মরক্কো আবারও বিশ্বকাপে রূপকথার মতো এক অভিযাত্রায়। তবে কানাডার বিপক্ষে তাদের সর্বশেষ জয়টি ছিল সৌন্দর্যের চেয়ে বেশি শক্তির প্রদর্শন। উত্তর আফ্রিকার দেশটি ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে হিউস্টনে সহ-আয়োজক কানাডাকে ৩-০ গোলে হারালেও তাদের খেলা খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ছিল না। মরক্কো মাত্র পাঁচটি শট নিয়েই ম্যাচটি জিতেছে।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয়ী কোনো দলের ক্ষেত্রে যা সর্বনিম্ন। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে শটের চেয়ে হলুদ কার্ডের সংখ্যা ছিল বেশি। তবু শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে মরক্কো। ফুটবলের একটি বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ আছে- মহান দলগুলো সুন্দর খেলতে না পারলেও জিততে জানে।
এখন মরক্কোকে সেই ধরনেরই একটি মহান দল হিসেবে বিবেচনা করতেই হবে এবং বিশ্বকাপ জয়ের প্রকৃত দাবিদার হিসেবেও দেখতে হবে। তারা শুধু চলতি বিশ্বকাপেই অপরাজিত নয়, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৪ ম্যাচ ধরে হারেনি। অবশ্য এই পরিসংখ্যানে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। ২০২৬ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে সেনেগালের বিপক্ষে যে ম্যাচটি পরে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে মরক্কোর জয় হিসেবে গণ্য করা হয়, সেটি এখন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে। তবুও এই রেকর্ড নিঃসন্দেহে অসাধারণ।
আফ্রিকান নেশনস চ্যাম্পিয়নশিপে ২০২৫ সালের আগস্টে কেনিয়ার কাছে ১-০ গোলে হারার পর থেকে মরক্কোর জাতীয় দল আর কোনো ম্যাচ হারেনি। উল্লেখ্য, এই টুর্নামেন্টে শুধু আফ্রিকার ঘরোয়া লিগে খেলা ফুটবলাররাই অংশ নেন।
টেক্সাসে কানাডার বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিট বাদ দিলে এরপর আর কখনোই মনে হয়নি মরক্কো হারতে পারে। ম্যাচের শুরুতেই কানাডা দুটি ভালো সুযোগ তৈরি করে। মরক্কোর গোলরক্ষক বোনো দুর্দান্তভাবে জনাথন ডেভিড ও টানি ওলুওয়াসেইয়ের শট ঠেকিয়ে দেন। অন্যদিকে টানা দ্বিতীয় ম্যাচের মতো প্রথম ১৫ মিনিটে প্রতিপক্ষের বক্সে একবারও বল স্পর্শ করতে পারেনি মরক্কো। কিন্তু শুরুটা কাটিয়ে ওঠার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নেয় আটলাস লায়ন্সরা। কানাডার কোচ জেসি মার্শ ম্যাচ শেষে বলেন, ওরা কিছুটা চাপে পড়েছিল। কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েনি।
মরক্কো কি সত্যিই বিশ্বকাপ জয়ের দাবিদার?
বর্তমান সময়ে প্রতিভাবান প্রজন্ম পাওয়া দুই দলের লড়াইয়ে উজ্জ্বল ছিল মরক্কোই। কানাডার তারকা আলফনসো ডেভিস ইনজুরির কারণে বেঞ্চে বসে অসহায়ের মতো ম্যাচ দেখেছেন। মরক্কো স্টিফেন ইউস্তাকিওর কার্যকর পাসিং নিষ্ক্রিয় করে দেয় এবং কানাডার প্রধান স্ট্রাইকার জনাথন ডেভিডকে পুরো ম্যাচেই কার্যত খেলার বাইরে রাখে। অন্যদিকে মরক্কোর অধিনায়ক আশরাফ হাকিমি- যাকে বিশ্বের সেরা রাইট-ব্যাকদের একজন বলা হয়, তিনি বল নিয়ে যেমন বিপজ্জনক ছিলেন, তেমনি প্রতিপক্ষকেও নিয়মিত চাপে রেখেছেন। সৃজনশীল মিডফিল্ডার ব্রাহিম দিয়াজ করেছেন দুটি অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপে এখন তার মোট অ্যাসিস্ট সংখ্যা চারটি, যা আফ্রিকার যেকোনো ফুটবলারের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ম্যাচ শেষে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহাবি বলেন, প্রথমার্ধ ছিল অত্যন্ত তীব্র। বিরতিতে আমাদের কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আমরা কখনোই চাপমুক্ত ছিলাম না। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা নিজেদের পরিচয় বদলাইনি, খেলার দর্শন বদলাইনি। অনেক ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে, আমরা সবচেয়ে ভালোটি বেছে নিয়েছি। এটি বিশ্বকাপ। এখানে কঠিন মুহূর্ত আসবেই। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যখন আমরা সেরা খেলাটা খেলতে পারছি না, তখনও আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে আমরা কার জন্য খেলছি এবং কেন খেলছি।
এই জয় মরক্কোকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে দিয়েছে। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের মতো এবারও তারা প্রথম পাঁচ ম্যাচ পেরিয়ে শেষ আটে উঠেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মরক্কো চারটি ম্যাচ জিতেছে- দুটি ২০২২ সালে এবং দুটি ২০২৬ সালে। আফ্রিকার বাকি সব দেশের সম্মিলিত নকআউট জয়ের সংখ্যাও ঠিক চারটি। আর মাত্র একটি জয় পেলেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২২ বিশ্বকাপের সাফল্যের সমান হবে। ওই বছর তারা ইতিহাসের প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছিল।
তাই মরক্কো অবশ্যই শিরোপার দাবিদার। তবে এখনো অনেকের ধারণা, দলটি তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতার পরীক্ষা পুরোপুরি দেয়নি। উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে তারা মুগ্ধ করেছিল। এরপর স্কটল্যান্ডকে কঠিন লড়াইয়ে হারায় এবং হাইতির বিপক্ষে ৪-২ গোলের রোমাঞ্চকর জয় তুলে নেয়।
শেষ ৩২-এর ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মরক্কোই ছিল ভালো দল। কিন্তু বিদায় এড়াতে তাদের যোগ করা সময়ের একটি হেডারের প্রয়োজন হয়েছিল। কানাডার বিপক্ষে শেষ পর্যন্ত জয় স্বস্তিদায়ক হলেও সেটি এতটা মানসম্পন্ন ছিল না যে সম্ভাব্য কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে সব সংশয় দূর হয়ে যায়।
সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা
মরক্কো ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় বোস্টনে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলবে। বিবিসি ফাইভ লাইভের বিশ্লেষক ক্রিস সাটন বলেন, মরক্কো মোটেও তাদের সেরা খেলাটা খেলেনি। সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। শুরুতে তাদের মন্থর খেলায় আমি অবাক হয়েছি। কানাডাকে হয়তো কিছুটা হালকাভাবে নেয়া হয়েছিল। তাদের পারফরম্যান্সে কিছু একটা ঠিক ছিল না। তিনি বলেন, দ্বিতীয়ার্ধে মরক্কো এত খারাপ খেলবে, এমনটা হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। ম্যাচ যত এগিয়েছে, তারা তত শক্তিশালী হয়েছে। প্রতি-আক্রমণে তারা ভয়ংকর। কিন্তু যদি ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে এবং মরক্কো প্রথমার্ধের মতো খেলে, তাহলে তারা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।
তবুও এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইতিহাসে আফ্রিকার প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার সবচেয়ে ভালো সুযোগ এখন এই মরক্কো দলেরই।
রাতারাতি আসেনি এই সাফল্য
মরক্কোর এই সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই উত্তর আফ্রিকার এই দলের সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি। ২০০৯ সালে তার নামে একটি ফুটবল একাডেমি এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে একটি আধুনিক প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স চালু করা হয়। এই দুটি উদ্যোগ মরক্কোকে আফ্রিকার সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিংধারী দলে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ওয়াহাবি বলেন, আজ মরক্কোর ফুটবলে যা কিছু ঘটছে, তার সবকিছুর জন্যই ধন্যবাদ রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠকে। গত কয়েক বছরে তিনি বিপুল বিনিয়োগ করেছেন, বিশেষ করে এই একাডেমিতে।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে চারটি বিশ্বকাপের তিনটিতে খেললেও এরপর মরক্কো টানা ২০ বছর বিশ্বকাপে উঠতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি এই বিনিয়োগ সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। পাশাপাশি বিদেশে বসবাসকারী মরক্কীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের দলে আনার সুযোগও তৈরি হয়। আশরাফ হাকিমি ও ব্রাহিম দিয়াজ- দু’জনই স্পেনে জন্মগ্রহণ করেছেন। এই প্রক্রিয়া মরক্কোকে শুধু প্রতিযোগিতামূলক দলই বানায়নি, বরং আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে। আজ এটি আফ্রিকার পাশাপাশি আরব বিশ্বের অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য মডেলে পরিণত হয়েছে। চার বছর আগের তুলনায় মরক্কোর দলটির ব্যক্তিত্বও এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওয়াহাবি বলেন, এটি আর কোনো বিস্ময় নয়। আজ মরক্কো আর চমক নয়। তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ মরক্কোকে সত্যিকারের শিরোপা-প্রত্যাশী, ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হিসেবে দেখে। এটি আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। এটি কেবল শুরু। আশা করি আগামী বহু বছর আমরা একইভাবে বিশ্বকাপে ভালো খেলতে পারব। আমরা এগিয়ে যেতে চাই, থেমে যেতে চাই না।
কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর সাফল্যে বিস্ময়ের ছাপ ছিল। কিন্তু উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা পরিচালিত হচ্ছে সুস্পষ্ট লক্ষ্য, আত্মবিশ্বাস এবং পরিকল্পনা দিয়ে।
তাই এটি আর কোনো ফুটবল রূপকথা নয়।