হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত কখনোই মুসলমান সংখ্যাধিক্য বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়নি। হিন্দুত্ববাদীদের মুসলিম বিদ্বেষী অবস্থানের কারণে এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে পাকিস্তানের সাথে পেরে উঠতে না পারায় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙ্গার কৌশল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করেছিল। এর ফলে একঢিলে দুই পাখি মারতে সক্ষম হয় ভারত। প্রথমত: ইস্টার্ণ ফ্রন্টে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে নজরদারি ও প্রতিরক্ষা বাজেট সীমিত করা সম্ভব হয়; দ্বিতীয়ত: বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ লুটপাট চালিয়ে বছরে হাজার হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে ভারত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার ভিত্তি রচনা করতে সক্ষম হয়। তবে বাকি দুনিয়া থেকে তাদের পিছিয়ে পড়ার চিত্র এখনো এতটাই প্রকট যে, এই একবিংশ শতকে এসেও অর্ধেক ভারতীয় এখনো টয়লেট ব্যবহার করতে শেখেনি। এখনো তারা ঝোপ-জঙ্গলে টয়লেটের কাজ সারতে অভ্যস্ত। কিন্তু তারা এমন এক অদ্ভুত জাতি যে, গোবর-গোমুত্রে সর্বরোগের প্রতিবিধান খুঁজে পায়। মহাভারতের পৌরাণিক যুগে রকেট ক্ষেপনাস্ত্র, ইন্টারনেট, গুগোলসহ এ সময়ের আধুনিক প্রযুক্তির সবকিছুই তাদের হিন্দুত্ববাদী কল্পকাহিনীতে স্থান করে নিয়েছে। খৃষ্টীয় দশম শতকে আলবেরুনি ইন্ডোলজি বা ভারততত্ত্ব লেখার আগে বাকি দুনিয়ার মানুষ ইন্ডিয়া সম্পর্কে খুব একটা জানতোই না। আল বেরুনি তাঁর ভারততত্ত্বে ভারতীয়দের ধর্মীয় গোঁড়ামিসহ সাধারণ প্রবণতা সম্পর্কে যা বলেছেন এবং দেখিয়েছেন, তা ছিল অবশিষ্ট দুনিয়ার কাছে বিস্ময়কর। পারস্য, তুরস্ক-আফগানিস্তান থেকে আগত মুসলমান শাসকরা বহুধা বিভক্ত ভারতকে একীভূত করে সা¤্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ৮শ বছর ধরে শাসন করে আধুনিক ভারতের জন্ম দেন। এর বহু আগে আর্য বলে কথিত ভিনদেশি শাসকরাও পারস্য থেকেই এসে এদেশের দ্রাবিড়দের কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নিয়ে সনাতন ধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রথা ও রীতি প্রবর্তন করেন। এখন যে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদীরা হাজার বছর ধরে এদেশ শাসনকারী মুসলমানদের বিদেশি বলে আখ্যায়িত করতে চাইছেন, সেই একই যুক্তিতে আর্যসম্ভুত বর্ণবাদী হিন্দুরাও ভারতের আদি বাসিন্দা নন। তারা বিদেশ থেকে এসে ভারত দখল করে তাদের ধর্ম এদেশের মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল। এমনকি হিন্দু শব্দটিও ভারতের কোনো বৈদিক ধর্মগ্রন্থে নেই। এই হিন্দু শব্দটিও নাকি পারস্যের আকেমেনীয় সা¤্রাজ্যের প্রথম স¤্রাট দারায়ুসের দেয়া। খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে স¤্রাট তৃতীয় দারায়ুস আলেকজান্ডারের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হন। যাই হোক, আজকের দিনে যেমন আমেরিকার আদি বাসিন্দা বা রেড ইন্ডিয়ানদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়না, একইভাবে ভারতের আদি বাসিন্দা দ্রাবিড় সম্প্রদায় আর্যদের কাছে নিজেদের আত্মপরিচয় সমপর্ণ করতে বাধ্য হয়েছিল। বৈদিক ধর্মগ্রন্থগুলো আর্যদেরই আবিষ্কার বা অবদান। অপেক্ষাকৃত অগ্রসর শিক্ষা ও সভ্যতার অধিকারি মুসলমানদের কাছে সনাতন হিন্দুদের সব শক্তি পরাজিত হয়ে তাদের বশ্যতা ও শাসন মেনে নিয়ে ভারত এশিয়ায় এক নতুন সা¤্রাজ্য হিসেবে আবির্ভুত হয়েছিল।
পশ্চিমঙ্গের সনাতন ধর্মশাস্ত্রবিদ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী স্বীকার করেছেন, রামায়ন, মহাভারতসহ কোনো পৌরাণিক গ্রন্থে ‘হিন্দু’ ধর্মের উল্লেখ নেই। এমনকি সনাতন ধর্মেরও কোনো উল্লেখ নেই। মূলত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উৎপত্তির পর ভারতীয়রা নিজেদের ধর্ম হিসেবে সনাতন ধর্ম নামে প্রচার করেছিল বলে জানা যায়। হিন্দু বা সনাতন ধর্মের ইতিহাস নিয়ে কথা বলা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে উপমহাদেশে ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের অখন্ড ভারতের নামে রামরাজত্ব কায়েমের অপচেষ্টা থেকে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-সঙ্ঘাত, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীলতা ও যুদ্ধের উস্কানি নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এসব বিষয়ের অবতারণা অনিবার্য হয়ে ওঠে। আব্রাহামিক রিলিজিয়ন বা জুদাইজম, খৃষ্টধর্ম ও ইসলামের ইতিহাসের মধ্যে একটি ধারাবাহিক পারস্পর্য থাকলেও ভারতীয় পুরাণের কোনো কাহিনী বা চরিত্রের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। এমনকি প্রধান প্রধান চরিত্রগুলো নিয়ে ধর্মবেত্তাদের মধ্যে সর্বসম্মত মতও প্রতিষ্ঠিত নয়। রামায়ণের বর্ণনা অুনসারে ‘রাম’ হচ্ছে হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। তিনি অযোধ্যার রাজা দশরথ ও রানী কৌশল্যার জেষ্ঠ্য পুত্র হিসেবে ভারতের একজন আদর্শ রাজা হিসেবে স্বীকৃত। তবে তার ঐতিহাসিক লিগ্যাসি বা জন্মস্থান নিয়ে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। হিন্দু ধর্মবেত্তারা অযোধ্যাকে রামের জন্মস্থান হিসেবে বর্ণনা করলেও এ নিয়ে সর্বসম্মত মত নেই। তাছাড়া অযোধ্যা বলে কথিত উত্তর ভারতের ফৈজাবাদ জেলা বা সরযু নদীর তীরে রামের জন্মগ্রহণের কথা বলা হলেও সাড়ে তিনশ কিলোমিটার দীর্ঘ সরযু নদীর তীর কিংবা ১০ বর্গমাইলের অযোধ্যা শহরের বাবরি মসজিদের স্থানটিকে রামের জন্মস্থান হিসেবে ঘোষণা করার পেছনে কোনো প্রামাণ্য দলিল নেই। বাবরের সেনাপতি মীর বাকি ১৫২৮ সালে ফৈজাবাদে রামমন্দির নির্মাণের অর্ধশত বছর পর তুলসি দাস রামচরিত মানস লেখেন। সেখানে রামের জন্মস্থানে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কোনো তথ্য নেই। ভারতে শাসন-শোষণ অব্যাহত রাখতে মূলত ইংরেজরাই হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে অযোধ্যায় রামমন্দিরের স্থানে বাবরি মসজিদ নির্মাণের কল্পকাহিনী সৃষ্টি করেছিল। হিন্দু সংখ্যাধিক্যের দেশ হিসেবে ভারতের চেয়ে নেপাল এগিয়ে। সেখানে হিন্দু জনসংখ্যা ৮০ শতাংশের বেশি। ভারতে তা ৬০ শতাংশের মত। ২০২০ সালে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি দাবি করেছেন, রামের জন্মস্থান ভারতের অযোধ্যায় নয়, তার জন্ম নেপালের বীরগঞ্জের থোরি নামক স্থানে। তার মতে ভারতের উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদকে অনেক পরে অযোধ্যা নামে অভিহিত করা হলেও বাল্মীকি যে অযোধ্যার কথা বলছেন, তা নেপালে অবস্থিত। তাছাড়া রামের স্ত্রী সীতার জন্মস্থানও নেপালের জনকপুর তথা মিথিলা রাজ্যে, সেখানে ঐতিহাসিক জানকি মন্দির অবস্থিত। পৌরানিক কাহিনী অনুসারে, ভারতের (ফৈজাবাদ) অযোধ্যা থেকে রথ চালিয়ে একদিনে মিথিলায় পৌছা সম্ভব কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে। শত শত বছর ধরে হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থান ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভারত সা¤্রাজ্য গড়ে উঠলেও ইংরেজরা ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ভারতীয় সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদের বীজ ঢুকিয়ে দিতে রাজা রামচন্দ্র ও অযোধ্যায় কথিত রামমন্দিরের কাহিনীকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তেত্রিশ কোটি দেবতার ভারতে আজকের রাম হচ্ছে হিন্দুত্ববাদের প্রতিক। বিজেপি রামকে মুসলিম বিদ্বেষ ও অখন্ড ভারতের প্রতিকে পরিনত করার চেষ্টা করছে। আজ থেকে একশ’ বছর আগেও ভারতের কেউ ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগান দেয়নি। বহুত্ববাদী বা মাল্টিকালচারালিজমের গণতান্ত্রিক ভারত মুসলমানদের সৃষ্টি।
অখ- বা গ্রেটার বাংলার ভগ্নাংশ নিয়ে আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত। এটি কারো দয়া-দাক্ষিণ্যে বা এক সময়ের কোনো প্রিন্সলি স্টেটের উত্তরাধিকার নয়। শত শত বছরের রক্তাক্ত সংগ্রাম ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের ফসল এই দেশ। বাংলার কর্তৃত্ব বাঙালিদের হাতে ছিল না, বা বাঙালিদের দ্বারা চালিত হয়নি, সাতচল্লিশের বাংলাভাগ তারই প্রমাণ। বৃটিশ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুরা গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অগ্রাহ্য করে বাংলা ভাগ করেছিল। শত বছরের বঞ্চনায় পিছিয়ে পড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষাভাষির আভাসভূমি পূর্ববঙ্গকে ১৯০৫ সালে আলাদা প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে এখানকার অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রশাসনিক উন্নয়নের আশা জাগানো প্রকল্পের বিরুদ্ধে বর্ণ হিন্দুদের বিরোধিতা ও তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সাতচল্লিশে বাংলাভাগের ধর্ণুভঙ্গ পণ করে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের সাথে ঠেলে দিতে বাধ্য করার পেছনে যে রাজনৈতিক- মনস্তাত্ত্বিক কারণ কাজ করেছিল তার নেপথ্যে ছিল বর্ণ হিন্দুদের ইসলামোফোবিয়া। তাদের মনস্তত্ত্ব বড়ই অদ্ভুত ও বিস্ময়কর। তারা ঐক্যবদ্ধ বাংলাকে ভয় পায়, খন্ডিত করে একাংশ নিজেদের মুঠোতে রেখে দুর্বল করার পর সাতচল্লিশে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া বাংলাকে এখন ভয় পাচ্ছে এবং গিলে খেতে চাইছে। তারা যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেনা, এটা তারা নতুন করে প্রমান করছে। যত ক্ষুদ্রই হোক, মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ সব সময়ই ছিল আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির নিউক্লিয়াস। বাংলাদেশের উপর হিন্দুত্ববাদী ভারতের নিরব আগ্রাসন এখন ক্রমেই সরব ও দৃশ্যমান হয়ে উঠতে শুরু করেছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বদলে যাওয়া নতুন বাংলাদেশ আর ভারতীয় আধিপত্যবাদের সাথে আপসকামী না হলেও ভারতের জন্য কখনোই হুমকি ছিল না। এখনো নয়। তবে বাংলাদেশকে গিলে খেতে চাইলে বাংলাদেশ ভারতের অখন্ডতার উপর কুঠারাঘাত করতে বাধ্য হতেই পারে। যেকোনো দেশের আত্মরক্ষা ও প্রত্যাঘাতের বিষয়টি মূলত আধিপত্যবাদী শক্তির আগ্রাসি ভূমিকার দ্বারা প্রভাবিত। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাণের সাম্প্রতিক প্রতিরোধ, আত্মরক্ষা ও প্রত্যাঘাতের যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, ইরানের উপর ইসরাইল-আমেরিকা আগ্রাসন না চালালে এটা হয়তো কখনোই ঘটতো না। একইভাবে বিশ বছর ধরে কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট খরচ করেও বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল ও অনগ্রসর প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তি আফগানিস্তানকে সামরিকভাবে দুর্বল ও পরাস্ত করতে পারেনি এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরান ও আফগানিস্তান প্রমান করেছে পশ্চিমাদের সাহায্য ছাড়া শুধুমাত্র নিজেদের ইমানি শক্তিতে বলিয়ান হয়ে যে কোনো পরাশক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব। একতরফা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরান ও আফগানিস্তানের হাজার হাজার কোটি ডলারের সম্পদ আটকে রেখেও তাদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে রুদ্ধ করা যায়নি। অন্যদিকে ভারতীয় পানি আগ্রাসন ও হেজিমনির বিরুদ্ধে বাকি দুনিয়ার সমর্থন সব সময়ই বাংলাদেশের পক্ষে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া এবং রাজনৈতিক মহলের গলাবাজি, হুমকি ও মিথ্যাচারের আওয়াজ ছিল অস্বাভাবিক উচ্চ। এখন বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় দাদারা যে সব আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন, তা তাদের নিজেদের সৃষ্ট। গঙ্গা চুক্তি অনুসারে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হলে, দুই দশকে তিস্তার পানি চুক্তির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে আজকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গঙ্গা ব্যারাজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার কোনো প্রয়োজন পড়তো না। ভারত ছাড়াও এ অঞ্চলে আরো আঞ্চলিক পরাশক্তি আছে। ভারতের হুমকি মোকাবেলায় প্রতিবেশি দেশগুলো চীন-পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। আর ২০ কোটি মানুষের বাংলাদেশ কোনো ছেলের হাতের মোয়া নয়, যে চাইলেই কোনো পরাশক্তি হস্তগত করে নিতে পারবে। কয়েকদিন বিমান হামলা বা ক্ষেপনাস্ত্র হামলা করে কোনো দেশ দখল করা যায়না। বাংলাদেশের কোনো অংশে দখলদারিত্ব কায়েম করতে চাইলে তা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে পরিনত হতে পারে। সাতচল্লিশের দুষ্টক্ষত কাশ্মির, পাঞ্জাব ও বাংলার মানচিত্র বদলে যেতে পারে। শিলিগুড়ি করিডোর যেমন আছে, তেমনই থাকবে। বাংলাদেশের কোনো সম্প্রসারণবাদী বা উচ্চাভিলাষি প্রকল্প নেই, যেমনটি হিন্দুত্ববাদী ভারতের আছে। তাদের ইসলামোফোবিক হেজিমনিক এজেন্ডা বাংলাদেশকে চীন-পাকিস্তান-তুরস্ক-আমেরিকার সাথে জোট করতে বাধ্য করছে। ভারতের সাথে পাকিস্তান ও চীনের দীর্ঘ স্থল সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের সাথে চীন বা পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়ন অংশীদারিত্ব কিংবা নিরাপত্তা চুক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতের জন্য কোনো হুমকি হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না ভারত বাংলাদেশের জন্য সরাসরি হুমকি বা আগ্রাসি হয়ে না ওঠে। দিল্লী ও কলকাতা থেকে যারা রংপুর, ফেনী ও চট্টগ্রাম দখলের হুমকি দিচ্ছেন, তারা আসলে নিজেদের পাতা ফাঁদে নিজেরাই পা দিচ্ছেন। যত চেষ্টাই করেন, বাংলাদেশকে দাবিয়ে রাখতে পারবেন না।
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পঞ্চান্ন বছরের ষড়যন্ত্র, হেজিমনি এবং আওয়ামী লীগের বশংবদ পুতুল সরকারের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে নানাভাবে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুটে নেয়ার পরও বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে মন্দ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আন্তর্জাতিক জরিপে জিডিপি পার-ক্যাপিটা বা মাথাপিছু আয়ে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে বেশ এগিয়ে থাকার চিত্র বেরিয়ে এসেছে। শেখ হাসিনার দেড় দশকে ভারতের প্রত্যক্ষ মদতে জাল-জালিয়াতি, স্ক্যাম ও হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টর ও অর্থনীতি ধ্বংস ও লুন্ঠনের ঘটনা না ঘটলে বাংলাদেশের অবস্থান আজ কোথায় থাকতো তা সহজেই অনুমেয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা বন্ধ, বাণিজ্য বন্ধ, কৃষিপণ্য রফতানি বন্ধ করে দিয়ে নানামুখী সংকট সৃষ্টির সব চেষ্টাই করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশ বিকল্প পথে নতুন বাজার থেকে পণ্য সংগ্রহ করে অথবা নিজেরাই প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে চাহিদা পুরণ করতে সক্ষম হলেও ভারতের উৎপাদক ও বিনিয়োগাকারিরা নিজেদের অর্থনীতি রক্ষার কোনো বিকল্প খুঁজে পায়নি। তাদের কান্নাকাটি আমরা দেখেছি। অবশেষে ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভ্রমণ ভিসার নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে শুভেন্দু ও দিলিপ ঘোষদের উস্কানিমূলক চাপাবাজির কারণে দুই পক্ষের চাপান উতোর চলছে। রংপুরে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চতম রামমূর্তি স্থাপনের কারসাজি কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়, এটি ভারতের রাজনৈতিক হেজিমনির অংশ। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ অবৈধ-অননুমোদিত, অস্বাভাবিক রামমূর্তি নির্মানের বিষয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক। সংঘাত এড়াতে সরকার অননুমোদিত রামমূর্তি নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এখানে ভারত সরকারের হস্তক্ষেপের কিছু নেই। বাংলাদেশের খোদ সনাতন ধর্মাবলম্বিদের বড় অংশ যেমন ইসকনের সন্ত্রাসকে সমর্থন করেননা, তেমনি রংপুরের পলাশবাড়িতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত রামমূর্তি নির্মাণকে সাধারণ বাংলাদেশি নাগরিকদের মতোই সন্দেহের চোখে দেখছে। ভারতের হিন্দুত্ববাদিরা যখন মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির বানায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তখন রাত জেগে মন্দির পাহারা দেয়। এটাই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য। এভাবেই মুসলমানরা হাজার বছর ভারত শাসন করেছে। হিন্দুত্ববাদিরা অখন্ড ভারতের হেজিমনিক ন্যারেটিভ প্রচার করে ভেতর থেকে ভারতকে ভেঙ্গে দিচ্ছে।