বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা বাড়তি শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে। এতে করে মোট শুল্কহার আগের ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হবে ৩৪ শতাংশ।
নতুন চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে কোনো পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে না। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের কাঁচামালে তৈরি পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পাল্টা শুল্ক দিতে হবে না।
বাংলাদেশের স্থানীয় সময় সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে এ চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেবে। মার্কিন এসব পণ্যের মধ্যে আছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, যন্ত্র, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াজাত ও দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ফল।
হোয়াইট হাউসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং ২০১৩ সালে সই হওয়া যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কো-অপারেশন ফোরাম অ্যাগ্রিমেন্টের (টিকফা) ধারাবাহিকতায় এ চুক্তি হয়েছে।
এই চুক্তিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বিদ্যমান অশুল্ক বাধা কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ করবে বাংলাদেশ। এছাড়া চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) দেওয়া সনদের স্বীকৃতি দেবে।
যেসব ওষুধ এফডিএ আগেই বাজারজাতকরণের অনুমোদন দিয়েছে, সেই অনুমোদনেও স্বীকৃতি দেবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচার্ড) পণ্য ও যন্ত্রাংশের ওপর বিদ্যমান যেকোনো আমদানি নিষেধাজ্ঞা বা লাইসেন্সের শর্ত তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
পাশাপাশি বাংলাদেশ ডিজিটাল বাণিজ্য ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য অঙ্গীকার করেছে। ঢাকা বিশ্বস্ত দেশের সঙ্গে মধ্যে তথ্যের অবাধ আদান–প্রদানের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ইলেকট্রনিক আদান–প্রদানে শুল্ক আরোপে স্থায়ী স্থগিতাদেশ গ্রহণের উদ্যোগে সমর্থন দেবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক ও ঝুঁকিনির্ভর প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ বিমা খাতে বিদ্যমান বাধা দূর করা, শুল্ক প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট রীতিনীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
উভয় দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে আছে জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা ও তা কার্যকর করা, শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে যৌথ দর–কষাকষির অধিকার পূর্ণাঙ্গরূপে নিশ্চিত করতে শ্রম আইন সংশোধন ও শ্রম আইনের কঠোর প্রয়োগ করবে বাংলাদেশ।
পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশ কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের কথাও বলেছে। ব্যবসা–বাণিজ্যের সুবিধার্থে বাংলাদেশ শুল্ক ও বাণিজ্যব্যবস্থা সহজীকরণ এবং ভর্তুকি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কারণে বাজারব্যবস্থায় যে বিকৃতি ঘটে, সেই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানোর অঙ্গীকার করেছে।
এছাড়া মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কঠোর মানদণ্ড গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এর আওতায় নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব চুক্তি অনুমোদন বা তাতে যোগদান এবং সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে।
একই সঙ্গে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের বিষয়ে যুগান্তকারী বিধান গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হচ্ছে, বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের প্রবেশাধিকার বজায় রাখা, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পনির ও মাংসের ক্ষেত্রে—এসব পণ্য উৎপাদনকারীরা সাধারণ নাম ব্যবহার করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমন্বয় আরও জোরদার করতে অঙ্গীকার করেছে। বৈশ্বিকভাবে অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা মোকাবিলায় পরিপূরক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি শুল্ক ফাঁকি প্রতিরোধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং উভয় দেশে আগত বিনিয়োগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে সরবরাহব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল ও উদ্ভাবনমূলক করার লক্ষ্য নিয়েছে উভয় দেশ।
এ ছাড়া বাংলাদেশ কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী আইন জোরদার ও প্রয়োগের অঙ্গীকার করেছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ও যোগ্যতা সাপেক্ষে এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (এক্সিম ব্যাংক) এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ (ডিএফসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতার কথাও বলা হয়েছে।
সবশেষে কৃষি, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সাম্প্রতিক এবং আসন্ন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমঝোতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য কিনবে, তার তালিকা দেওয়া হয়েছে।
যেমন প্রায় ৩৫০ কোটি ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ, গম, সয়া, তুলা, ভুট্টা এবং আগামী ১৫ বছরে আনুমানিক ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার মূল্যের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের। এর মধ্যে ৬০০ কোটি ডলারের রপ্তানি করে বাংলাদেশ। আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ বাণিজ্যঘাটতি বাংলাদেশের অনুকূলে। এ ঘাটতি কমাতেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ।
উভয় দেশ জানিয়েছে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি চূড়ান্ত করা হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য ১৯ শতাংশ শুল্ক বলা হলেও, প্রকৃতপক্ষে আগের সাধারণ শুল্ক ১৫.১ শতাংশের সঙ্গে এই ১৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল শুল্ক যোগ করলে মোট শুল্ক দাঁড়ায় ৩৪.১ শতাংশ, যা ভারতের চেয়ে বেশি। ভারতকে সব মিলিয়ে ১৮ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অসম প্রতিযোগিতায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার এটি বাংলাদেশের জন্য সুযোগও বটে। যদি মার্কিন তুলায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করা যায়, তাহলে বাংলাদেশকে পোশাকে কোনো শুল্ক দিতে হবে না। সে ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ। তবে একটি ঝুঁকি হলো—মার্কিন তুলানির্ভরতায় পোশাক খাত জিম্মি হয়ে পড়তে পারে। তখন দামও বেশি রাখতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা আমরা জানি না। আমি মনে করি, এই ধরনের চুক্তি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে করা মোটেই উচিত হয়নি। আমরা কিছু নতুন সুবিধা পেয়েছি, সেটিকে আমরা অর্জন হিসেবে মনে করতে পারি। কিন্তু তার বদলে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে বা বাংলাদেশকে কী কী করতে হবে, তা আমরা জানি না। ফলে এই চুক্তিতে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হলো, তা এককথায় বলা মুশকিল। এই চুক্তির দায়ভার এসে পড়বে পরবর্তী সরকারের ওপর। সেই সরকার চুক্তি শর্তগুলো পূরণে কতটুকু প্রস্তুত এবং তাদের এসব বিষয়ে বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে কি না, তা–ও বড় প্রশ্ন। তাই আমি মনে করি, চুক্তির লাভ–লোকসানের হিসাব কষতে হবে চুক্তিতে কী কী শর্ত আছে, তা সার্বিকভাবে পর্যালোচনার ভিত্তিতে।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল দেশটিতে পণ্য রপ্তানিকারক ১০০টি দেশের ওপর বিভিন্ন হারে পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন।
শুরুতে বাংলাদেশের জন্য এই হারটি ছিল ৩৭ শতাংশ। পরে শুল্ক আরোপ তিন মাসের জন্য পিছিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক তিন মাসের মাথায় ২০২৫ সালের ৭ জুলাই বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ৩৭ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর ঘোষণা দেন ট্রাম্প। আরও দর-কষাকষির পর গত বছরের ২ আগস্ট এ হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এই পাল্টা শুল্কহার কার্যকর হয়। পাল্টা শুল্কের বাইরে আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে দেশটিতে ১৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হতো। পাল্টা শুল্কারোপের পর সব মিলিয়ে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।