মাদকদ্রব্য, ধূমপান এবং তামাক সেবন মানুষের অকালমৃত্যু ও স্বাস্থ্যহানির অন্যতম প্রধান কারণ। মাদকাসক্তি একটি রোগ। মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানসিক, শারীরিক রোগসহ বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়ে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের বড় অংশের জনগোষ্ঠী কিশোর-তরুণ, যে কারণে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ইয়ুথ ডিভিডেন্ট। বেসরকারি হিসাবমতে, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকসেবীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে, ইয়াবা সেবনকারী শতকরা ৮৫ ভাগই তরুণ যুবসমাজের! ২০৩০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন রোগের মতো এইচআইভি এইডসের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা মাদক গ্রহণকালীন অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে। গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই ধূমপায়ী এবং তাদের মধ্যে শতকরা ৬০ ভাগ বিভিন্ন অপরাধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, যা গবেষণায় প্রমাণিত। ধূমপানে অভ্যস্ততার মধ্য দিয়ে তরুণরা মাদকদ্রব্য সেবন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, সিসা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, মরফিন, এলএসডিসহ বিভিন্ন মরণনেশায় আসক্ত হয়। ক্রমান্বয়ে মাদকাসক্তরা কিডনি, লিভার, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজকর্ম নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগে আক্রান্ত হয়।

এটা অনস্বীকার্য যে তরুণদের মাদকের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাতে হলে মাদক নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই। সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে ও স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য তরুণদের ধূমপান, মাদকসহ সব নেশা থেকে দূরে থাকা জরুরি। কিন্তু বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও থেমে নেই সর্বনাশা মাদকের বিস্তার। মাদকের সঙ্গে জড়িত অসাধু চক্র আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তরুণদের মাদকের রাজ্যে টানতে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করছে অসাধু মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিরা। এটিও বড় চ্যালেঞ্জরূপে আবির্ভূত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার পরিসংখ্যানে জানা যায়, সারা দেশে মাদক কারবারির সংখ্যা ২০ হাজার ৮৯১। এর মধ্যে গডফাদার ১ হাজার ৬২০, পাইকারি কারবারি ৬ হাজার ২২৭ এবং খুচরা কারবারি ১৩ হাজার ৪৪। চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৩০৯ জন গডফাদার রয়েছে। সড়ক ও নৌপথে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে মাদক রূপগঞ্জে প্রবেশ করে। বালু নদে নিয়মিত পুলিশ টহলের অভাব থাকায় এটি মাদক পাচারের অন্যতম নিরাপদ নৌপথে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি শীতলক্ষ্যা নদীপথ, এশিয়ান হাইওয়ে এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ব্যবহার করে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আখাউড়া, সিলেট ও আশুগঞ্জ থেকে বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী জাহাজ, ট্রলার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনে মাদক আনা হয়। এ ক্ষেত্রে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভুলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মাদক সেবনের ফলে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মাদকাসক্তির প্রভাবে হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধ বাড়ছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২২ পূর্ববর্তী ১০ বছরে নেশাখোর সন্তানের হাতে প্রায় ২০০ বাবা-মা খুন হয়েছে, স্বামী হত্যা করেছে স্ত্রীকে, স্ত্রী হত্যা করেছে স্বামীকে। খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ, পরকীয়া, দাম্পত্য কলহসহ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মূলেই রয়েছে মাদকের নেশা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, কিন্তু সেই মানুষ মাদকের নেশায় হয়ে ওঠে হিংস্র দানব, নরপশু। মিরপুরে শিশু রামিসা হত্যা সাম্প্রতিক সময়ের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা। জানা গেছে, হত্যাকারী সোহেল মাদকসেবী ছিলেন। মাদকাসক্তি বিস্তারের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। সুতরাং সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বর্তমান সরকারপ্রধান মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন, যা নির্বাচন তফসিলেও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঘোষণা দিয়ে সাড়াজাগানো মাদকবিরোধী অভিযান  দেখা যায়নি।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এ ব্যাপারে সরকারের যথেষ্ট দৃষ্টি রয়েছে এবং তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে। অন্যদিকে আগ্রাসি মাদক পাচার রুখতে সীমান্তে কড়া নজরদারি রয়েছে, যা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বিবৃতি ও বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন।

♦ লেখক : সভাপতি, মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা (মানস)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews