দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। অথচ এই হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন আজ ধীর, রুদ্ধ এবং একরকম অবরুদ্ধ। প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হওয়া মানেই যেন এক অজানা অনিশ্চয়তার যাত্রায় পা বাড়ানো। বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে চট্টগ্রামের যে জৌলুস, স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিশীলতা  থাকার কথা ছিল, তা যানজট আর পরিবহন নৈরাজ্যের বিষাক্ত আবর্তে হারাতে বসেছে।

যেকোনো আধুনিক শহরের প্রাণশক্তি তার উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। কিন্তু চট্টগ্রামের দিকে তাকালে দেখা যায় এক চরম বিশৃঙ্খল ও হতাশাজনক চিত্র। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এ শহরকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। নগরের আয়তন ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় প্রশস্ত রাস্তার তীব্র অভাব বর্তমানে সবচেয়ে প্রকট। প্রতিদিন রাস্তায় নামছে নতুন নতুন ব্যক্তিগত গাড়ি ও পরিবহন, কিন্তু রাস্তার প্রশস্ততা বাড়ছে না। এই সংকীর্ণ রাস্তার কারণে গণপরিবহন ব্যবস্থায় নেমে এসেছে চরম বিশৃঙ্খলা। নির্দিষ্ট স্টপেজের তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, গাদাগাদি করে বাসে ওঠা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির দাপট প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী- সবার মূল্যবান কর্মঘণ্টা প্রতিদিন কেড়ে নিচ্ছে যানজট।

যানজটের এই ভয়াবহতাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ট্রাফিক আইন অমান্য করার অশুভ প্রবণতা। চালকদের মধ্যে ট্রাফিক সিগন্যাল ভাঙার প্রতিযোগিতা এবং যথেচ্ছ ইউটার্ন নেওয়ার কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত তৈরি হয় কৃত্রিম অচলাবস্থা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বন্দরনগরীর নিজস্ব সংকট- রাস্তার ওপর ভারী গাড়ি পার্কিং। পোর্ট কানেকটিং রোড থেকে শুরু করে মুরাদপুর, জিইসির মোড়, আগ্রাবাদ, ইপিজেড, সল্টগোলা ক্রসিং কিংবা মাঝিরঘাট কোথাও যেন নিয়মনীতির বালাই নেই। মূল সড়কের বড় অংশ দখল করে সারি সারি গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি,  কাভার্ড ভ্যান কনটেইনার ট্রেইলার দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে সাধারণ যানবাহনের চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে যায়, সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।

গাড়ির জন্য যেমন রাস্তা নেই, তেমনি মানুষের হাঁটার জন্যও ফুটপাত দুর্লভ বস্তু। নগরীর প্রায় প্রতিটি ব্যস্ত এলাকার ফুটপাত দখল করে বসেছে হকার। নিউমার্কেট, চকবাজার, জিইসি বা বহদ্দারহাট, সবখানে একই চিত্র। পথচারীরা বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার হার বাড়ছে, তেমনি যানবাহনের স্বাভাবিক গতিও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফুটপাত দখলমুক্ত করার নানা উদ্যোগ অতীতে দেখা গেছে, কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ইশারায় তা বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

যানজট নিরসনের মহৎ উদ্দেশ্যে গত এক দশকে চট্টগ্রামে বেশ কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামোগুলো নগরবাসীর মনে শুরুতে আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এসব ফ্লাইওভার যানজট কমানোর বদলে যানজটের স্থান পরিবর্তন করেছে মাত্র। একটি মোড়ের যানজট ঠেলে দেওয়া হয়েছে পরবর্তী মোড়ে। বহদ্দারহাট থেকে শুরু করে লালখান বাজার পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কারণে হয়তো মাঝপথের কিছু সিগন্যাল এড়িয়ে যাওয়া যায়, কিন্তু র‌্যাম্প দিয়ে নিচে নামার মুখেই তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ জটলা। সামগ্রিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে বিবেচনায় না নিয়ে, কেবল দৃশ্যমান উন্নয়নের মোহে বিচ্ছিন্নভাবে ফ্লাইওভার বানানোর এক চরম খেসারত।

চট্টগ্রামের এই স্থবিরতা কেবল নগরবাসীর মানসিক বা শারীরিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে না, এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পণ্য পরিবহনে দীর্ঘসূত্রতা আমদানি-রপ্তানির খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার চূড়ান্ত দায় চাপছে ভোক্তাদের কাঁধে।

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তির উপায় হচ্ছে? প্রথমত একটি সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মাস্টার প্ল্যানের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

ট্রাফিক আইনের নির্মোহ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি ফুটপাতগুলোকে পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে।

চট্টগ্রামকে তার হারানো গতি ফিরিয়ে দিতে হলে কেবল ইট-পাথরের উন্নয়ন নয়, প্রয়োজন সুশাসন ও শৃঙ্খলার কঠোর বাস্তবায়ন।  না হলে যানজটের কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাবে বাণিজ্যিক রাজধানীর সব সম্ভাবনা।

♦ লেখক : সাংবাদিক, বাংলাদেশ প্রতিদিন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews