সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত নারীদের হয়রানি, নিপীড়নমূলক বার্তা পাঠানোর ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বিশেষ করে নারীদের ছবি ব্যবহার করে নতুন নতুন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক আইডি তৈরির ঘটনা ঘটছে প্রায়ই।

এসব নিয়ে থানায় অভিযোগও করছেন অনেকেই কিন্তু তারা কোনো ধরনের প্রতিকার পাচ্ছেন না। উলটো সামাজিকভাবে হয়রানিরও শিকার হতে হচ্ছে অনেককে।

বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ রয়েছে। যেখানে সাইবার স্পেসে নারী কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে তাদের জন্য সাইবার সুরক্ষা ও পরামর্শ দেওয়া হয়।

পুলিশের ওই পেজের বিভিন্ন পোস্টের কমেন্টস সেকশনে গিয়ে দেখা গেছে বেশিরভাগ নারীই অভিযোগ করেছেন যে তারা এনিয়ে সুরক্ষা চাইলেও সেটি পাননি।

এর জবাবে পুলিশ বলছে, তারা যেকোনো অভিযোগ পেলে সেটি বেশ কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠান।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার ইউনিটের উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী গণমাধ্যমকে বলেন, কিছু কিছু সুনির্দিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ দ্রুতই সাড়া দেয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক সময় নেয়। সে কারণে চাইলেও পুলিশ দ্রুতই ব্যবস্থা নিতে পারে না।

কী কী ধরনের অভিযোগ আসে?

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে একই ব্যক্তির নামে ভিন্ন আইডি চালু। কিংবা ভিন্ন নাম ব্যবহার করে সুন্দরী নারীদের নামে ফেসবুক আইডি চালুর অভিযোগ জমা পড়ে সবচেয়ে বেশি।

এছাড়াও ফেসবুক আইডি হ্যাক করে যৌন নিপীড়নমূলক ম্যাসেজ পাঠানো, ভুয়া আইডি তৈরি করে হয়রানি, অশালীন এবং এডিটেড ছবির সঙ্গে কোনো পরিচিত সেলিব্রেটি নারীর নাম ব্যবহার করে আইডি তৈরি ও পোস্ট করার ঘটনাগুলোই সবচেয়ে বেশি ঘটছে নারীদের ক্ষেত্রে।

কোথাও কোথাও আবার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বিভিন্ন জনের কাছে টাকা চাওয়া হচ্ছে, মেইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে। মেইল আইডি হ্যাকের মতো অভিযোগগুলোও জমা পড়ছে পুলিশের কাছে।

উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আমিনুল হক বাপ্পী গণমাধ্যমকে জানান, সাইবার ক্রাইম নিয়ে পুলিশের কাছে যে ধরনের অভিযোগ আসে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে ব্লাকমেইলিং,হ্যাকিং, ফেসবুকে প্রোপাগান্ডা পোস্ট, ভুয়া আইডি থেকে নানা তথ্য ও ছবি ছড়ানো।

সম্প্রতি নড়াইলের কালিয়ায় এক নারীর ছবি ও ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রতারণার অভিযোগে পুলিশ এক যুবককে গ্রেফতার করে।

কয়েক দিন আগে কলেজ পড়ুয়া একজন ছাত্রী তার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে জানান, তার ফেসবুক আইডি থেকে ছবি নিয়ে তার নামসহ বিভিন্ন নামে অন্তত ১৫টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে।

তিনি সেই ফেসবুক আইডিগুলোর লিংকসহ তার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সেগুলোতে ‘রিপোর্ট’ করার অনুরোধ জানিয়েছেন তার ফেসবুক বন্ধুদের কাছে।

বাংলাদেশ পুলিশ পরিচালিত ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও বিভিন্ন পোস্টের কমেন্টে নানা ধরনের অভিযোগের কথা তুলে ধরতে দেখা গেছে অনেককে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, শুধু ভিন্ন ভিন্ন আইডি খুলে হয়রানি, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, নারী সেজে পুরুষ ও পুরুষ সেজে নারীদের ফাঁদে ফেলে ভিডিও ধারণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

যে কারণে খাঁটি স্বর্ণে মরিচা ধরে না

যে কারণে খাঁটি স্বর্ণে মরিচা ধরে না

কতটা প্রতিকার পান নারীরা?

দক্ষিণখানের আফরোজ (ছদ্মনাম) যে অভিযোগটি করেছিলেন, এখন থেকে সাড়ে সাত মাস আগে সেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ওই থানার একজন এসআইকে।

তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি সম্প্রতি ওই থানা থেকে বদলি হয়ে গেছেন অনত্র। যে কারণে ওই অভিযোগের বিষয়ে তিনি আর বিস্তারিত বলতে পারেননি।

মিজ আফরোজ গণমাধ্যমকে বলেন, আমি থানায় অভিযোগ করার পর দেখি তারা এটা নিয়ে কিছু করে না। আমার স্বামী দুই তিনবার পুলিশের কাছে গিয়ে বলেছে, তাতেও কোনো কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে আমরা কাছের বন্ধু-বান্ধবদের বলছি ফেসবুকে রিপোর্ট করার জন্য, তারাও রিপোর্ট করেছে।

তিনি জানান, যখন বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে রিপোর্ট করা হয়েছিল, তার মেয়ের ছবি দিয়ে তৈরি করা ওই অ্যাকাউন্টের নামে, তখন কিছুদিন ওই আইডি থেকে পোস্ট করা বন্ধ ছিল। কিন্তু গত দুই তিন মাস ধরে আবারও সক্রিয় দেখা যাচ্ছে ওই ফেসবুক আইডিটিকে।

পুলিশ বলছে, সাইবার স্পেসে ভুয়া আইডি বা পেজ তৈরি করে এই ধরনের অপরাধের পর কেউ যখন থানায় অভিযোগ করে, তখন বেশ কিছু ধাপ শেষ করার পর সেগুলোকে পাঠানো হয় মেটা বা ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে।

যেমন বরিশাল মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, এ ধরনের অভিযোগগুলো সারা দেশেই জমা পড়ে। কিন্তু এ নিয়ে যখন থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয় তারপর সেগুলো পরবর্তী ধাপে পাঠাতে হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মাধ্যমে। জেলা উপজেলা কিংবা মহানগর পর্যায়েও জিডি করলেও কয়েক ধাপ পেরিয়ে সেটি মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে হয়।

এক্ষেত্রে থানা বা উপজেলা পর্যায়ে কেউ যখন কোনো অভিযোগ করেন তখন সেটি কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে কখনো ডিএমপি হেডকোয়ার্টার, পরে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার বা এনটিএমসিতে সেখান থেকে মেটা কর্তৃপক্ষের কাছে।

পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আমিনুল হক বাপ্পী বলেন, এই চাবিটা আমাদের কাছে থাকে না। চাবিটা মেটার (ফেসবুক কোম্পানি) কাছে। মেটা যাচাই বাছাই করে যখন আমাদের কাছে উত্তর দেয় তখন আমরা এটা নিয়ে সামনের দিকে আগাই। না হলে আমাদের কিছু করার থাকে না।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?

পুলিশ বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের নামে আইডি তৈরি বা ভুয়া অ্যাকাউন্ট তৈরি হলে তা নিয়ে কোনো সাধারণ ডায়েরি জমা পড়লে সেটি নিয়ে তাদের তদন্ত করতে চূড়ান্তভাবে ফেসবুক বা মেটা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা লাগে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন থানা পর্যায়ে পুলিশের কাছে যে জিডিগুলো হয়, সেগুলো লেখা হয় বাংলায়। এই বাংলায় করা সাধারণ ডায়েরি বা জিডি ফেসবুক বা মেটা কর্তৃপক্ষকে পাঠানো যায় না। সেক্ষেত্রে সেগুলোকে নোটারির মাধ্যমে পুলিশ ইংরেজি করে সেগুলোকে আবার মেটা কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়।

আমিনুল হক বাপ্পী গণমাধ্যমকে বলেন, প্রথমে মেটা কর্তৃপক্ষ যাচাই- বাছাই করে। পরে কোনো অভিযোগের উত্তর দেয় আবার কোনো অভিযোগের উত্তর নাও দিতে পারে। অনেক সময় দেয় না। যখন কোন অভিযোগের বিষয় তাদের কাছ থেকে উত্তর পাওয়া যায় না, তখন পুলিশেরও কিছু করার থাকে না।

তিনি বলেন, কিছু সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুত সাড়া দেয়। বিশেষ করে- চাইল্ড পর্নোগ্রাফি, পর্নোগ্রাফি, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার কিংবা অপহরণের মতো কোনো বিষয়ে অভিযোগ পড়লে সেগুলোতে খুব দ্রুত সাড়া দেয় মেটা কর্তৃপক্ষ।

এর বাইরে একজনের নামে আরেকজনের সোশ্যাল মিডিয়ায় আইডি তৈরি, অন্যের ছবি ব্যবহার করে একাধিক আইডি তৈরি, ফেসবুক হ্যাকিং কিংবা এই ধরনের যে অপরাধের ক্ষেত্রে ফেসবুকের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা বা সুনির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া হলে খুব দ্রুত তাতে সাড়া পাওয়া যায় না বলেও জানিয়েছেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অপরাধ বন্ধে ফেসবুকের সঙ্গে বাংলাদেশের পুলিশের কোনো অফিশিয়াল চুক্তি নেই। ফেসবুক যা তথ্য দেয়, তা একেবারেই আনঅফিশিয়াল।

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমকে বলেন, মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স ট্রিটি বা এমল্যাট নামে একটি চুক্তি করতে হয়। যদি এই চুক্তি থাকে তখন মেটা সাইবার স্পেসের এই ধরনের অপরাধগুলো নিয়ে তথ্য সরবারহ করে। তাছাড়া করে না।

জোহা আরও বলেন, এই আইডিটা কোথা থেকে খোলা হয়েছে, কোন ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে, কোন ফোন নম্বর আইডি বা পাসপোর্ট ব্যবহার করে খোলা হয়েছে। সেটা ফেক হোক বা রিয়েল হোক। এটা এক রকম চুক্তি দরকার বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে মেটা কর্তৃপক্ষের। সেই চুক্তি আমাদের নাই। যার কারণে আমাদের পুলিশ চাইলেও অনেক কিছু করতে পারেন না।

তিনি বলেন, ফেসবুকের সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের চুক্তি আছে, কিন্তু সেটা আনঅফিশিয়ালি। ফেসবুকের যদি মন চায় তাহলে সে দেবে, না হলে দেবে না।

এই বিশ্লেষকের দাবি, পুলিশের পক্ষ থেকে মেটাকে অভিযোগ জানানোর পর যদি কোনো সাড়া না পাওয়া যায় তখন গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশের নিজস্ব এক ধরনের ‘বট বাহিনী’ রয়েছে। সেটির মাধ্যমে ওই আইডিতে রিপোর্ট করে তারপর কোনো কোনো আইডি ব্লক বা ডিজেবল করে দেওয়া যায়।

জোহা বলেন, তাও এটা করা হয় মন্ত্রী, এমপি বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা আলোচিত ঘটনার ক্ষেত্রে। এই বট বাহিনী আবার পুলিশের সঙ্গে সখ্যতার জের ধরে নিজেরাই কখনো কখনো বেআইনিভাবে কিছু সাপোর্ট দিয়ে থাকে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews