথে রাখুন। পাঠ্য কিতাবগুলো নিজস্ব মালিকানাধীন হলে ‘মহল্লে ইমতেহান’ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, হাশিয়া ও টিকা দাগিয়ে রাখুন। যেন পরবর্তীতে খুঁজে বের করতে পেরেশান হতে না হয়। মাদরাসার কিতাব হয়ে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে বিশেষ কোনো সংকেত বা আলামত ব্যবহার করুন।

৮। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হোন : ইলম যেহেতু নূরে ইলাহি। তাই ইলম অর্জনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচা জরুরি। আল্লাহর দরবারেনিয়মিত রোনাজারি করুন। দোয়া করুন। ইলমের আদবগুলো রক্ষা করে চলার চেষ্টা করুন। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকুন। বেশি বেশি তাওবা ইস্তেগফারের মাধ্যমে নিজেকে গোনাহমুক্ত রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট হোন।

লেখক : মুহাদ্দিস, মাদরাসা দারুর রাশাদ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews