মধ্যপ্রদেশে স্বঘোষিত গোরক্ষকদের সাজা দেওয়ার পর মুসলিম নারী বিচারককে খুন ও ধর্ষণের হুমকি

ছবির উৎস, narmadapuram.dcourts.gov.in

ছবির ক্যাপশান,

মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরমের জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক তবস্সুম খান

    • Author,

      শেরিলিন মোলান

    • Role,

      বিবিসি সংবাদদাতা

  • Published

    ৪২ মিনিট আগে
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

ভারতের মধ্যপ্রদেশে গোরক্ষার নামে সহিংসতার একটি মামলায় দোষীদের সাজা ঘোষণার পর এক নারী বিচারককে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

তবস্সুম খান নামে ওই বিচারক মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরমের 'অ্যাডিশনাল ডিসট্রিক্ট অ্যান্ড সেশন জজ' বা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ। গত ১২ই জুন একটি গণপিটুনির মামলায় ১৪ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিলেন তিনি। তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে গালি-গালাজ করা হয় এবং প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

যে মামলাকে ঘিরে এই ঘটনা, তাতে অভিযুক্তদের খুন, খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা এবং বেআইনিভাবে কাউকে বাধা দেওয়ার মতো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আদালতের রায় ঘোষণার পর থেকেই ওই বিচারকের ধর্মীয় পরিচয় সামনে এনে সমালোচনা শুরু হয়।

মূল ঘটনাটি ২০২২ সালের। বছর ৫০-এর নাজির আহমেদ রাতে গবাদি পশু নিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে একদল ব্যক্তি তাকে বাধা দেন। অভিযোগ, তারা নিজেদের 'গোরক্ষক' বলে দাবি করেছিলেন। ওই দলের কাছে লাঠি ও লোহার রড ছিল।

নাজির আহমেদ এবং তার দুই সঙ্গীকে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে আনা হয়। তারপর গরু পাচারের সন্দেহে তাদের উপর নৃশংসভাবে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ।

এই ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত হন নাজির আহমেদ। পরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার সময়ে তার সঙ্গে যে দুই সঙ্গী ছিলেন তারা অবশ্য প্রাণে বেঁচে যান এবং পুরো ঘটনাটি আদালতের সামনে তুলে ধরেন।

মামলার রায়ে অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তবস্সুম খান বলেন, এই মামলা গণপিটুনিতে হত্যার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।

এই রায়ের পর ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার হন তিনি। আদালতের রায় ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে পোস্ট করা বেশ কয়েকটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে তাকে উদ্দেশ্য করে কটূক্তি করা হয়েছে এবং হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, তিনি নিজে মুসলিম সম্প্রদায়ের, তাই ওই মামলায় অভিযুক্তরা হিন্দু হওয়ায় তাদের শাস্তি দিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন সময়ে আদালতের রায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই মামলাটিতে তবস্সুম খানের আইনি যুক্তি বা রায় নিয়ে আলোচনা হয়নি, তার ধর্মীয় পরিচয়কে নিশানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

হুমকি দেওয়া ও তাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের একের পর এক ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর, বিচার বিভাগের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তবস্সুম খানের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। তার সুরক্ষার জন্য পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

গরুপাচার সন্দেহে একটা ট্রাক তল্লাশি করার ছবি - ফাইল চিত্র

ছবির উৎস, UGC

ছবির ক্যাপশান,

গরুপাচার সন্দেহে একটা ট্রাক তল্লাশি করার ছবি - ফাইল চিত্র

রায়ের পরই বিক্ষোভ শুরু

আদালতের রায় ঘোষণার পরপরই বিচারক তবস্সুম খানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। আদালত চত্বরের বাইরে বিক্ষোভ দেখান ওই মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের পরিবার।

তাদের (সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের) জেলে নিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের গাড়ির বহরকেও থামানোর চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ। যারা ওই সাজাপ্রাপ্তদের নিয়ে যাওয়ার সময়ে বাধা দেন, তাদের দাবি ছিল 'গোরক্ষার' কারণেই এই শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।

এরপর এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার শুরু হয়ে যায়। বেশ কয়েকজন দক্ষিণপন্থী হিন্দু ইনফ্লুয়েন্সারের পোস্ট করা ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে ওই বিচারকের বিরুদ্ধে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। কয়েকটি ভিডিওতে তাকে ধর্ষণ ও প্রানে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

এমনই এক ভিডিওতে, এক ব্যক্তি তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের ১০ দিনের মধ্যে মুক্তি না দিলে দেশজুড়ে "রক্তপাত" শুরু হতে পারে।

এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অনেক ভিডিওই ছিল। সেগুলি হাজার হাজার লাইক পেয়েছে এবং শত শত বার শেয়ারও করা হয়েছে।

এই ভিডিওগুলিতে যাদের বিরুদ্ধে হুমকি এবং সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাদের চেহারা এবং তাদের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টগুলি স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

দক্ষিণপন্থী হিন্দি নিউজ চ্যানেল 'সুদর্শন নিউজ'-এর একজন উপস্থাপককেও পিটিয়ে মারার মামলায় দোষীদের পরিবারের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা গিয়েছে।

ওই উপস্থাপক বলেছেন, "এই পরিবারগুলি সম্ভবত কখনো ভাবেনি যে তাদের পরিবারের সদস্যরা, যারা গোরক্ষার জন্য এতটা ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তাদের জেলে পাঠানো হবে।"

তিনি দর্শকদের উদ্দেশ্যে সোচ্চার হওয়ার আহ্বানও জানান। তিনি বলেছিলেন, "এখন গোরক্ষকদের হয়ে লড়াই করার সময় এসেছে।"

বেশ কয়েকটি স্বঘোষিত গোরক্ষক সংগঠন এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীও আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখিয়েছে।

পাঞ্জাবে গত ২২শে জুন, গোরক্ষা পরিষদ একটি বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। সেই সময় তবস্সুম খানের কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা।

এর তিন দিন পর, উত্তর প্রদেশে রাষ্ট্রীয় বজরং দল দোষী সাব্যস্ত "গোরক্ষকদের" মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ দেখায়।

সুপ্রিম কোর্ট

ছবির উৎস, Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশন হুমকির ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছে

সুপ্রিম কোর্টের বার অ্যাসোসিয়েশনের নিন্দা

সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্টে বলেছেন যে, এই বিক্ষোভ এবং ভিডিওগুলি যে শুধুমাত্র আদালতের রায়ের সমালোচনা করছে তা-ই নয় এর উদ্দেশ্য হলো বিচারপতি তবস্সুম খানকে তার ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে বিচারক হিসাবে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।

তিনি লিখেছেন, "রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ক্ষেত্রে তার মুসলিম পরিচয়কেই মূল ভিত্তি করা হয়েছিল। এটি ন্যায়বিচারের যে ধারণা রয়েছে, তার ঠিক বিপরীত। কোনো রায়কে বিচারকের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনি যুক্তির ভিত্তিতেই বিচার-বিশ্লেষণ করা উচিত।"

পরে মি. কাটজু জানান, তবস্সুম খান ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। মার্কণ্ডেয় কাটজু জানিয়েছেন ক্রমাগত হেনস্থা ও হুমকির জেরে ওই বিচারক মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। তার মনে হতে শুরু করেছে যে মামলার রায় ঘোষণা করে তিনি যেন কোনো অপরাধ করে ফেলেছেন।

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের (এসসিবিএ) সভাপতি বিকাশ সিং বিবিসিকে বলেন, কোনো বিচরপতিকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা যথেষ্ট গুরুতর। বিচার বিভাগ গণতন্ত্রের মৌলিক ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

"আমরা যদি এই ধরনের ঘটনা ঘটতে দিই, তাহলে কোনো বিচারক নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে পারবেন না," বলেছেন তিনি।

মি. সিংয়ের মতে, গণতন্ত্রে একজন বিচারক যাতে কোনো ভয় বা চাপ ছাড়াই তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন- সেটাই নিশ্চিত করা দরকার।

মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরমের জেলা ও দায়রা আদালত

ছবির উৎস, narmadapuram.dcourts.gov.in

ছবির ক্যাপশান,

মধ্যপ্রদেশের নর্মদাপুরমের জেলা ও দায়রা আদালত

পুলিশি নিরাপত্তার ব্যবস্থা

মধ্যপ্রদেশের সিলোই মালওয়া থানার ইন-চার্জ সুধাকর বারস্কর বিবিসিকে জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যে ব্যক্তিরা ওই উস্কানিমূলক ভিডিও শেয়ার করেছেন, পুলিশের সাইবার সেল তাদের ইতিমধ্যে চিহ্নিত করছে। একইসঙ্গে, সামাজিক মাধ্যমেও এই ধরনের কন্টেন্টের উপরও কড়া নজর দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তবে সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে মনে করেন, তবস্সুম খানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজ্য সরকার এবং বিচার বিভাগের আরো দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

আইন সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশকারী ওয়েবসাইট 'লাইভ ল'-এর একটি প্রতিবেদনে সঞ্জয় হেগড়ে আরেকটি সাম্প্রতিক মামলার উদাহরণ তুলে ধরেন, যেখানে একজন প্রাক্তন বিচারক হুমকি পাওয়ার পর আদালত হস্তক্ষেপ করেছিলো।

বোম্বে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি গৌতম প্যাটেল এবং তার পরিবারকে ২০২৪ সালের এক রায়ের পরে দশ মাসেরও বেশি সময় ধরে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ সংক্রান্ত এক মামলায় ওই রায় দেওয়া হয়েছিলো।

এরপর, তিনটি বিচার বিভাগীয় সংস্থা জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে যার ভিত্তিতে বোম্বে হাইকোর্ট গৌতম প্যাটেলকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য মহারাষ্ট্র সরকারকে নির্দেশ দেয়।

এই ঘটনায় আদালত মুম্বইয়ের পুলিশ কমিশনারকে তদন্তের তদারকি করতে এবং মামলার অগ্রগতির রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, "হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি যদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও বিচার বিভাগীয় তত্ত্বাবধান পেতে পারেন, তাহলে জেলা আদালতে কর্মরত দায়রা জজও একই সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী। এই নীতি কোনো ব্যক্তির অবস্থান, ধর্ম বা রাজনৈতিক আবহাওয়ার ভিত্তিতে পরিবর্তন করা যায় না।"

গত সপ্তাহে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট এই ঘটনায় পদক্ষেপ নিয়েছে। আদালতের তরফে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছে, তবস্সুম খানের নিরাপত্তার জন্য এখনো পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং যারা হুমকি দিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

একইসঙ্গে তবস্সুম খানকে দেওয়া পুলিশি নিরাপত্তা আপাতত বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews