অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুষম খাবার গ্রহন না করার কারনে অনেকেই আজকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন। শরীর সুস্থ রাখতে হলে চাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং স্বাস্থ্যগঠনের উপযোগী খাদ্যগ্রহণ করা। সকলেরই স্বাস্থ্যবিধি নিষ্ঠার সাথে মেনে চলা ও পরিমিত ও সুষম খাদ্যগ্রহণ করা উচিৎ।
রোগমুক্ত সুস্থ সুন্দর জীবনের জন্য নিয়ম মেনে চলার বিকল্প নেই। অনিয়ম করলেই শরীর অসুস্থ হবে। সুষম খাবার গ্রহণ, পরিমিত ঘুম ও হালকা ব্যায়াম যে কোন বয়সের মানুষকে সুস্থ রাখবে। এই সাথে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে জীবন হবে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধময়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্লানিং এন্ড মনিটরিং ইউনিটের সহযোগি গবেষণা পরিচালক মোস্তফা ফারুক আল বান্না বলেন, সুস্বাস্থ্যের জন্য সুষম খাবার গ্রহণ ও প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা গাছ-গাছালিযুক্ত খোলা জায়গায় কিছু সময় বেড়ানো ও মুক্ত বাতাস গ্রহণ বিশেষ উপকারী।
সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে ওঠা শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য উত্তম। প্রতিদিন আট ঘণ্টার বেশি ঘুমানো উচিত নয়। ঘুম কম বা বেশি হলে তা ক্ষতিকর। শিশু ও রোগী ছাড়া প্রাপ্ত বয়স্কদের দিনের বেলা না ঘুমানোই ভালো। দুপুরে খাওয়ার পর আধাঘণ্টা বিশ্রাম করুন। রাতে খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়া অনুচিত। রাতে খাওয়ার পর কিছুটা হাঁটাহাঁটি করুন। এরপর রাত ন’টা-দশটার মধ্যে শুয়ে পড়া উচিত।
যে বাড়িতে থাকবেন সেখানে যেন প্রচুর আলো-বাতাস আসতে পারে তা নিশ্চিত করুন। বাড়ির আশপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যাতে বায়ু দূষিত না হয়। স্যাঁতস্যাঁতে আলো-বাতাসহীন ঘরে বাস করবেন না, তাতে নানা রোগ আক্রমণ করতে পারে।
শ্রম শরীরের পক্ষে উপকারী। তবে সাত-আট ঘণ্টার বেশি শ্রম করা ভাল নয়। শ্রমের জন্য খাদ্য ও বিশ্রাম প্রয়োজন। যাঁরা মানসিক পরিশ্রম বেশি করেন, তাঁদের নিয়মিত কিছু বিশ্রাম করা উচিত। যেমনÑ দৌড়া-দৌড়ি বা মুক্ত স্থানে ভ্রমণ, সাঁতার কাটা ইত্যাদি। কৈশোরে ও যৌবনে উপযুক্ত ব্যায়াম করতে হয়। তবে চল্লিশ বছর বয়সের পর খুব বেশি ব্যায়াম করা ক্ষতিকর। এই বয়সে নিয়মিত হাঁটা বা ভ্রমণ করাই হলো শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম।
অমিতাচার, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, রাত জাগরণ, মদপান, ধূমপান, জর্দা, গুল, কিংবা নেশা শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক।
প্রতিদিন যাতে ২/১ বার পরিষ্কারভাবে পায়খানা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। যদি কোষ্ঠকাঠিন্য হয় তাহলে যেসব খাদ্য খেলে পায়খানা পরিষ্কার হয়, যেমনÑ ফলমূল, শাকসব্জি, বেল প্রভৃতি খাদ্য তালিকায় রাখুন।
খাদ্য গবেষক মোস্তফা ফারুক আল বান্না আরও বলেন, মাঝে মাঝে রোজা রাখা বা হাল্কা খাবার খেয়ে দিন কাটালে শরীরের উপকার হয়। প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ভাল। অনিয়মিত আহার শরীরের পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকারক।
সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন থাকুন। দিনে একবার বা দুবার গোসল করুন। পোশাক-পরিচ্ছদ, বিছানা ও ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখতে হবে। তাতে মন প্রফুল্ল থাকবে। মন খারাপ হলে বন্ধু-বান্ধব কিংবা প্রিয় মানুষের সাথে গল্প করে সময় কাটান ও মনকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করুন।
বেশি বেশি পানি পান করুন -
ঘুম থেকে ওঠে প্রথমেই যা করবেন তা হলো কয়েক গ্লাস পানি পান করুন। যা শরীরকে সতেজ করে তুলবে। বেশিরভাগ মানুষ সকালে এক গ্লাসের বেশি পানি পান করতে পারেন না। তাই পানির সঙ্গে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খেতে পারেন। কম পক্ষে দুই-তিন গ্লাস পানি অবশ্যই পান করতে হবে। খাবার পানি যেন পরিষ্কার ও বিশুদ্ধ হয়। যে পাত্রে পানি থাকবে তার মুখ যেন সব সময় ঢাকা থাকে।
সকালের নাস্তা হবে ভরপেট-
যতই তাড়াহুড়া থাকুক না কেন, নাস্তা না করে বের হবেন না। সকালে নাস্তা সারাদিনের চালিকাশক্তি। রুটি সবজি বা ব্রেড বাটার যাই খান না কেন ভরপেট খেতে হবে। তারপর দুপুরে হালকা কিছু খেয়ে নেবেন।
বেশি করে ফল খান-
বাইরে বের হওয়ার সময় সঙ্গে ফল রাখুন। চলতে চলতে একটি ফল খেয়ে নিন। এতে শরীরে অ্যান্টি অক্সিডেন্টের সরবরাহ হবে। আপনিও সতেজ থাকবেন। অনেক সময় দেখা যায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনি এমনই ব্যস্ত, খাবারের সময় বের করা কঠিন। সে সময় সঙ্গে বেশি করে ফল রাখুন। সারাদিন কাজের ফাঁকে ফল খান। ফল একাধারে আপনার শরীরে পুষ্টি, ভিটামিন এবং সুগারের জোগান দেবে।
ফাস্ট ফুড এড়িয়ে চলুন-
বন্ধু, সহকর্মী বা একা যেভাবেই বাইরে খেতে যান না কেন, কখনও জাঙ্ক ফুড যেমন : বার্গার, ফ্রেন্স ফ্রাই অর্ডার করবেন না। সেক্ষেত্রে স্যালাড বা হেলদি খাবার অর্ডার করুন। কেননা জাঙ্ক ফুড আপনার ক্যালরির চাহিদা তো মেটাবেই না, উল্টো শরীরের অপ্রয়োজনীয় কিছু চর্বি জোগান দেবে। বৃদ্ধ বয়সে খাদ্যের পরিমাণ অবশ্যই পরিমিত করা দরকার অর্থাৎ অল্প-সল্প করে ঘন ঘন খাওয়া উচিৎ। ওই বয়সে গোভোজন করলে বহুমূত্র বা ব্লাডপ্রেসার হয়ে থাকে।
হার্বাল চা পান করুন-
কাজের ফাঁকে চা-কফি পান করা আমাদের অনেকেরই পছন্দের তালিকায় শীর্ষে থাকে। চা-কফি আসলে শরীরকে অল্পসময়ের জন্য সতেজ করে তুললেও এটির পরোক্ষ ক্ষতিও আছে। সেক্ষেত্রে হার্বাল টি পান করার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। আমাদের দেশে হার্বাল টি পানকারীর সংখ্যা তেমন না হলেও স্বাস্থ্য সচেতন যারা তারা কিন্তু ঠিকই হার্বাল টি পান করেন। তাছাড়া আদা, লেবুর চা পান করতে পারেন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
-
অফিসে বা বাসায় কাজের ফাঁকে অবশ্যই কয়েক মিনিট হালকা ব্যায়াম করে নিন। ধরুন আপনি অফিসে কাজ করছেন ৩০ মিনিট পর চেয়ার থেকে ওঠে একটু হেঁটে নিন বা কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে নিন। বসে বসেও ব্যায়াম করতে পারেন। হালকা ব্যায়াম করলে ব্যাকপেইন বা কোমর-পিঠের ব্যথা কম হবে।
গরমে বাদাম খান-
মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের অনেকেরই ধারণা বাদাম খেলে শরীরের ফ্যাট জমে। আসলে কথাটা একদম সত্যি নয়। প্রতিদিন বিকাল ৩টা নাগাদ একমুঠো বাদাম খান। আর কোন দামী বাদাম না হলেও একমুঠো চিনাবাদাম খান যা আপনার হাতের কাছেই সব সময় পাওয়া যায়। বাদাম আপনাকে বাড়তি শক্তি জোগাবে, সেই সঙ্গে সুস্থ রাখবে আপনার ত্বক ও চুল।
চিপস-চানাচুরকে না বলুন-
কর্মজীবীদের খাদ্য তালিকায় প্রথমেই থাকে এসব খাবার। মুখরোচক এসব খাবার আপনাকে শুধু ফ্যাটই করে তুলবে না, আপনার ক্ষুধাও নষ্ট করে দেবে।
জুস খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন -
প্রতিদিন সকালে যে কোনো ফলের একগ্লাস জুস পান করুন। দেশি-বিদেশি যা আপনার পছন্দ। অনেকে আবার লেবুর জুস খেতেও পছন্দ করেন। তবে হ্যাঁ, যাদের এসিডিটির সমস্যা আছে তারা লেবুর জুসটা এড়িয়ে চললে ভালো। ডায়াবেটিস ও কিডনি রুগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জুস খাবেন।
বেশি করে শ্বাস নিন-
যতই ব্যস্ত থাকুন না কেন, ঘণ্টাখানিক পর পর জোরে জোরে শ্বাস নিন। একনাগাড়ে কাজ করলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। তাই জোরে জোরে শ্বাস নিলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের সরবরাহ হয়। শ্বাস নিলে মাথাব্যথা বা মাইগ্রেন বা ক্লান্তি আপনার আশপাশে আসবে না। এতে আপনি থাকবেন ফ্রেস আর আপনার সেলগুলোও থাকবে সতেজ।
লবণকে না বলুন-
আমাদের অনেকেরই বদঅভ্যাস হচ্ছে, কোনো খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ খাওয়া। অতিরিক্ত লবণ শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি উচ্চ রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এমনিতেই আমরা সব খাবার থেকেই লবণ পাচ্ছি। তাই অতিরিক্ত লবণকে না বলুন।
প্রাণ খুলে হাসুন-
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অন্যতম মূলমন্ত্র হচ্ছে সারাদিনে বেশ কয়েকবার প্রাণ খুলে হাসুন। হাসি এমন এক ধরনের ওষুধ যা আপনি বিনা পয়সায় পাবেন। আমাদের চারপাশে যেমন নানা রকম চাপ আছে, তেমনি হাসির খোরাকও আছে। তাই সবসময় চাপকে না দেখে হাসির উপাদানগুলো দেখুন। প্রাণ খুলে হাসুন। সুস্থ থাকুন।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন-
বাইরে থেকে এসে লম্বা একটা গোসল দিন। এই গরমে খাবারের পাশাপাশি নিজস্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অনেক জরুরি। কেননা আপনি যতটাই খাবার-দাবার মেনটেইন করুন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকলে রোগবালাই শরীরে বাসা বাঁধবে। তাই নিজেকে সুস্থ রাখতে হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই।
মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে পুষ্টিকর খাবার খান-
আমাদের দেহ পরিচালনা করে মস্তিষ্ক। দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই মস্তিষ্কের উপর নির্ভরশীল। দেহের সুস্থতার কারণে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখা প্রয়োজন। পুষ্টিকর খাবার খাওয়া মস্তিষ্কের সুস্থতার জন্য একান্ত জরুরি।
শরীর সুস্থ রাখতে ফলমূল ও শাকসবজির ভূমিকা-
খাদ্য গবেষক মোস্তফা ফারুক আল বান্নার মতে, ফলমূল ও শাকসবজিকে বলা হয় রোগ প্রতিরোধের খাদ্য। ফল রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর হলেও আমরা অনেক সময় ফলকে খাদ্য হিসেবে গুরুত্ব দিই না। পুষ্টিবিদদের মতে, দৈনিক প্রায় ১১৫ গ্রাম ফল গ্রহণ করা প্রয়োজন। অথচ আমরা অনেক কম ফল গ্রহণ করি। ফলে রাতকানা, রক্তস্বল্পতা, বেরিবেরি, স্কার্ভি ইত্যাদি পুষ্টি উপাদানের অভাবজনিত রোগের হার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
ফলের মধ্যে দেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ভিটামিন, খনিজ লবণ ও আঁশ থাকে। এসব উপাদান পুষ্টি ছাড়া ও হজম-পরিপাক বিপাক, রুচি বৃদ্ধি, বদ হজম ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
আমাদের দেশে প্রতি মৌসুমেই কোন না কোন ফল পাওয়া যায়। গ্রীষ্মে আম, কাঁঠাল, লিচু, জাম, ভাংগি, তরমুজ, ডালিম, আনারসের বিশাল সমারোহ ঘটে। শীতে পাওয়া যায় কমলা, আঙ্গুর, বরই, সফেদা, করমচা প্রভৃতি। এছাড়া কিছু বারোমাসী ফলও পাওয়া যায়- পেঁপে, কলা ও নারকেলের নাম এখানে উল্লেখ করা যায়। দেশে উৎপাদিত এসব দেশী ফলমূল যেমন সস্তা ও সহজলভ্য, তেমনি সুস্বাদু। পুষ্টিতে ভরা ও তৃপ্তিদায়ক।
পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা ছাড়াও শাকসবজি দেহের হজমের কাজে সহায়তা করে। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে। দামী মাছ, মাংস যোগাড় করতে না পারলে তার জন্য দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা শাকসবজি খেয়ে দীর্ঘ, সুস্থ জীবন লাভের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ইতিকথায় বলতে হয়, সুষম খাদ্যের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবন অতিবাহিত করলে সহজে সুস্থ থাকা যায়।
আলম শামস
কবি ও সাংবাদিক
দৈনিক ইনকিলাব, ঢাকা।
মোবাইল ০১৯১১১১৬১৩৪৪
E-mail- [email protected]