বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দিগন্ত অন্বেষণে বারবার ফিরে আসতে হয় পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িÑ এই তিন পার্বত্য জেলার বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধারই নয়, বরং একটি অনাবিষ্কৃত অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সম্ভাবনার তুলনায় এই অঞ্চল অবহেলিত থেকেছে। এখন সময় এসেছে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের মডেলে পরিণত করার।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটনখাত কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। থাইল্যান্ড, নেপাল কিংবা ভিয়েতনামÑ এসব দেশ পর্যটনকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশেও সেই সম্ভাবনা সুস্পষ্ট, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে, যেখানে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এক অনন্য সমন্বয় তৈরি করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন সম্ভাবনার মূল শক্তি হলো এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য। পাহাড়, নদী, ঝর্ণা, হ্রদ ও বনÑ সব মিলিয়ে এটি একটি অনন্য ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চল। কাপ্তাই হ্রদ, নীলগিরি, নীলাচল, আলুটিলা পর্যটন এবং সাজেক ভ্যালি ইতোমধ্যেই দেশীয় পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে এই জনপ্রিয়তা এখনো একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক কাঠামোয় রূপ নিতে পারেনি। পর্যটন কার্যক্রম এখনো অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক এবং মৌসুমভিত্তিক, যা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে।
এখানেই ‘ট্যুরিজম থেকে ট্রান্সফরমেশন’-এর ধারণাটি গুরুত্ব পায়। পর্যটনকে কেবল ভ্রমণ ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাতে রূপান্তর করতে হবে। অর্থাৎ পর্যটনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষি, হস্তশিল্প, পরিবহন, আবাসন, খাদ্যসেবা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক চক্র গড়ে তুলতে হবে। এতে করে পর্যটন শুধু আয়ের উৎসই হবে না, বরং একটি বহুমাত্রিক উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করবে।
প্রথমত, উপজেলাভিত্তিক পর্যটনউন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি উপজেলার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোথাও রয়েছে মনোরম ঝর্ণা, কোথাও ট্রেকিং উপযোগী পাহাড়ি পথ, আবার কোথাও রয়েছে বৈচিত্র্যময় স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। এই বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে বিকেন্দ্রীভূত পর্যটন মডেল গড়ে তোলা সম্ভব। এর ফলে পর্যটনের চাপ নির্দিষ্ট কিছু স্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রত্যন্ত এলাকাগুলোও অর্থনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হবে। এতে আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি পাবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের মূল অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত বাংগালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা, যা পর্যটনের জন্য এক বিশাল সম্পদ। যথাযথ প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা এবং বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারা হোমস্টে, ট্যুর গাইডিং, স্থানীয় খাদ্যসেবা ও হস্তশিল্প উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এতে একদিকে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে তাদের সংস্কৃতিও সংরক্ষিত থাকবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো-উন্নয়ন এই অঞ্চলের পর্যটন বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত। উন্নত ও নিরাপদ সড়ক যোগাযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, আধুনিক টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সুবিধা ছাড়া পর্যটন শিল্প টেকসই হতে পারে না। তবে এই উন্নয়ন যেন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণ পাহাড় ধ্বংস, বন উজাড় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ এবং ইকো-ট্যুরিজম মডেলকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থত, বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর নীতিগত সহায়তা অপরিহার্য। বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হলে কর-সুবিধা প্রদান, সহজ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ক্ষুদ্রঋণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি বাড়াতে হবে, যাতে তারা বড় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়।
পঞ্চমত, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, জেলা পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব প্রায়ই উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত নীতিকাঠামো ছাড়া পর্যটন খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটন মূলত দেশীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই অঞ্চলকে সত্যিকার অর্থে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে হলে আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে প্রবেশ করা জরুরি। এজন্য কয়েকটি কৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিং ও প্রচারণা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি স্বতন্ত্র পর্যটন ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ‘হিল ট্র্যাক্টস অফ বাংলাদেশ’ নামে একটি শক্তিশালী পরিচিতি তৈরি করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, ডিজিটাল মার্কেটিং, ট্রাভেল ডকুমেন্টারি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা চালানো জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও পর্যটকবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। অনলাইন ভিসা, অন-অ্যারাইভাল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পর্যটকদের জন্য বিশেষ ট্রাভেল পাস চালু করা হলে বিদেশিদের আগ্রহ বাড়বে। পাশাপাশি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইতিবাচক বার্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানোও জরুরি।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন এবং গাইডিং সেবাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। বহুভাষিক গাইড, মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা বিদেশি পর্যটকদের আস্থা বাড়াবে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পর্যটন সার্কিটের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামকে যুক্ত করা গেলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ভারত, মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ড-এর সঙ্গে যৌথ পর্যটন প্যাকেজ তৈরি করা যেতে পারে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নিরাপত্তাইস্যু, ভূমিবিরোধ, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং অপরিকল্পিত পর্যটন কার্যক্রমÑ এসব সমস্যার সমাধান না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না। বিশেষ করে পরিবেশ সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পাহাড় ধ্বংস বা বন উজাড় হলে পর্যটনের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
পরিশেষে বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় স্তম্ভ। পরিকল্পিত নীতি, সুশাসন, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে এই অঞ্চল একটি টেকসই উন্নয়ন মডেলে পরিণত হতে পারে।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
[email protected]