ছবির উৎস, Syed Mahamudur Rahman/NurPhoto via Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি তথ্যের মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান লক্ষা করা যাচ্ছে
Author,
তারেকুজ্জামান শিমুল
Role,
বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
Published
৪ ঘন্টা আগেপড়ার সময়: ১০ মিনিট
বাংলাদেশে জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর দুই বছর কেটে গেলেও নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিতর্কের অবসান হয়নি। উল্টো, যতই দিন যাচ্ছে, ততই এটি ঘিরে প্রশ্ন ও সংশয় বাড়তে দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ইস্যুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিহতদের সংখ্যা নিয়ে এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ সরকারের হিসেবের সঙ্গে জাতিসংঘের পরিসংখ্যানের বিশাল ফাঁরাক।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হয়তো দুই হিসেবের ব্যবধানের জায়গাটি অনেকটাই কমে আসবে।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে 'জুলাই শহীদের' সর্বশেষ যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪৩ জনে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের রিপোর্টে নিহতের সংখ্যা ১৪শ' জনের মতো হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যার পার্থক্য এখনও পাঁচশ'রও ওপরে রয়েছে।
"এর ফলে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক স্বৈরশাসকের পক্ষে যাচ্ছে এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা এটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গণ অভ্যুত্থান নিয়ে নানান প্রপাগান্ডা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সাবেক অর্ন্তবর্তী সরকারের সময় গুরুত্ব দিয়ে তালিকা তৈরি না করার কারণেই বিতর্কটি এতদূর গড়িয়েছে।
"তবে এখনও সুযোগ আছে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তুলে আনার। সেটা করা না হলে বিতর্ক থেকেই যাবে, যেমনটা একাত্তরে শহীদের সংখ্যা নিয়ে থেকে গেছে," বলছিলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
বিএনপি সরকার অবশ্য বলছে যে, তারা নিহতের প্রকৃত সংখ্যা তুলে এনে একটা নির্ভুল তালিকা তৈরি চেষ্টা চালাচ্ছে।
"আমরা চেষ্টা করছি এবং কাজটি যেন ঠিকঠাক মত হয়, সেজন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে একটা আলাদা অধিদপ্তরই তৈরি করে দিয়েছি," বিবিসি বাংলাকে বলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
কিন্তু জুলাই গণ অভ্যুত্থানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি তথ্যের মধ্যে এত পার্থক্যের কারণ কী?

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালে জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতেই বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে বলছে জাতিসংঘ
২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, হতাহতদের স্বজন, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন মহলের মানুষজন।
এমনকি গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সপ্তাহখানেক আগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সরকারের তদন্ত কাজে সহায়তা করার জন্য জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানান।
পরে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অর্ন্তবর্তী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানালে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসে এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সহিংসতা, প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করে।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে তদন্ত ও পর্যালোচনার পর ২০২৫ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক।
সেই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫ই জুলাই থেকে পাঁচই অগাস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে বিক্ষোভ ও বিক্ষোভ পরবর্তী সহিংসতায় বাংলাদেশে ১৪০০ জনের মতো মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন।
নিহতদের বেশিরভাগের মৃত্যু দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র, সামরিক রাইফেল এবং শটগানের গুলিতে হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়, বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয় কাজে নেতৃত্বে ছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।
তাদের দু'জনের নির্দেশেই বিক্ষোভ দমনে পুলিশসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীগুলো 'মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে' বলে জাতিসংঘের তদন্তে উঠে আসে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু।
এর বাইরে, আরও হাজার হাজার মানুষ গুরুতর আহত হন। সেইসঙ্গে, সাড়ে ১১ হাজারের বেশি মানুষকে নির্বিচারে আটক ও নির্যাতন করা হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

ছবির উৎস, UNHR
ছবির ক্যাপশান,
জুলাই আন্দোলনে হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রকাশিত জাতিসংঘ রিপোর্টের প্রচ্ছদ
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, হতাহতদের বিষয়ে যেসব তথ্য তারা প্রকাশ করেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশই তদন্তকারীরা পেয়েছেন বাংলাদেশের সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে।
এর মধ্যে প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত হওয়া পর্যন্ত সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জুলাই-অগাস্টে নিহত ৮৪১ জন বিক্ষোভকারীর তালিকা পান জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা।
তারা গোয়েন্দা সংস্থা 'ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সে'র (এনএসআই) কাছ থেকেও নিহত আরো ৩১৪ জনের একটি তালিকা সংগ্রহ করেন, যেখানে মৃত ব্যক্তিদের নাম এবং মৃত্যুর তারিখ উল্লেখ ছিল।
"এনএসআইয়ের ভাষ্য, নিহত এসব ব্যক্তিদের নাম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি," জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর বাইরে, মানবাধিকার সংস্থাসহ বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিহতদের আরো বেশ কয়েকটি তালিকা সংগ্রহ করেন তদন্তকারী দলের সদস্যরা।
বিভিন্ন তালিকা পর্যালোচনা করার সময় নিহতদের মধ্যে যাদের নাম দুই বার পাওয়া গেছে, তাদের ক্ষেত্রে কেবল একবারই নাম গোনা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও বিক্ষোভকারীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি মর্গগুলো থেকেও নিহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন তদন্তকারীরা।
"এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ওএইচসিএইচআর মূল্যায়ন করেছে যে, ১৫ই জুলাই থেকে পাঁচই অগাস্ট পর্যন্ত বিক্ষোভে কমপক্ষে ১৩ জন নারীসহ এক হাজার ৪০০ জন নিহত হতে পারেন," জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নিহতদের নামের কোনো তালিকা জাতিংঘের পক্ষ থেকে প্রকাশ করা হয়নি।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালে জুলাই-অগাস্টের আন্দোলনে ছবি
চব্বিশের মধ্য জুলাইয়ে সহিংসতা শুরু হওয়ার পর থেকেই হতাহতদের বিষয়ে হিসাব রাখার চেষ্টা করছিল গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। ওই সময় নিহতদের প্রাথমিক একটি তালিকাও তৈরি করতে দেখা গিয়েছিল তাদের।
পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটার পর হতাহতদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ শুরু করে প্ল্যাটফর্মটি।
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাজ করার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্য বিষয়ক উপ-কমিটি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সারা দেশে তারা প্রায় এক হাজার ৫৮১ জন নিহতের তথ্য পেয়েছেন।
সেসময় ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও হাসপাতালের তথ্যের পাশাপাশি গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছ থেকেও হতাহতদের বিষয়ে তথ্য নিয়েছিলেন বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপ কমিটির তৎকালীন সদস্য সচিব তারেকুল ইসলাম।
"খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কাজটি করেছিলাম তো আমরা, সেজন্য নানাভাবে আমরা নামগুলো এক জায়গায় করে একটা খসড়া তালিকা তৈরি করলাম," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মি. ইসলাম।
তবে নিহতদের সেই তালিকায় যাদের নাম ছিল, তাদের সবার বিষয়ে অবশ্য তখনও বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করতে সক্ষম হননি তারা।
ফলে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য পরবর্তীতে খসড়া তালিকাটি তৎকালীন অর্ন্তবর্তী সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক এই নেতা।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে হত্যার প্রতিবাদে বিদেশেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছিল
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার আগেই অবশ্য আন্দোলনে নিহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে একটি খসড়া তালিকা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার।
মূলত আন্দোলন চলাকালে নিহতদের যতটুকু তথ্য সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কাছে ছিল, সেগুলো দিয়েই ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খসড়া একটি তালিকা প্রকাশ করে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সারা দেশ থেকে যেন ওই তালিকায় তথ্য সংশোধন ও সংযোজন করতে পারেন, সেজন্য আলাদা একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
নিহতদের পরিবারের সদস্য, ওয়ারিশ ও প্রতিনিধিদেরকে ওই তালিকায় প্রকাশিত ব্যক্তিদের নাম, ঠিকানা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই, সংশোধন ও পূর্ণাঙ্গ করার জন্য আহ্বান জানানো হয়।
আন্দোলনে নিহতদের মধ্যে কারো নাম ওই খসড়া তালিকায় পাওয়া না গেলে তাদের স্বজনদেরকে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ নিজ নিজ জেলার প্রশাসক, সিভিল সার্জন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অথবা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সেইসঙ্গে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৈরি করা খসড়া তালিকাও যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেয় সরকার।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার রাজপথে মানুষের উচ্ছ্বাসের এমন চিত্র দেখা গিয়েছিল
"যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি যেন নির্ভুলভাবে হয়, সেজন্য প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়। সেসব কমিটিতে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং সিভিল সার্জনরা যেমন ছিলেন, তেমনি জুলাই যোদ্ধাদের প্রতিনিধিরাও ছিলেন," বিবিসি বাংলাকে বলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের।
যাচাই-বাছাইয়ের পর স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাদের নাম মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়, সেগুলোই পরবর্তীতে প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশ করে সরকার।
যদিও প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পরও নিহতদের তালিকায় একাধিকবার কাঁটাছেড়া হতে দেখা গেছে।
এর মধ্যে চলতি বছরের ১৬ই মার্চ প্রকাশিত গেজেটে ৮৫৬ জনের নাম দেখা হলেও পরবর্তীতে সেটি কমে ৮৪৩ জনে দাঁড়িয়েছে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
"এক্ষেত্রে প্রজ্ঞাপন নাম প্রকাশের পর কিছু নামের বিষয়ে অভিযোগ আসে যে, ভুল তথ্য দিয়ে তাদের নাম তালিকায় ঢোকানা হয়েছে। পরে তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১৩ জনের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে," বলেন মি. নাসের।
এখন তালিকায় নিহতের যে সংখ্যা দেখা যাচ্ছে, সেখানেও সংযোজন-বিয়োজনের সুযোগ আছে বলে জানিয়েছেন জুলাই গণ অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের এই মহাপরিচালক।
"এটি একটা চলমান প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে নতুন কেউ আবেদন করলে সেটি যেমন যাচাই-বাছাই করা হবে, তেমনি তালিকায় নাম থাকা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে সেটাও খতিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে," বলেন মি. নাসের।

ছবির উৎস, Reuters
ছবির ক্যাপশান,
জুলাই গণ অভ্যুত্থানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো
জুলাই গণ অভ্যুত্থানে প্রাণহানির সরকারি হিসেবের সঙ্গে বেসরকারির ব্যবধান পাঁচশ'রও বেশি। দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে বিশাল এই ফাঁরাকের পেছনে বেশকিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
"এক্ষেত্রে প্রথমে যে বিষয়টি সামনে চলে আসে, সেটি হলো সহিংসতায় নিহত সবাইকে সরকারি তালিকায় রাখা হয়নি। সরকার মূলত জুলাই শহীদদের তালিকা তৈরির চেষ্টা করছে," বলছিলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন।
এই 'জুলাই শহীদ' ঠিক কারা, সেটি সম্পর্কে সুস্পষ্ট একটি ধারণা পাওয়া যায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা বিভিন্ন প্রজ্ঞাপন থেকে।
এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রকাশিত 'জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশে' জুলাই গণ অভ্যুত্থানে শহীদের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, "তৎকালীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা উক্ত সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের আক্রমণে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি।"
সেজন্য কেবলমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলায় প্রাণ হারানো ব্যক্তিরাই সরকারি তালিকায় জায়গা পেয়েছেন।
কিন্তু আন্দোলন চলাকালে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং তৎকালীন সরকারের সমর্থকরাও অনেকে নিহত হয়েছেন।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় নিহত ৪৪ জন পুলিশ সদস্যের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল পুলিশ সদর দপ্তর।
এর বাইরে, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীও মারা গেছে।
কিন্তু জুলাই শহীদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাদেরকে সরকারি তালিকায় রাখার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন জুলাই গণ অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের।
অন্যদিকে, বিক্ষোভকারী, পুলিশ, আওয়ামী লীগ সমর্থক- নির্বিশেষে নিহত যত লোকের তথ্য পাওয়া গেছে, সবাইকে রেখেই তালিকায় তৈরি করেছেন জাতিসংঘের তদন্তকারী দলের সদস্যরা।
"এখন সরকারেরও উচিৎ জুলাই শহীদের তালিকার পাশাপাশি পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থকরা যারা নিহত হয়েছিল, তাদের সবার তালিকা তৈরি করে নিহতের একটা টোটাল সংখ্যা প্রকাশ করা," বলেন মি. লিটন।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০২৪ সালে আন্দোলনের ৩৬ দিনের মাথায় শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে
সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যে বড় পার্থক্যের আরেকটি কারণ হিসেবে সামনে আসছে, সব মৃত্যুর দালিলিক প্রমাণ না থাকা।
বাংলাদেশ সরকারের তৈরি করা তালিকার বিষয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে, "এই তথ্য সম্ভবত অসম্পূর্ণ। কারণ চিকিৎসাকর্মীরা প্রায়শই নিহত ও আহতদের ভিড়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন, যার ফলে অনেক তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়নি।"
গ্রেফতার ও সরকারের রোষানল এড়াতে অনেকে পরিবার সেসময় ময়না তদন্ত ছাড়াই নিহত স্বজনের মরদেহ দাফন করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
"কিছুক্ষেত্রে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে বিক্ষোভ-সম্পর্কিত মৃত্যু এবং আহতদের নাম নিবন্ধন থেকে বিরত রাখতে ভয় দেখানো হয়েছিল," জাতিসংঘের রিপোর্টে বলা হয়েছে।
"হতাহতদের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি নিজেও এসব ধরনের ঘটনাগুলো দেখেছি। ফলে হাসপাতালের কাছে নিহতদের সবার ব্যাপারে তথ্য না থাকাটাই স্বাভাবিক," বলছিলেন মানবাধিকারকর্মী মি. লিটন।
কিন্তু এখন সরকারি তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিবন্ধন, মৃত্যু সনদ বা ময়নাতদন্তের রিপোর্টের মতো দালিলিক প্রমাণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
"এর ফলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের তালিকায় নাম আছে- এমন অনেক জেন্যুইন শহীদের নামও সরকারি তালিকায় জায়গা পায়নি," অভিযোগের সুরে বলছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা তারেকুল ইসলাম।
তবে গণ অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ছাড়া তালিকায় নাম তোলার সুযোগ নেই।
"এই জায়গায় খুব একটা শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। কারণ শিথিলতা দেখালেই তালিকায় অনেক ভুয়া ব্যক্তিদের নাম ঢুকে যাওয়ার রিস্ক তৈরি হবে," বলেন অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তা মি. নাসের।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
আন্দোলন চলাকালে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি অবস্থান
আন্দোলনের সময় নিহত অনেকেরই পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
কেবল ঢাকার রায়েরবাজার কবরস্থানেও এ ধরনের ১১৪টি মরদেহ 'বেওয়ারিশ হিসেবে' দাফন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম।
ডিএনএ টেস্ট করে পরবর্তীতে তাদের মধ্যে মাত্র আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে পেরেছে পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ (সিআইডি)।
বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা বাকি মরদেহগুলোর বিষয়ে কোনো দাবিদার খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
আবার ইন্টারনেট সুবিধা না থাকা কিংবা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় জড়ানোর ভয়েও শহীদদের কারো কারো পরিবার সরকারি তালিকায় নাম তোলার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে দাবি করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।
"সুতরাং এসব সমস্যার সমাধান না করলে নিহতের সঠিক সংখ্যাটা বের করা সম্ভব হবে না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।