সাজগোজের শেষ ধাপ হিসেবে আমরা অনেকেই পোশাক ও গলায় কয়েক স্প্রে সুগন্ধী বা পারফিউম ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু একথা শোনা যায় যে - প্রতিদিন গলায় পারফিউম স্প্রে করলে নাকি হরমোনের সমস্যা হতে পারে! এটা কি সত্যি?
বিষয়টি একেবারে হ্যাঁ-না দিয়ে বলার মতো না। কিছু বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে, আবার কিছু অতিরঞ্জিত দাবিও আছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, এ কথা কতটা সত্য -
প্রথমেই থাইরয়েডের অবস্থান নিয়ে কথা বলা যাক। থাইরয়েড গ্রন্থি গলার সামনের অংশে থাকে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি ব্যবহার ও হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গলার ত্বক তুলনামূলকভাবে পাতলা ও রক্তনালীসমৃদ্ধ - এ কারণে ত্বকের মাধ্যমে কিছু রাসায়নিক শোষিত হতে পারে। তবে ‘গলায় স্প্রে করলেই সরাসরি থাইরয়েডে গিয়ে ক্ষতি করবে’ - এমন কথা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
অনেক বাণিজ্যিক সুগন্ধিতে ফথালেটস, সিনথেটিক মাস্ক, প্যারাবেনের মতো কিছু রাসায়নিক ব্যবহার হয়, যেগুলোকে গবেষণায় এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং কেমিক্যাল (ইডিসি) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনাইটেড নেশন্স এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম যৌথ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কিছু ইডিসি শরীরের হরমোন সিগন্যালিংয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
ল্যাব ও প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফথালেটস প্রজনন ও থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। এন্ডোক্রাইন সোসাইটিও সতর্ক করেছে যে - দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক এক্সপোজার হরমোনজনিত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো মাত্রা এবং বাস্তব জীবনের এক্সপোজার। অধিকাংশ গবেষণা উচ্চমাত্রার বা দীর্ঘমেয়াদি এক্সপোজার নিয়ে। প্রতিদিন স্বাভাবিক মাত্রায় পারফিউম ব্যবহার করলে সরাসরি থাইরয়েড বিকল হয়ে যায় - এমন শক্ত প্রমাণ এখনো নেই।
আবার এটাও সত্য যে, সুগন্ধির রাসায়নিকগুলো লিপোফিলিক হওয়ায় শরীরের চর্বিযুক্ত টিস্যুতে জমা হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক এক্সপোজার বিবেচনায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গলার ত্বক তুলনামূলকভাবে শোষণক্ষম - এ তথ্য সঠিক। কিন্তু থাইরয়েডের ঠিক ওপরে বলে ঝুঁকি বহুগুণ বেশি - এ দাবি বেশি সরল ভাষায় বলা। ত্বক দিয়ে শোষিত রাসায়নিক রক্তপ্রবাহে মিশে সারা শরীরেই ছড়িয়ে পড়ে; নির্দিষ্টভাবে শুধু নিচের গ্রন্থিতে গিয়ে জমা হয়, এমন নয়।
প্রথমত, পারফিউম ব্যবহার কমানো বা কাপড়ের ওপর স্প্রে করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ফথালেট–ফ্রি পণ্য বেছে নেওয়া ভালো।
তৃতীয়ত, যাদের থাইরয়েড বা হরমোনজনিত সমস্যা আছে, তারা অপ্রয়োজনীয় কেমিক্যাল এক্সপোজার কমানোকে লাইফস্টাইল কৌশল হিসেবে ভাবতে পারেন।
বিষয়টি আতঙ্কের নয়, সচেতনতার। পারফিউম ব্যবহার মানেই হরমোন ধ্বংস – এমন কোনো প্রমাণ নেই। তবে অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম রাসায়নিকের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ কমানো একটা স্মার্ট ডিসিশন হতেই পারে।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনাইটেড নেশন্স এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (২০১২), এন্ডোক্রাইন সোসাইটি সায়েন্টিফিক স্টেটমেন্ট (২০১৫), এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পার্সপেকটিভস জার্নাল
এএমপি/এএসএম