১. ইরান যুদ্ধের গতিপথ নিয়ে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্র

সর্বাত্মক ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা বড়ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। যদিও বৃহৎ অংশ ইরানে স্থল আক্রমণ বা যুদ্ধ ছড়িয়ে দেয়ার বিরোধিতা করছেন। এর মধ্যে এক পক্ষ চাইছে যুদ্ধকে ম্যানেজ করার পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা। অন্য পক্ষ চাইছে, যুদ্ধ চাপকে ইরানের ওপর চরম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী ফরেন পলিসি সাময়িকীতে জর্জ বিবে (এবড়ৎমব ইববনব) ও ত্রিতা পারসি (ঞৎরঃধ চধৎংর)– তাদের সদ্য প্রকাশিত ‘ইরান প্রস্থান পরিকল্পনায়’ ‘(ওৎধহ ঊীরঃ চষধহ)’ একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যেখানে ইরান-সঙ্কটকে ‘সমাধানযোগ্য’ নয়; বরং ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য’ সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে।

তাদের যুক্তি- যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ভুল ছিল জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে দ্রুত পরিবর্তনযোগ্য ধরে নেয়া। ইরাক ও লিবিয়ার উদাহরণ দেখিয়ে তারা বলেন, শাসন পরিবর্তন প্রায়শই স্থিতিশীলতা আনে না; বরং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করে।

এই প্রেক্ষাপটে তারা একটি ‘প্রস্থান পরিকল্পনায়’ কৌশলগত সমঝোতার পথ দেখান- যেখানে পূর্ণ বিজয়ের বদলে সীমিত সঙ্ঘাত নিয়ন্ত্রণ, পারমাণবিক ইস্যুতে আংশিক সমঝোতা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ওপর জোর দেয়া হয়। তাদের মতে, আমেরিকার উচিত নিখুঁত ‘সমাধান’ খোঁজা বন্ধ করে ‘গ্রহণযোগ্য ফলাফল’ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ- ইরানকে পুরোপুরি বদলানো নয়; বরং তাকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে রাখা।

তবে এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে একটি শক্তিশালী কঠোর মতও রয়েছে, যা এই বিশ্লেষণকে চ্যালেঞ্জ করে। এই মতানুসারে, ইরানকে শুধু ‘ম্যানেজ’ করা হলে সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে আরো জটিল হয়ে উঠবে। তাদের যুক্তি- ইরান একটি সংশোধনবাদী শক্তি (ৎবারংরড়হরংঃ ঢ়ড়বিৎ) যা আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে এবং পশ্চিমা স্বার্থ চ্যালেঞ্জ করতে সচেষ্ট। ফলে সীমিত সমঝোতা বা নিয়ন্ত্রণ (পড়হঃধরহসবহঃ) কৌশল আসলে ইরানকে সময় ও সুযোগ দেয় তার শক্তি আরো বাড়ানোর।

এই বিপরীত মতের প্রবক্তারা মনে করেন, অতীতে আমেরিকা যখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে- যেমন নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ- তখনই ইরান কিছুটা পিছু হটেছে। তাই তাদের মতে, ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি পুনরায় চালু করা উচিত। তারা আরো বলেন, যদি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ না করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে একটি পারমাণবিক সজ্জিত ইরান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য সম্পূর্ণ পাল্টে দেবে।

এছাড়া এই কঠোর অবস্থানপন্থীরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি দেন, ‘ম্যানেজ করুন; কিন্তু পূর্ণ সমাধান করতে চেষ্টা করবেন না’-কৌশল আসলে স্থায়ী অস্থিরতাকে বৈধতা দেয়। এতে সঙ্ঘাত কমে না; বরং একটি স্থায়ী ধূসর সঙ্ঘাত (ঢ়বৎসধহবহঃ মৎবু ুড়হব পড়হভষরপঃ) তৈরি হয়, যেখানে প্রক্সি যুদ্ধ, সাইবার হামলা ও অর্থনৈতিক চাপ চলতেই থাকে। তাদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে আরো বড় যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে। ইসরাইল লবি এই মতকে প্রবল করে তুলতে চায়।

অন্যদিকে বিবে-পার্সি-এর দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থকরা পাল্টা যুক্তি দেন- ইরানের মতো গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রকে জোর করে পরিবর্তন করার চেষ্টা আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তারা মনে করেন, একটি সীমিত কিন্তু স্থিতিশীল ভারসাম্য- যেখানে সঙ্ঘাত নিয়ন্ত্রিত থাকবে, তা-ই বাস্তবসম্মত পথ।

সার্বিকভাবে, এই বিতর্কটি দু’টি ভিন্ন কৌশলগত দর্শনের সংঘর্ষ : একদিকে বাস্তববাদী সঙ্ঘাত ব্যবস্থাপনা বা পড়হভষরপঃ সধহধমবসবহঃ, অন্যদিকে শক্তি-নির্ভর চাপ প্রয়োগের নীতি বা পড়হভষরপঃ ৎবংড়ষঁঃরড়হ। এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর।

তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ইরান ইস্যুতে সহজ বা দ্রুত কোনো সমাধান নেই- শুধু ভিন্ন ভিন্ন ঝুঁকির পথ রয়েছে। ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বর্তমান সঙ্ঘাত বোঝার জন্য এই মৌলিক বিষয়টি উপলব্ধি করা প্রয়োজন।

২. ইরান যুদ্ধে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে ন্যাটো

ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে কি প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে ন্যাটো? ন্যাটো নিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্পের হাতাশাজনক বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে ন্যাটো কি করবে- ধরনের হুঁশিয়ারির পরও ইরান যুদ্ধে ন্যাটো অংশীদাররা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের পাশে না দাঁড়ানোয় নানা জল্পনা ছড়িয়ে পড়ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতকে বোঝার জন্য অনেকের কাছে গেম থিওরির ‘চিকেন গেম’ মডেল একটি কার্যকর বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো। এই মডেলে দুই পক্ষই সঙ্ঘাতের দিকে এগিয়ে যায় (এস্কেলেট); কিন্তু যে আগে পিছু হটে (ডি-এস্কেলেট), তাকে দুর্বল বা পরাজিত হিসেবে দেখা হয়। তবে উভয় পক্ষই যদি পিছু না হটে, তাহলে ফলাফল হয় ভয়াবহ- একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ, যেখানে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান ঠিক এ ধরনের কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামনে দু’টি প্রধান পথ- একদিকে সামরিক হামলা বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করা, অন্যদিকে সীমিত আঘাতের মাধ্যমে আলোচনার সুযোগ খোলা রাখা। অপরদিকে ইরান সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে আঞ্চলিক প্রক্সি শক্তি যেমন- হিজবুল্লাহ বা হুতিদের ব্যবহার করে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, অথবা কৌশলগত ধৈর্য ধরে সঙ্ঘাতকে দীর্ঘায়িত করতে পারে। এই কৌশলগুলোর পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ায় চারটি সম্ভাব্য ফলাফল তৈরি হয় : উভয় পক্ষের এস্কেলেশন হলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ, একপক্ষ পিছু হটলে অন্য পক্ষের কৌশলগত লাভ এবং উভয় পক্ষ পিছু হটলে একটি অস্থির শান্তি।

এই খেলায় ন্যাটো সরাসরি প্রধান খেলোয়াড় না হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ভারসাম্য পরিবর্তনকারী’। ন্যাটো চাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে, যা ইরানের ওপর চাপ বাড়াবে; কিন্তু যুদ্ধকে বিস্তৃত করবে। আবার ইউরোপ যদি কৌশলগত নিরপেক্ষতা নেয়, যা সবচেয়ে সম্ভাব্য- তাহলে ন্যাটো ভাঙবে না, তবে দুর্বল ও বিভক্ত বলে মনে হবে। আর যদি ইউরোপ সরাসরি বিরোধিতা করে, তাহলে ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জোটের ভেতরে ফাটল সৃষ্টি হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি ‘অপ্রত্যাশিত খেলোয়াড়’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তার হঠাৎ সিদ্ধান্ত, যেমন- দ্রুত মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি, পুরো গেমের অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দেয়। ফলে অন্য পক্ষগুলো তার পদক্ষেপ অনুমান করতে পারে না, যা সঙ্ঘাতকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

এ ছাড়া ইরান সরাসরি যুদ্ধের বদলে একটি ‘মাল্টি-লেভেল গেম’ খেলছে- যেখানে লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ার প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে সঙ্ঘাতটি শুধু সরাসরি যুদ্ধ নয়; বরং প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক লড়াইয়ের সমন্বয়ে একটি জটিল রূপ নেয়।

সবচেয়ে সম্ভাব্য ‘ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম’ বা স্থিতাবস্থা হলো- নিয়ন্ত্রিত সঙ্ঘাত। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- ভুল হিসাব। একটি বড় ধরনের হামলা বা অতিরিক্ত বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে দিতে পারে এবং পরিস্থিতিকে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।

সার্বিকভাবে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাত একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলগত খেলা, যেখানে ন্যাটো একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি এবং ট্রাম্প একটি অনিশ্চয়তা সৃষ্টিকারী উপাদান। ফলে ন্যাটো ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম হলেও এটি দুর্বল ও বিভক্ত দেখাতে পারে এবং বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- ভুল হিসাব। একটি বড় ধরনের বিকল্প বা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য পাল্টে দিতে পারে এবং দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে- এমনকি সেটি তৃতীয় বিশ^যুদ্ধও হতে পারে, যেমনটি বারবার রাশিয়া বলে আসছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews