প্রতি বছর ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ক্যানসার দিবস। ২০২৫–২০২৭ সালের প্রতিপাদ্য ‘ইউনাইটেড বাই ইউনিক’ আমাদের যে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় তা হল, প্রতিটি ক্যানসার রোগী আলাদা, তাই তাদের চিকিৎসা ও যত্নও হতে হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ক্যানসার শুধু একটি শারীরিক রোগ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ভয়, অনিশ্চয়তা, আশা, সাহস, পরিবার এবং নতুনভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার সেবা বলতে বোঝায় এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা যেখানে শুধু রোগ নয়, রোগীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। একজন রোগীর ব্যক্তিগত চাহিদা, সামাজিক বাস্তবতা, মানসিক অবস্থা এবং আর্থিক সক্ষমতা চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও বাস্তবে এ ধরনের সেবা এখনও সর্বত্র কার্যকর হয়নি। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বৈষম্য এবং পরিবর্তনের প্রতি অনীহা। এখন সময় এসেছে একটি সত্যিকারের পরিবর্তনের।
এ পরিবর্তনের জন্য রোগী, পরিবার এবং কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসা গ্রহণকারী হিসেবে দেখা হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশীদার হিসেবে নয়। অথচ যারা ক্যানসারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের মতামত স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা ও সম্ভাবনার জায়গাগুলো স্পষ্ট করে। চিকিৎসা পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণ এবং সেবার মান উন্নয়নে রোগীর অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে রোগীদের মতামতের ভিত্তিতে ক্যানসার সেবা উন্নত করার সফল উদাহরণ দেখা গেছে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার সেবা শুরু হয় রোগীর জীবনকে বোঝা দিয়ে। প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, দ্রুত রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং প্যালিয়েটিভ কেয়ার—সবকিছু একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে থাকা প্রয়োজন। একজন রোগীকে শুধু ‘আপনার সমস্যা কী?’ প্রশ্ন করলে যথেষ্ট নয়; বরং জানতে হবে ‘আপনার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?’। এ দৃষ্টিভঙ্গি চিকিৎসাকে আরও মানবিক করে তোলে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন দেশে প্রথমবারের মতো সফল ‘পেকটাস ও ইটিএস’ সমন্বিত অস্ত্রোপচার

এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনতা বা হেলথ লিটারেসি বড় ভূমিকা রাখে। যখন রোগীরা তাদের রোগ, চিকিৎসার পদ্ধতি এবং সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান, তখন তারা চিকিৎসায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারেন এবং চিকিৎসার ফলও সাধারণত ভালো হয়। তাই সহজ ভাষায় তথ্য প্রদান, পরামর্শ এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্যানসার চিকিৎসা কখনও একক প্রচেষ্টায় সফল হয় না। প্রয়োজন সমন্বিত দলগত কাজ—ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, সমাজকর্মী এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি রোগীর মানসিক, সামাজিক এবং পারিবারিক প্রয়োজনও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। সহানুভূতি ও সম্মান চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ।
একই সঙ্গে ক্যানসার সেবায় সমতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, আয় বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে কেউ যেন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন। শহর-গ্রামের ব্যবধান কমানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং বৈষম্য দূর করা একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার পূর্বশর্ত। স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জবাবদিহিতাও এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যানসার সেবা বাস্তবায়নের জন্য শক্ত নেতৃত্ব অপরিহার্য। সরকার, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ জনবল এবং আধুনিক অবকাঠামো। স্বাস্থ্যকর্মীদের এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে যাতে তারা রোগীর আবেগ, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বাস্তবতাকে সম্মান করে সেবা দিতে পারেন। পাশাপাশি আইন ও নীতিমালাকে সময়োপযোগী করতে হবে, যাতে প্রতিরোধ থেকে চিকিৎসা ও ফলো-আপ পর্যন্ত পুরো সেবাটি হয় নিরবচ্ছিন্ন ও সমন্বিত।
তবে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকদের দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। পরিবার, বন্ধু এবং কমিউনিটির সহায়তা একজন রোগীর জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। সচেতনতা বৃদ্ধি, কুসংস্কার দূর করা এবং রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ এ লড়াইকে আরও সহজ করে।
‘ইউনাইটেড বাই ইউনিক’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি মানুষের গল্প আলাদা হলেও আমাদের লক্ষ্য একটাই: উন্নত, মানবিক এবং সবার জন্য সহজলভ্য ক্যানসার সেবা নিশ্চিত করা। রোগ নয়, মানুষকে কেন্দ্র করে যদি আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই আরও শক্তিশালী হবে। একসঙ্গে এগিয়ে এলে পরিবর্তন সম্ভব।
লেখক: সিনিয়র কনসালট্যান্ট, রেডিয়েশন অনকোলজি,
এভারকেয়ার হাসপাতাল, ঢাকা।