২০২৩ সালের এক ব্রিফিংয়ে চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র উ কিয়ান জানান যে, গত ২৪০ বছরের ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্র মাত্র ১৬ বছর যুদ্ধহীন ছিল। সাম্প্রতিক যুদ্ধ অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই পরিসংখ্যান কেবল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষার্থীদেরই ভাবিয়ে তোলে না, বরং রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষণাতেও নতুন খোরাক জোগায়। সামরিক তাত্ত্বিক ক্লজউইৎস তাঁর ‘অন ওয়ার’ (১৮৩২) গ্রন্থে বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা।’ কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা: আধুনিক যুদ্ধ কি আসলে ‘অন্য উপায়ে অর্থনীতির ধারাবাহিকতা’? স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব যখন ‘শান্তির লভ্যাংশ’ নামক এক স্বর্ণযুগের প্রত্যাশা করছিল, ঠিক তখনই পেন্টাগনের বাজেট, সামরিক ঘাঁটির বৈশ্বিক বিস্তৃতি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের পুঁজিবাজার আমাদের ভিন্ন এক গল্প শোনাতে শুরু করে। সেই গল্পের মূল উপজীব্য হলো, বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার জন্য যুদ্ধকে একটি স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা। সামরিক-শিল্প-কমপ্লেক্স তার স্বার্থে ‘স্থায়ী যুদ্ধের অর্থনীতি’ তৈরি করেছে, যেখানে সংঘাত কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং পুঁজির পুনরুৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের নিত্যনতুন পুনর্বিন্যাসেরই নামান্তর। মার্কিন সামরিক-শিল্প-কমপ্লেক্স যখন যুদ্ধকে পুঁজি করছে, তখন গ্লোবাল সাউথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে শক্তির কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে নিচ্ছে। বিগত কয়েক দশকের বহুমেরুর উত্থান এবং সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের ফলাফল একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ওয়াশিংটনের একক আধিপত্য আর টেকসই নয়। এই প্রেক্ষাপটটি কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তন নয়, বরং অলিগার্কিক কাঠামোর বাহ্যিক সমর্থনের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক পদচিহ্নের ভৌগোলিক বিন্যাস এক কৌতূহলোদ্দীপক চিত্র উপস্থাপন করে। ভাইনের ‘বেস নেশন’ (২০১৫) এবং ওবিআরএসিসি (২০২৫)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবস্থান মোটেও দৈবক্রমে নির্ধারিত হয়নি। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার’ (২০২৪) প্রকল্পের বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, এগুলোর সিংহভাগই পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পূর্ব ইউরোপের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্প বলছে, ২০০১ এর ৯/১১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক অভিযানে অন্তত ৯ লক্ষ ৪০ হাজার মানুষ (৪,৩২,০০০ জন সাধারণ নাগরিক) প্রাণ হারিয়েছেন। তবে এটি মহাসমুদ্রের উপরিভাগ মাত্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মহামারি, চরম অপুষ্টি এবং অবকাঠামোগত ধসের ফলে সৃষ্ট পরোক্ষ মৃত্যুর সংখ্যা যোগ করলে মোট সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ লক্ষ। অর্থাৎ, গত আড়াই দশকে এই যুদ্ধের শিকার হয়েছেন সব মিলিয়ে প্রায় অর্ধ-কোটি মানুষ, যা আধুনিক ইতিহাসের এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরে। ওয়ালারস্টাইনের (১৯৭৪) বিশ্ব-ব্যবস্থা তত্ত্বের আলোকে দেখলে বোঝা যায়, এই মৃত্যুগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি এক্সটারনালাইজেশন অফ কস্ট। বিশ্ব-অর্থনীতির ‘কেন্দ্র’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার পেরিফেরি অঞ্চলগুলোর ওপর সামরিক আধিপত্য বজায় রাখে; যেন জ্বালানি সম্পদের নির্বিঘœ সরবরাহ, বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ এবং ডলারকেন্দ্রিক আর্থিক কাঠামোর স্থিতিশীলতা অক্ষুণœ থাকে। বলা হয়, এই ঘাঁটিগুলো ‘মিত্ররক্ষা’, ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’ ও ‘বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায়’ নিয়োজিত। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এগুলো হলো ক্ষমতা প্রদর্শনের এমন এক স্থায়ী অবকাঠামো, যা ওয়াশিংটনকে যেকোনো ভূরাজনৈতিক সংকটে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগ, আঞ্চলিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষার সক্ষমতা প্রদান করে। অন্য কথায়, বিশ্বের দুর্বলতর কিন্তু সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোতে যুদ্ধ আসলে বিশ্বপুঁজিবাদের স্থিতিশীলতা রক্ষারই একটি সহিংস অথচ গাণিতিকভাবে পূর্বপরিকল্পিত ব্যয়। এদিকে, ব্রিকস দেশগুলোর ক্রয়ক্ষমতা এখন জি-সেভেনকে ছাড়িয়ে গেছে এবং তারা বিশ্বের ৪০% বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন সামরিক ঘাঁটির মাধ্যমে ব্যয়বহুল আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে, তখন গ্লোবাল সাউথের এই অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাস এককেন্দ্রিক ক্ষমতার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণকে অকার্যকর করে দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, সামরিক শক্তির চেয়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের শক্তি এখন বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে বেশি সক্ষম।

বিশ্বপুঁজিবাদের ক্যারোটিড ধমনীখ্যাত হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরানের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান রাজনৈতিক অর্থনীতির এক ধ্রুপদী পাঠ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বর্ণিত ‘কারিগরি সীমাবদ্ধতা’ কিংবা মার্কিনদের ‘হারানো মাইন’ অভিযোগটি কোনো প্রযুক্তিগত অসহায়ত্ব নয়; বরং এটি নৌপথটিকে ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে’ রেখে আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’র এক নিপুণ প্রয়োগ। ইতিহাস সাক্ষী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের উপকূলে মার্কিন ‘অপারেশন স্টারভেশনে’র আওতায় পেতে রাখা মাইন সরাতে কয়েক বছর লেগেছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যকে কাজে লাগিয়ে ইরান প্রমাণ করছে, কীভাবে অপেক্ষাকৃত স্বল্প ব্যয়ের অপ্রতিসম অস্ত্র দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ধাক্কা সৃষ্টি করে কূটনৈতিক শর্ত চাপানো সম্ভব। ইসলামাবাদ বৈঠকের আগেই তেহরানের দেওয়া চার পূর্বশর্ত (হরমুজে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব, যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ, জব্দকৃত সম্পদ মুক্তি এবং আঞ্চলিক স্থায়ী যুদ্ধবিরতি) তাদের অনমনীয় মনোভাবেরই বহিঃপ্রকাশ। প্রণালী খুলে দেওয়ার মার্কিন দাবির বিপরীতে তাই ইরানের স্পষ্ট ও কড়া বার্তাÑ যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জন করতে পারেননি, আলোচনার টেবিলেও তা পাবেন না।

ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার কূটনৈতিক ম্যারাথন শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার ভাষায় ‘সর্বশেষ ও সর্বোত্তম প্রস্তাবে’ স্পষ্ট বার্তা দেন: বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করতে হবে। অথচ, এনপিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা এবং আইএইএ-এর পরিদর্শনের বাইরে থাকা ইসরাইলের অঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রভা-ার নিয়ে বৈশ্বিক কূটনীতি বিস্ময়করভাবে নীরব। এটি কোনো নৈতিক ত্রুটি নয়; বরং হেজেমনিক আইনের এক পূর্বপরিকল্পিত কাঠামো, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন নিরপেক্ষ বিচারের বদলে মিত্রতা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই দ্বৈত নীতির মর্মান্তিক প্রকাশ ঘটে গাজা ইস্যুতে। গাজায় ইসরাইলি অভিযানের প্রেক্ষিতে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগ আনলে আদালত একাধিক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দেয় এবং বিশ্বজুড়ে মানবিক বিপর্যয়ের উদ্বেগ ওঠে। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্রদের পদক্ষেপে গাজা গণহত্যা নিয়ে সেই জরুরি নৈতিকতার লেশমাত্র দেখা যায় না, যেটা ইরানের ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ সংলাপে মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে, একপক্ষের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষা যখন ‘বৈশ্বিক হুমকি’ হয় এবং অন্যপক্ষের সক্ষমতা ‘কৌশলগত অস্পষ্টতার’ আড়ালে নীরব সম্মতি পায়; কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের ন্যায়বিচার যখন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে গৌণ হয়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক আইনের সার্বজনীনতা মৌলিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ যেন এক বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের বাজার, যেখানে নৈতিকতার মুদ্রা কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য ও মিত্রতার সমীকরণেই নির্ধারিত।

এদিকে, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং ব্রিকসের মাধ্যমে ডি-ডলারাইজেশন ও বিকল্প আর্থিক কাঠামোর উত্থান ঘটছে। ফলে ইরান বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন আর পশ্চিমা অবরোধের কাছে নতি স্বীকার করছে না। তিয়ানজিন এসসিও সম্মেলন পরবর্তী বিশ্বে এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বায়নের বিকল্প মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের দ্বৈত নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভিত্তি প্রদান করছে।

আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সিলেক্টিভ প্রয়োগের এক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত সম্প্রতি দক্ষিণ লেবাননে দৃশ্যমান। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে যে ইসরাইল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ক্লাস্টার মিউনিশন ব্যবহারের অভিযোগ তুলে জরুরি বৈঠকের দাবি করেছিল, আজ তারাই দক্ষিণ লেবাননের বেসামরিক এলাকায় সাদা ফসফরাস ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর বিধ্বংসী প্রয়োগ এবং এর ফলে সৃষ্ট অপূরণীয় ক্ষত আন্তর্জাতিক রীতিনীতিতে যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য। এই দ্বৈত নীতি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি হেজেমনিক বৈধতা কাঠামোর একটি পূর্বনির্ধারিত বৈশিষ্ট্য। বৈশ্বিক শক্তিগুলো প্রতিপক্ষের বেলায় যেখানে দ্রুত নিন্দা, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক তদন্তের পথে হাঁটে; ঘনিষ্ঠ মিত্রের বেলায় সেই সুর রূপান্তরিত হয় ‘সতর্কতার আহ্বান’, ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ বা ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে’-র মতো কূটনৈতিক শব্দজ্বালে। ফলে, আন্তর্জাতিক আইন তার সার্বজনীন চরিত্র হারিয়ে নিছক ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হয়। গ্লোবাল সাউথের রাষ্ট্রগুলোর কাছে এই নির্বাচনী ন্যায়বিচার এক সুষ্পষ্ট বার্তা বহন করেÑ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নৈতিক কম্পাস কোনো সার্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ দ্বারা নয়, বরং পরিচালিত হয় ভূরাজনৈতিক স্বার্থ ও জোটের অদৃশ্য হাতে।

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের আভাস মিলছে ওয়াশিংটনের মিত্রশিবির থেকে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সাম্প্রতিক মন্তব্য, ‘আমাদের সামরিক বাজেটের প্রতি ডলারের ৭০ সেন্ট যুক্তরাষ্ট্রের পকেটে যাওয়ার দিন শেষ’। কানাডা এখন মার্কিন অস্ত্রব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পথে হাঁটছে। এই প্রবণতা বিচ্ছিন্ন নয়; স্পেন মার্কিন সামরিক পরিকল্পনায় অস্বীকৃতি ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি প্রত্যাহার করেছে, ফ্রান্স ও সুইডেন ইউরোপীয় প্রতিরক্ষায় স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হচ্ছে এবং যুক্তরাজ্য হরমুজ প্রণালীর নৌ-পরিকল্পনায় মার্কিন নেতৃত্বের বাইরে পৃথক সমন্বয় করছে। এই ঘটনাপ্রবাহকে ব্যাখ্যা করতে আমাদের ফিরে যেতে হয় ব্যান্ডওয়াগনিং ও ব্যালান্সিং-এর মৌলিক ধারণায়। ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রজোটের ভিত্তি ছিল ‘ব্যান্ডওয়াগনিং’ বা পরাশক্তির ছত্রছায়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আধিপত্যবাদী শক্তির নির্ভরযোগ্যতা হ্রাস, ইরান যুদ্ধে পরাজয়ের গুঞ্জন এবং ট্রাম্পের ‘নিজেদের তেল নিজেরাই সংগ্রহ করো’র মতো অবজ্ঞাসূচক কূটনীতি ওয়াশিংটনের প্রদত্ত নিরাপত্তা ভর্তুকিকে মিত্রদের কাছে অসহনীয় ও অনির্ভরযোগ্য করে তুলেছে।

এতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, আন্তর্জাতিক অলিগার্কির স্বার্থ যখন মিত্রদের জাতীয় স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন মিত্ররা তাদের নির্ভরতার কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। ইরান ও গাজা সংকটে আন্তর্জাতিক অলিগার্কির যে ‘হৃদয়ের অন্ধত্ব’ এবং একপাক্ষিক নিষ্ক্রিয়তা আমরা দেখেছি, তা গ্লোবাল সাউথের পাশাপাশি খোদ পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যেও নৈতিক ও কৌশলগত ফাটল সৃষ্টি করেছে। ফলস্বরূপ, মিত্ররা ব্যান্ডওয়াগনিং পরিত্যাগ করে সফট ব্যালান্সিং নীতি গ্রহণ করছে, তারা স্বাধীন সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তুলে বিকল্প শক্তিকেন্দ্র সৃষ্টি করছে। এটি বহুমেরু বিশ্বায়নের এক অমোঘ ইঙ্গিত, যেখানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ কেবল চীন, রাশিয়া বা ইরানের উত্থানে নয়, বরং ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের আকাক্সক্ষার মাধ্যমে ত্বরান্বিত হচ্ছে। আধিপত্যের স্থাপত্য যখন নিজ ভিত থেকেই ক্ষয়িষ্ণু হয়, তখন বিশ্বরাজনীতির মেরুকরণ অনিবার্যভাবেই নতুন সমীকরণের দিকে ধাবিত হয়।

মার্কিন বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়; বরং এটি ডলার-জ্বালানি-প্রভাব বলয় নিয়ন্ত্রণের একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্রকল্প। আড়াই শতাব্দীতে দেশটির মাত্র ১৬ বছর যুদ্ধহীন থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সামরিক-শিল্প-কমপ্লেক্স ও পেট্রোডলার চক্র দ্বারা চালিত আধিপত্যবাদী কাঠামোর অনিবার্য পরিণতি। ইসলামাবাদের প্রথম আলোচনার ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে, ইরান বা সমগোত্রীয় আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন আর নিছক আজ্ঞাবহ নয়; বরং তারা অপ্রতিসম কৌশল ও দক্ষ মানবসম্পদকে পুঁজি করে শক্তির সমীকরণ বদলে দিতে সক্ষম। গাজা থেকে হরমুজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনের নির্বাচনী প্রয়োগ এবং পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দ্বৈত নীতি বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের সার্বজনীনতাকে ধূলিসাৎ করেছে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, শহীদ বুদ্ধিজীবী সরকারি কলেজ, রাজশাহী
Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews