দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের মতো সংস্কৃতি অঙ্গনেও বিভাজন এবং বিভক্তি চলমান আছে। নেতৃত্বের আকাক্সক্ষায় তৈরি এই বিভাজন সৃষ্টি করছে দূরত্ব, অভিমান ও স্থবিরতা। ইতোমধ্যে বেশকিছু সংগঠনে বিভাজন তৈরি হয়েছে। গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনসহ আরও সংগঠনের বিভাজনের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এদিকে মতভেদ থেকে একের পর এক জন্ম নিচ্ছে নতুন সংগঠন। কেউ কেউ নতুন সংগঠন করতে গিয়ে পুরোনোদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব অব্যাহত রাখছেন। এতে বিব্রত সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। তারা মনে করছেন, ঐক্যের সময়ে সংগঠনে ভাঙন মানুষের কাছে অশুভ বার্তা দেয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ বিভক্ত হওয়া বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দুই পক্ষের মধ্যে এখনো বইছে ক্ষোভ। একপক্ষ আরেক পক্ষকে জামায়াতের অনুসারী, আওয়ামী লীগের অনুসারী বলে ট্যাগ দিচ্ছে। এ নিয়ে ইতোমধ্যে একে-অন্যের মধ্যে হাতাহাতিও হতে দেখা গেছে।
উদীচীর জামশেদ আনোয়ার তপন গ্রুপকে জামায়াত অনুসারী বলছে অমিত রঞ্জন দে গ্রুপ। আবার অমিত রঞ্জন দে গ্রুপকে আওয়ামী লীগের দোসর বলছে জামশেদ আনোয়ার তপন গ্রুপ। পক্ষে-বিপক্ষে এই ট্যাগ লাগানোর কর্মটি এখনো চলমান আছে। এমতাবস্থায় বিব্রত তৃণমূলের উদীচীর কর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি অঙ্গন। সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকের ধারণা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির একজন অগ্রজ নেতা ‘বিশেষ উদ্দেশ্যে’ দেশের অন্যতম পুরোনো এই সংগঠনটিকে দুই ভাগ করেছেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষাটের দশকের শেষ দিকে সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন প্রতিষ্ঠা করেন উদীচী। কিন্তু প্রাচীন এই সংগঠনটি গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে নেতৃত্বের প্রশ্নে ভাগ হয়ে যায়। গত পহেলা বৈশাখেও দুই পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন ছিল। ওই আয়োজন নিয়েও মুখোমুখি অবস্থান নেয় তারা।
এরও আগে ভেঙে যায় দেশের অন্যতম প্রাচীন সংগঠন ‘খেলাঘর’। বিভক্ত খেলাঘর এখন কেবল প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজন ও দিবসভিত্তিক প্রেস রিলিজে দৃশ্যমান।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতা থেকে তৈরি হয় ‘খেলাঘর’ নামক সংগঠন। সারা দেশে এর সক্রিয় শাখা রয়েছে। নব্বই দশকের শুরুতে শুধু নেতৃত্বের প্রশ্নে সংগঠনটি দুই ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই দুই গ্রুপে অধ্যাপক পান্না কায়সার ও অধ্যাপক মাহফুজা খানম নেতৃত্ব দেন। দুজনেই পরলোক গমন করেছেন। কিন্তু খেলাঘর আর জোড়া লাগেনি।
দেশের আরেক আবৃত্তি সংগঠন ‘কণ্ঠশীলন’ প্রায় এক দশক আগে বিভক্ত হয় সংগঠনকে লিমিডেট কোম্পানি করার পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়িয়ে। পরবর্তী সময়ে সন্জীদা খাতুন ও গোলাম সারওয়ারের নেতৃত্বে দুটি আলাদা গ্রুপ হয়ে যায়। সন্জীদা খাতুন পরলোকগমন করলেও বর্তমানে দুই পক্ষই সক্রিয় আছে। ভাঙাগড়া আছে নাট্যাঙ্গনেও। দল ভাগ হয়ে লোকনাট্যদল (টিএসসি), লোকনাট্যদল (বনানী) ও লোকনাট্যদল (সিদ্ধেশ্বরী) হয়। এই তিন দলের নাট্যকর্মীদের মধ্যে এখনো অভিমান ভাঙেনি।
থিয়েটার ভেঙে থিয়েটার (বেইলি রোড), থিয়েটার (তোপখানা) ও নাট্যকেন্দ্র নামে তিনটি দল হয়। যদিও প্রত্যেকের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক আছে বলে জানা যায়।
এদিকে পদাতিক ভেঙে পদাতিক নাট্য সংসদ, পদাতিক নাট্য সংসদ (টিএসসি) ও ঢাকা পদাতিক হয়। এরপর ঢাকা পদাতিক থেকে থিয়েটার আর্ট ইউনিট এবং সর্বশেষ থিয়েটার আর্ট ইউনিট থেকে অনুস্বর নামে আরও একটি দল হয়। এদের সবার সঙ্গে বেশ যোগাযোগ আছে বলে জানা যায়। তবে মুখ দেখাদেখি বন্ধ কেবল থিয়েটার আর্ট ইউনিট ও অনুস্বরের নাট্যকর্মীদের মধ্যে।
দেশে প্রথম টিকিটের বিনিময়ে নাট্য মঞ্চায়ন করা দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ও ভাঙে কয়েকবার। প্রথমে জন্ম নেয় নাগরিক নাট্যাঙ্গন। পরবর্তীতে নাগরিক নাট্যাঙ্গনে সখ্য গড়ে না ওঠায় কয়েকজন বের হয়ে গড়েন নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল নামে আরেকটি গ্রুপ। নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বল থেকে নাট্যতীর্থ হয় এবং নাট্যতীর্থ থেকে এথিক নাট্যদল হয়। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় থেকে প্রাঙ্গণেমোর গ্রুপের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে প্রাঙ্গণেমোর থেকে বেশকজন বেরিয়ে গিয়ে থিয়েটারিয়ান নামে আরেকটি গ্রুপ করেন। দেশের অন্যতম প্রধান নাট্যদল ঢাকা থিয়েটার থেকে কয়েকজন অভিনয়শিল্পী নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন। তবে আলাদা দল গঠন হওয়ার কথা জানা যায়নি।
দেশের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দল আরণ্যক থেকে কয়েকজন বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেছে নতুন গ্রুপ প্রাচ্যনাট। তবে তাদের মধ্যে অতীতের মতো সু-সম্পর্ক না থাকলেও একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ আছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনেও দলীয় আদর্শ এবং নেতৃত্বের প্রশ্নে দ্বিধা-বিভক্তি এসেছে। প্রতিনিয়ত একে অন্যকে কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ উঠছে। ফলে এর প্রতিবাদস্বরূপ যে কোনো সময় এটিও ভেঙে যাবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিভাজন এবং এর পরিণতি জানতে চাইলে নাট্যজন মামুনুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ‘যখন সব সংস্কৃতিকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার, ঠিক সে সময়ে আলাদা হয়ে অপ্রীতিকর আচরণ করা আমাদের অশুভ বার্তা দেয়। তিনি মনে করেন, ‘ভিন্ন মত ও পথ থাকলেও প্রগতির চিন্তা থেকে সবাইকে এক হওয়া দরকার।’