অস্থির সময়ের চারটি মুখ, আর আমাদের নীরব সংকট সময়টা অদ্ভুত। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো গল্প চলছে-কোথাও যুদ্ধের দামামা, কোথাও ভাষার পতন, কোথাও রাষ্ট্রের ভিত কাঁপছে, আর কোথাও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিতরেই তৈরি হচ্ছে একধরনের অদৃশ্য কারাগার। আমরা প্রতিদিন খবর পড়ি, টক শো দেখি, তর্ক করি কিন্তু এই ঘটনাগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেখি বলেই হয়তো তাদের গভীর সংযোগটা ধরতে পারি না। অথচ একটু থেমে ভাবলেই বোঝা যায়, এই চারটি স্তম্ভই আসলে একই বাস্তবতার চারটি রূপ : ক্ষমতার ব্যবহার, আস্থার অভাব আর নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। এই সময়টা আমাদের শুধু পর্যবেক্ষক নয়, বরং একধরনের নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীতে পরিণত করছে-আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাব, সেটিই ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

১. যুদ্ধের আগুন, আমাদের রান্নাঘরের ধোঁয়া

বিশ্ব এখন আবারও যুদ্ধের দিকে ঝুঁকছে-মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এমনকি এশিয়ার কিছু অংশেও অস্থিরতা বাড়ছে। যুদ্ধ যেন এখন আর সীমান্তে আটকে নেই; এটি ছড়িয়ে পড়ছে অর্থনীতিতে, বাজারে, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণগুলো স্পষ্ট করে বলছে, এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বহুমুখী চাপের মুখে পড়তে হবে। আমরা প্রায়ই ভাবি, যুদ্ধ মানে দূরের কোনো ঘটনা-টিভির পর্দায় দেখা কিছু দৃশ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে সেসব দেশে, যারা সরাসরি যুদ্ধে নেই। তেলের দাম বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে, ডলারের চাপ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে আমাদের নিত্যদিনের জীবনে। যে মানুষটি সকালে বাজারে যায়, সে বুঝতে পারে তার থলেটা আগের মতো ভরে না। যে উদ্যোক্তা ব্যবসা চালায়, সে বুঝতে পারে, লাভ কমে যাচ্ছে। আর যে রাষ্ট্র বাজেট করে, সে বুঝতে পারে-সংখ্যাগুলো আর মেলে না।

এই প্রেক্ষাপটে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের অর্থনীতির ভঙ্গুরতা। রেমিট্যান্স, তৈরি পোশাক, আমদানিনির্ভর জ্বালানি-এই তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতি বৈশ্বিক ধাক্কা সহ্য করার মতো কতটা সক্ষম? আমরা কি আমাদের ঝুঁকি বৈচিত্র্যময় করেছি? নাকি আমরা এখনো একই পুরোনো কাঠামোর মধ্যে আটকে আছি?

এই জায়গায় প্রশ্ন আসে, আমরা কি কেবল পরিস্থিতির শিকার, নাকি আমরা প্রস্তুত? আমাদের নীতিনির্ধারকরা কি এই বৈশ্বিক অস্থিরতাকে সামনে রেখে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন? নাকি আমরা আগের মতোই ‘দেখা যাবে’ নীতিতে চলছি?

ইতিহাস আমাদের একটি জিনিস বারবার শিখিয়েছে-যারা ঝড়ের আগে প্রস্তুতি নেয় না, তারা ঝড়ের পরে হিসাব মেলাতে পারে না। আর যারা শুধু অন্যের ভুল দেখে, নিজের ভিতরের দুর্বলতা দেখে না-তাদের জন্য ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

২. রাজনীতির ভাষা যখন আয়না হয়ে ওঠে

একটি সমাজের রাজনৈতিক ভাষা তার মানসিকতার প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে ধরনের মন্তব্য দেখছি বিশেষ করে নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে কটূক্তি তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি প্রবণতা, একটি সংস্কৃতির অংশ, যা ধীরে ধীরে আমাদের রাজনৈতিক পরিসরকে গ্রাস করছে। যখন একজন রাজনীতিক শরীর নিয়ে মন্তব্য করেন, তখন তিনি শুধু একজন মানুষকে আঘাত করেন না; তিনি পুরো সমাজের একটি অংশকে ছোট করেন। এটি কেবল অসৌজন্য নয়, এটি একধরনের মানসিক দারিদ্র্য, যেখানে যুক্তি নেই, আছে কেবল আক্রমণ।

আমাদের রাজনীতিতে একসময় মতের ভিন্নতা ছিল, কিন্তু সেখানে একটি শালীনতা ছিল। আজকের বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই সেই শালীনতা হারিয়ে যাচ্ছে। বিতর্কের জায়গা দখল করছে বিদ্বেষ, আর যুক্তির জায়গা দখল করছে কটূক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, যেখানে ভাইরাল হওয়ার জন্য অনেকেই শালীনতাকে বিসর্জন দিচ্ছেন।

এখানে একটি বড় বিপদ আছে, যখন ভাষা নষ্ট হয়ে যায়, তখন চিন্তাও নষ্ট হয়ে যায়। আর যখন চিন্তা নষ্ট হয়ে যায়, তখন সিদ্ধান্তও ভুল হয়। রাজনীতিতে ভাষার এই অবক্ষয় শেষ পর্যন্ত নীতিনির্ধারণেও প্রভাব ফেলে, কারণ যে ব্যক্তি যুক্তির চর্চা করে না, সে নীতিও গঠন করতে পারে না। হুমায়ূন আহমেদের একটি কথা মনে পড়ে-‘মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ভাষা।’ কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, আমরা সেই শক্তিটাকেই ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি। আর ভাষা যখন দুর্বল হয়, তখন সমাজও দুর্বল হয়ে পড়ে।

৩. রাষ্ট্র, আইন, আর আস্থার অদৃশ্য ফাটল

রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্র নয়, তার জনগণের আস্থা। কিন্তু যখন সেই আস্থা ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে-আইন কি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে? নাকি এটি ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে? যখন মানুষ দেখে, একই অপরাধে কেউ শাস্তি পায়, কেউ পায় না-তখন তাদের মনে প্রশ্ন জাগে।

এই প্রশ্নগুলো ছোট মনে হলেও এগুলোই বড় সংকটের সূচনা করে। কারণ যখন মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়, তখন তারা বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। আর সেই বিকল্প পথ কখনই স্থিতিশীল হয় না। তখন জন্ম নেয় ‘নিজেই বিচার করে নেওয়া’ প্রবণতা, যা শেষ পর্যন্ত সমাজকে আরও অস্থির করে তোলে। এই আস্থাহীনতার সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ ও রাজনৈতিক ভাষার অবক্ষয় মিলিত হলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। মানুষ তখন শুধু অসন্তুষ্ট থাকে না, তারা হতাশ হয়ে পড়ে। আর হতাশ মানুষ কখনো স্থিতিশীল সমাজ গড়তে পারে না।

এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এই আস্থার সংকটটি দৃশ্যমান নয়। এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয়, নীরবে ছড়িয়ে পড়ে এবং একসময় বিস্ফোরণের মতো সামনে আসে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ আছে, যেখানে দীর্ঘদিনের নীরব ক্ষোভ হঠাৎ করে বড় পরিবর্তনের জন্ম দিয়েছে। রাষ্ট্র যদি এই সংকট থেকে বের হতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, সমস্যা আছে। তারপর তাকে কাজ করতে হবে-স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। কারণ আস্থা একদিনে তৈরি হয় না, কিন্তু একদিনেই ভেঙে যেতে পারে।

৪. ভালোবাসা, নিয়ন্ত্রণ, আর নীরব শক্তির দর্শন

এই যে আমরা রাষ্ট্রে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা দেখি, রাজনীতিতে আধিপত্যের লড়াই দেখি, এটি কেবল পাবলিক স্পেসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও ঢুকে পড়েছে। আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ভালোবাসাকে অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হিসেবে দেখা হয়। আমরা ভাবি, যত বেশি খোঁজ রাখব, যত বেশি নজরদারি করব, তত বেশি ভালোবাসা প্রমাণ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো। যেখানে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে, সেখানে ভালোবাসা টেকে না। সেখানে তৈরি হয় সন্দেহ, চাপ এবং একধরনের অদৃশ্য ক্লান্তি। আজকের সম্পর্কগুলোতে আমরা একটি প্রবণতা দেখি-মানুষ একে অপরকে ধরে রাখতে চায়, কিন্তু শ্বাস নিতে দেয় না।

একটি সম্পর্ক যদি প্রতিনিয়ত নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চায়, তাহলে সেটি আসলে দুর্বল। শক্তিশালী সম্পর্ক কখনো নিজেকে প্রমাণ করতে ব্যস্ত থাকে না, এটি নিজেই নিজের প্রমাণ।এই দর্শনটি রাজনীতিতেও প্রযোজ্য। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার নাগরিকদের প্রতি আস্থা রাখে, তাদের প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে না। আর একটি দুর্বল রাষ্ট্রই তার নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, কারণ সে তাদের বিশ্বাস করতে পারে না। ভালোবাসা হোক বা ক্ষমতা দুটির ক্ষেত্রেই একটি সত্য প্রযোজ্য : যে আঁকড়ে ধরে, সে হারায়; যে ছেড়ে দিতে পারে, সে টিকে থাকে।

শেষ কথা

এই চারটি বিষয়-যুদ্ধের চাপ, ভাষার অবক্ষয়, রাষ্ট্রীয় আস্থার সংকট এবং সম্পর্কের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা, আসলে একই গল্পের চারটি অধ্যায়। আমরা একদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি, অন্যদিকে নিজেদের ভিতরেই তৈরি করছি নতুন সংকট। আমরা ভাষা হারাচ্ছি, আস্থা হারাচ্ছি, আর ধীরে ধীরে হারাচ্ছি সেই মানবিক সংযোগ, যা আমাদের সমাজকে টিকিয়ে রাখে।

সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন আর অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়, প্রশ্নটি আস্থার। আমরা কি একে অপরকে বিশ্বাস করতে পারি? রাষ্ট্র কি নাগরিককে বিশ্বাস করে? নাগরিক কি রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে? আর একজন মানুষ কি আরেকজন মানুষকে বিশ্বাস করতে পারে?

যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘না’ হয়, তাহলে আমাদের সব উন্নয়ন, সব অগ্রগতি, সব পরিকল্পনা-সবই একদিন ভেঙে পড়বে। কারণ আস্থাহীন সমাজ কখনো টেকসই হয় না। তাই হয়তো সময় এসেছে, আমরা একটু ধীর হই। একটু কম বলি, একটু বেশি শুনি। একটু কম নিয়ন্ত্রণ করি, একটু বেশি বিশ্বাস করি। কারণ শেষ পর্যন্ত শক্তি কখনো উচ্চৈঃস্বরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় না; এটি নীরবে কাজ করে। আর যে নীরবতা বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয়, সেটিই সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews