অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হতে চলেছে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশের উইন্ডসর এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরকে সংযুক্তকারী বহুল প্রতীক্ষিত গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এ উপলক্ষে সেতুটিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। মঙ্গলবার অটোয়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কার্নি বলেন, “এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি সংবাদ। শুধু একটি সেতু নয়, এটি আমাদের দুই দেশের মধ্যে বহু দশকের সহযোগিতা, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রতীক।” প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সীমান্তের দুই প্রান্তে হাজার হাজার প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী ও বিশেষজ্ঞের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল এই অবকাঠামো প্রকল্প। যারা এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন, তাদের প্রতি তিনি অভিনন্দন জানান এবং সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
কানাডা সরকার ও মিশিগান অঙ্গরাজ্যের যৌথ মালিকানাধীন এই আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধনী ফিতা-কাটা অনুষ্ঠান আগামী শুক্রবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর চলতি মাসের শেষের দিকে সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হতে পারে। প্রকল্পটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কানাডিয়ান সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যেই আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে ফেডারেল সরকার এমন ইঙ্গিত পেয়েছে যে, প্রয়োজনীয় সব ধরনের অনুমোদন ও ছাড়পত্র পাওয়া গেছে এবং সেতুটি চালুর পথে আর কোনো বড় বাধা নেই। উইন্ডসর-ডেট্রয়েট ব্রিজ অথরিটি, যারা সেতুটির নির্মাণ ও ভবিষ্যৎ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় সব কারিগরি ও নিরাপত্তাজনিত অনুমোদন অর্জন করেছে বলে জানা গেছে।
- Advertisement -
যদিও সেতুটি উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে, তবুও কয়েক মাস আগেও প্রকল্পটি নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন যে, সেতুটি চালুর অনুমতি দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের “উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ” পাওয়া উচিত। ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। ফলে সেতুর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু প্রশ্নও দেখা দিয়েছিল। তবে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী কার্নি কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ সমঝোতার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বিষয়টি নিয়ে নীরবতা বজায় রাখেন। এদিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গ্লোবাল নিউজ জানিয়েছে, সেতু সংক্রান্ত বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এখনও আমেরিকান জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সর্বোত্তম চুক্তি নিশ্চিত করার নীতিতেই অটল রয়েছে।
গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতুর ধারণা ও আনুষ্ঠানিক চুক্তি প্রথম হয় ২০১২ সালে। তবে নানা প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতার কারণে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এরপরও প্রকল্পটি একাধিকবার বিলম্বের মুখোমুখি হয়। কোভিড-১৯ মহামারি, সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ প্রকল্পটির সময়সূচিকে বারবার প্রভাবিত করেছে। তবে সব বাধা অতিক্রম করে অবশেষে বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো প্রকল্প।
গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতু শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি উত্তর আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য করিডোরকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমানে উইন্ডসর-ডেট্রয়েট সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য ও যানবাহন চলাচল করে, যা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের একটি বড় অংশ বহন করে। নতুন সেতু চালু হলে পণ্য পরিবহনের গতি বাড়বে, সীমান্তে যানজট কমবে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং শিল্পখাতের সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিকল্পনা, নির্মাণ ও নানা বিতর্কের পর গোর্ডি হাউ আন্তর্জাতিক সেতুর উদ্বোধন তাই শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের সমাপ্তি নয়; বরং কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতা, সংযোগ এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার
- Advertisement -