ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে কিউআর কোড এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। দোকানে বিল পরিশোধ, রেস্তোরাঁর মেনু দেখা, ইভেন্টে প্রবেশ কিংবা বিভিন্ন অনলাইন সেবায় দ্রুত সংযুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তবে এই সুবিধাজনক প্রযুক্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে নতুন ধরনের সাইবার প্রতারণার ঝুঁকি। অসতর্কভাবে কিউআর কোড স্ক্যান করলে ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কীভাবে ঘটছে এই প্রতারণা?
সাইবার অপরাধীরা এখন কিউআর কোডকে ফিশিং আক্রমণের নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতির নাম দিয়েছেন ‘কুইশিং’ (QR Phishing)।
এ ধরনের প্রতারণায় একটি কিউআর কোড স্ক্যান করার পর ব্যবহারকারীকে এমন একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়, যা দেখতে হুবহু কোনো পরিচিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের আসল ওয়েবসাইটের মতো।
ফলে অনেক ব্যবহারকারী বুঝতেই পারেন না যে তারা একটি ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেছেন। সেখানে লগইন তথ্য, ব্যাংকিং তথ্য, কার্ড নম্বর বা ওটিপি চাইলে অসতর্ক ব্যবহারকারীরা তা দিয়ে দেন। আর সেখান থেকেই শুরু হয় তথ্য চুরি ও আর্থিক প্রতারণার ঝুঁকি।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যেসব স্থান
প্রতারকরা সাধারণত এমন জায়গাগুলোকে টার্গেট করে, যেখানে মানুষ দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে চান। যেমন—
> দোকানের পেমেন্ট বোর্ড
> পার্কিং মিটার
> রেস্তোরাঁর টেবিলে থাকা কিউআর কোড
> পাবলিক পোস্টার বা বিজ্ঞাপন
> কুরিয়ার পার্সেল
> প্রচারণামূলক লিফলেট
অনেক ক্ষেত্রে আসল কিউআর কোডের ওপর ভুয়া স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়, যা সাধারণ চোখে সহজে ধরা পড়ে না।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন স্মার্টফোন দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে চান? এই পরামর্শগুলো মানুন

স্ক্যান করার আগে কয়েক সেকেন্ড সময় নিন
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউআর কোড স্ক্যান করার পর তাড়াহুড়া করে লিংকে প্রবেশ করা উচিত নয়। বরং কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে লিংকটি যাচাই করা জরুরি।
নিরাপদ থাকার জন্য একটি সহজ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন—
স্ক্যান করুন → লিংক দেখুন → যাচাই করুন → তারপর খুলুন
এই ছোট্ট অভ্যাসই আপনাকে বড় ধরনের প্রতারণা থেকে রক্ষা করতে পারে।
যেসব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন
১. ওয়েব ঠিকানা ভালোভাবে পরীক্ষা করুন
কিউআর কোড স্ক্যান করার পর যে ওয়েবসাইটের ঠিকানা দেখাবে, সেটি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য কি না নিশ্চিত করুন। ডোমেইন নামের বানানে সামান্য পরিবর্তন, অতিরিক্ত অক্ষর বা অস্বাভাবিক শব্দ থাকলে সেটি প্রতারণার ইঙ্গিত হতে পারে।
২. সংক্ষিপ্ত (Short URL) লিংক থেকে সতর্ক থাকুন
অনেক প্রতারক শর্ট ইউআরএল ব্যবহার করে প্রকৃত ওয়েবসাইটের ঠিকানা গোপন রাখে। তাই অচেনা বা সন্দেহজনক সংক্ষিপ্ত লিংক দেখলে সেটি এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে নিরাপদ।
৩. ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হোন
কোনো কিউআর কোড স্ক্যান করার পর যদি পাসওয়ার্ড, ওটিপি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তথ্য বা কার্ড নম্বর চাওয়া হয়, তাহলে কোনো তথ্য না দিয়ে দ্রুত পেজটি বন্ধ করে দিন।
মনে রাখবেন, বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এমন সংবেদনশীল তথ্য হঠাৎ করে চায় না।
৪. স্টিকার লাগানো কিউআর কোড সন্দেহজনক হতে পারে
যদি কোনো কিউআর কোডের ওপর নতুন স্টিকার লাগানো দেখা যায় বা সেটি অস্বাভাবিক মনে হয়, তাহলে সেটি ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ প্রতারকরা প্রায়ই আসল কোডের ওপর ভুয়া কোড বসিয়ে দেয়।
ফোনের নিজস্ব ক্যামেরা ব্যবহার করাই নিরাপদ
বর্তমানের অধিকাংশ অ্যান্ড্রয়েড ও আইফোনে বিল্ট-ইন কিউআর কোড স্ক্যানিং সুবিধা রয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, অজানা বা তৃতীয় পক্ষের কিউআর স্ক্যানার অ্যাপ ব্যবহার না করতে। কারণ এসব অ্যাপ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় অনুমতি নিয়ে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
ই-মেইল ও মেসেজে পাওয়া কিউআর কোডেও সতর্কতা জরুরি
অচেনা প্রেরকের ই-মেইল, এসএমএস কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তায় পাঠানো কিউআর কোড স্ক্যান করার আগে অবশ্যই যাচাই করুন।
বর্তমানে বহু প্রতারণামূলক প্রচারণা, ভুয়া পুরস্কার, ব্যাংক জালিয়াতি এবং তথ্য চুরির ঘটনা কিউআর কোডের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তবে এর সঙ্গে বেড়েছে সাইবার ঝুঁকিও। কিউআর কোড স্ক্যান করা এখন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হলেও প্রতিটি স্ক্যানের আগে সামান্য সতর্কতা বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই মনে রাখুন— কিউআর কোড দেখলেই স্ক্যান নয়; আগে যাচাই, তারপর ব্যবহার। আপনার কয়েক সেকেন্ডের সচেতনতাই সুরক্ষিত রাখতে পারে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ডিজিটাল পরিচয় এবং ব্যাংক হিসাব।