ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সুবিধাভোগী মাফিয়া সিন্ডিকেটগুলোর বিচার করা। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালীন সময়ে সেই লক্ষ্যের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা প্রয়াত কাজী শাহেদ আহমেদের নেতৃত্বাধীন জেমকন গ্রুপের বিতর্কিত সাম্রাজ্য এবং তার তিন পুত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকা সত্ত্বেও তাদের যথাযথ বিচারের আওতায় না আলায় ড. ইউনূস সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।



সম্প্রতি আলোচিত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও প্রবাসী লেখক পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি অনুসন্ধানী ভিডিওতে এসব বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। জেমকন গ্রুপের ‘মাফিয়া’ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী উপদেষ্টার মদদ ছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।



উল্লেখ্য, কাজী শাহেদ আহমেদ ও তার পরিবারকে খুনি হাসিনার শাসনামলের একটি শক্তিশালী 'মাফিয়া' কাঠামোর মূল হোতাদের একজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। জেমকন গ্রুপ, মিনা বাজার, বাংলা ট্রিবিউন, জেম সিফুড এবং জেমকন সিটি লিমিটেডের মতো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে তারা দেশে বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।



অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থেই কাজ করেনি, বরং হাসিনার ঘনিষ্ঠজনদের সাথে মিলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও প্রভাব বিস্তারে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)-এর মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেও তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।



অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদের পাহাড়সহ জেমকন গ্রুপের ভয়াবহ যত অপকর্ম

জানা যায়, কাজী শাহেদের তিন পুত্র—কাজী নাবিল আহমেদ, কাজী আনিস আহমেদ এবং কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের ভয়াবহ সব অভিযোগ রয়েছে। দুবাইসহ বিভিন্ন দেশ ব্যবহার করে এই পরিবারটি অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে।



দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, কেবল কাজী আনিস আহমেদ এবং কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধেই শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। কাজী আনিস আহমেদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ ৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সম্পদ অর্জন এবং ২০টি ব্যাংক হিসাবে ৭৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে। আর কাজী ইনাম আহমেদের বিরুদ্ধে ৩২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ১৪টি ব্যাংক হিসাবে ৭৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ রয়েছে।



প্রবাসী লেখক পিনাকী আরও জানান, হাসিনার আমলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যে খাম্বা দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছিল মূলত তার সাথে জড়িত ছিল আওয়ামী দোসর এই জেমকন গ্রুপ। সেসময় ১০০ কোটি টাকা মূল্যের খুঁটি সংগ্রহ করছে এরকম চারটা প্রতিষ্ঠান ছিল। এর মধ্যে তিনট ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। পাঁচ বছরে আরইবির মোট খুঁটির বেশিরভাগ সরবরাহ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক ব্যবসায়ী কাজী শাহেদের প্রতিষ্ঠিত জেনকম গ্রুপের পাঁচটা প্রতিষ্ঠান। খাম্বার সাথে দুর্নীতিতে অতঃপ্রতভাবে আওয়মীপন্থী ব্যবসায়ী কাজী শাহেদের জেনকম জড়িত ছিল বলে উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।



জানা যায়, আদালতের নির্দেশে ইতোমধ্যে কাজী শাহেদ আহমেদের পরিবার এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিপুল সংখ্যক ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের মালিকানাধীন ফ্ল্যাট, প্লট এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে থাকা শেয়ারও আদালতের নির্দেশে জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে কাজী আনিস আহমেদ ও কাজী ইনাম আহমেদসহ এই পরিবারের সদস্যদের বিদেশ গমনে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।



ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণামূলক প্রতিষ্ঠান ছিল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক বয়ান তৈরির ক্ষেত্রে সিআরআই এবং জেমকন গ্রুপের মধ্যে একটি অদৃশ্য যোগসূত্র ছিল বলে জানান পিনাকী। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, জেমকন গ্রুপের মতো ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো কেবল ব্যবসা করেনি, বরং তারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী বা প্রচারণামূলক জায়গায় তাদের প্রভাব বজায় রেখেছিল।



অভিযোগ রয়েছে, সিআরআই এবং জেমকন গ্রুপের সাথে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা একই সুতোয় গাঁথা ছিলেন। তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে—যেখানে একদিকে ছিল রাজনৈতিক প্রচারণা (সিআরআই) এবং অন্যদিকে ছিল ব্যবসায়িক ও কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ। পিনাকীর মতে, সিআরআই হলো সেই প্ল্যাটফর্ম যা তৎকালীন সরকারকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রচারণামূলক সহায়তা দিত, আর জেমকন গ্রুপ সেই কাঠামোর ভেতরে থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা ভোগ করত এবং প্রভাব বিস্তারে সহায়তা করত। তিনি এদের সম্পর্ককে 'পার্টনারস ইন ক্রাইম' বা অপরাধের অংশীদার হিসেবে অভিহিত করেছেন।



এছাড়াও, জেমকন গ্রুপের মালিকদের বিরুদ্ধে ইউল্যাবের এক শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। জানা যায়, করোনা মহামারির সময় আর্থিক সংকটের কারণে বেতন কমানোর দাবিতে আন্দোলন করা বিশ্ববিদ্যালয়টির ২ শিক্ষার্থীকে প্রথমে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে সরকারে নিজেদের প্রভাব খাঁটিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ওই শিক্ষার্থীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ওঠে।  



বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, কাজী শাহেদ পরিবারের মতো প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। সমালোচকদের মতে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার তাদের এই 'সাম্রাজ্য' ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে, যা এক ধরনের 'সুরক্ষা' প্রদানের শামিল। অনেকের মতে, যারা সংস্কারের দায়িত্বে ছিলেন, তারা এই প্রভাবশালী চক্রের প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, অথবা যথাযথ তদন্ত করতে গড়িমসি করেছেন।



যদিও সাম্প্রতিক সময়ে কাজী ইনাম আহমেদসহ কয়েকজনের দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আদালত, তবুও সাধারণ মানুষের দাবি—এটি কেবল লোক দেখানো না হয়ে পূর্ণাঙ্গ বিচার প্রক্রিয়ার শুরু হতে হবে। জেমকন গ্রুপের বিরুদ্ধে আনা এই বিশাল অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগের স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন তারা।



জেমকন গ্রুপের মাফিয়া সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সচেতন মহলের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। তবে পিনাকী সম্প্রতি নতুন করে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ করায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। সচেতন সমাজের মতে, কাজী শাহেদ আহমেদের পরিবারের মতো প্রভাবশালীরা কীভাবে বছরের পর বছর রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে এবং তাদের এই বিশাল ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক কীভাবে অপরাধমূলক চক্রের সাথে যুক্ত ছিল, তার একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য। কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং তাদের তৈরি করা 'গডফাদার' বা মাফিয়া সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলতে বর্তমান সরকারের আরও কঠোর ও স্বচ্ছ অবস্থান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



সামাজিক মাধ্যমে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতা প্রশ্ন তুলেছেন, বিপ্লবের মূল চেতনা কি তবে এই মাফিয়া সিন্ডিকেটের সুরক্ষার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে? কাজী শাহেদ পরিবারের এই 'অপকর্মের নেটওয়ার্ক' ভেঙে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে কি আদৌ সচল করা সম্ভব হবে? সব চোখ এখন এই প্রভাবশালী পরিবারের বিরুদ্ধে বর্তমান বিএনপি সরকারের চূড়ান্ত আইনি পদক্ষেপের দিকে। তথ্যসূত্র: পিনাকীর অনুসন্ধানী ভিডিও



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews