• নতুন কমিশন গঠনে হয়নি সার্চ কমিটি
  • থমকে গেছে ভিআইপিদের দুর্নীতির কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম

অভিভাবকশূন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ২৪ দিন পার হলেও নতুন চেয়ারম্যানসহ কমিশন গঠনে করা হয়নি সার্চ কমিটি। এ অবস্থায় কে হচ্ছেন দুদকের নতুন চেয়ারম্যান, এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনাকল্পনা।

দুদকের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করায় নতুন কমিশন গঠনের তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেন ও দুই কমিশনার। এর পর থেকে নেতৃত্বশূন্য স্বাধীন সংস্থাটি। এতে থমকে গেছে ভিভিআইপি ও ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম। এ অবস্থায় কবে কিভাবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে দুদকের নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার, এই অপেক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। কারা হচ্ছেন দুদকের নতুন অভিভাবক, এ নিয়ে চলছে আলোচনা।

তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে শিগগির কমিশন গঠন নিয়ে সংশয় রয়েছে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার।

সংসদের প্রথম অধিবেশনে দুদকের নতুন অধ্যাদেশ বহাল এবং সার্চ কমিটি গঠনের পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে। দুদকের কেউ কেউ বলছেন, এই অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে তুলতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় কমিশন নিয়োগ দেরি হতে পারে। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছে ১২ মার্চ। আগামীকাল রোববার প্রথম অধিবেশনের মূলতবি অধিবেশন শুরু হবে। এই অধিবেশনেই দুদকের বিষয় সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে মনে করছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

দুদকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, সরকারের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা আছে। দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা থাকবে এটা নিশ্চয়ই কেউ চাইবে না।

দুদকে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন এ নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তার (মোতাহার) নাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও শোনা গিয়েছিল।

নতুন কমিশনার পদের জন্য যাদের নাম শুনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাত হোসেন ভূঁইয়া, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, পুলিশের সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়কার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব এ এইচ এম নুরুল ইসলাম। প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো: আব্দুল্লাহ আল বাকী, সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেনের নামও দুদক চেয়ারম্যান বা কমিশনের সদস্য হিসেবে শোনা যাচ্ছে।

যদিও অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। ২০২৫ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এখন দুদক সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের কমিশন হতে পারবে। এতে অন্তত একজন নারী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ একজন সদস্য রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন।

আইন অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি বাছাই কমিটি কাজ করে। সংশোধিত বিধানে এই কমিটি সাত সদস্যের। এর সভাপতি থাকবেন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। এ ছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত একজন হাইকোর্ট বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের স্পিকারের মনোনীত সরকার ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ বা সুশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন নাগরিক। জাতীয় সংসদ না থাকলে সংসদ সদস্য দু’জন ছাড়া কমিটি গঠন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।

সংশোধিত আইনে কমিশনার হওয়ার যোগ্যতাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আইন, প্রশাসন, বিচার, হিসাব বা নিরীক্ষা, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে কাউকে কমিশনার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্য দিকে, বিদেশী নাগরিকত্ব গ্রহণ, অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি নেয়া বা অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করাও অযোগ্যতার কারণ হতে পারে।

সাবেক ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে ২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে জন্ম নিয়েছিল ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক)। সেই থেকে এ পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন এই সংস্থার হাল ধরেছে। তবে, দুই দশকের এই পথচলায় ‘স্বাধীন’ তকমা থাকলেও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে চরম অস্থিরতা।

দুদকের আইনে প্রথমে কমিশনের মেয়াদ চার বছর এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, সাতটি কমিশনের মধ্যে মাত্র তিনটি কমিশন তাদের নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করতে পেরেছে। বাকি চারটি কমিশনই মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগে হয় পদত্যাগ করেছে, না হয় নাটকীয়ভাবে বিদায় নিয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুর্নীতি দমন কমিশন তার হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারের একটি মরিয়া চেষ্টা চালায়। মাত্র তিন মাসের মধ্যে প্রায় দেড় শতাধিক মন্ত্রী, এমপি ও আমলার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়। তবে এই ‘ভোল পাল্টানো’ পদক্ষেপে জনমনে আস্থা ফেরানো সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাল ধরেন সাবেক সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি যখন দুদকে আসেন, তখন তার সামনে ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ।

চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনের সাথে কমিশনার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাফিজ আহসান ফরিদ। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই কমিশন নিয়ে নানা গুঞ্জন থাকলেও, ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব পাওয়ার ১৫ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন তারা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে কমিশনটি অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই স্বল্প সময়ে দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ১৫ হাজারেরও বেশি অভিযোগ জমা পড়ে। দুদকের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এত ব্যাপক পরিসরে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কমিশনের শক্ত পদক্ষেপে প্রায় সাড়ে তিন হাজার ভিআইপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আইনি জালে আটকা পড়েছে। এই তালিকায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে বিগত সরকারের প্রায় সব প্রভাবশালী মন্ত্রী, সাবেক ক্ষমতাধর আমলা এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা রয়েছেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews