॥ ডঃ শহীদুল ইসলাম ॥

বাংলাদেশের নদী, হাওর-বাঁওর, বিল ও প্লাবনভূমি ঘিরে গড়ে ওঠা সভ্যতা বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এই ভূপ্রকৃতিতে মাছ কেবল একটি খাদ্য নয়, বরং জীবনধারা, অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর কারণে মাছ দ্রুত পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকায় মানুষ বহু প্রাচীনকাল থেকেই সংরক্ষণের উপায় খুঁজতে শুরু করে। এই অনুসন্ধান থেকেই জন্ম নেয় শুকনা মাছ এবং তার উন্নত রূপ-গাঁজনভিত্তিক সংরক্ষিত খাদ্য, যার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো চেপা শুটকি।

ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে মাছ গাঁজনের ধারণা মানবসভ্যতার অত্যন্ত প্রাচীন একটি প্রযুক্তি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৯,০০০ বছর আগে থেকেই মাছ গাঁজনের প্রমাণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জলাভূমিনির্ভর সমাজগুলোতে এই প্রযুক্তি স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়। বাংলাদেশের চেপা শুটকি এই প্রাচীন ধারারই একটি স্থানীয় রূপ, যা সম্ভবত শত শত থেকে এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নদী ও হাওরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিকশিত হয়েছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা ব্যক্তির আবিষ্কার নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অভিজ্ঞতা, পরিবেশজ্ঞান এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে।

চেপা শুটকি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় ছোট দেশীয় মাছ-যেমন পুঁটি, ফাইশা, মলা, ঢেলা ইত্যাদি। এই মাছগুলো সহজলভ্য, পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এবং সম্পূর্ণ শরীরসহ (হাড়সহ) খাওয়া যায়। মাছ সংগ্রহের পর তা পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নেওয়া হয় এবং এরপর খোলা রোদে আংশিক শুকানো হয়। এই আংশিক শুকানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মাছের ভেতরের “ফ্রি ওয়াটার” বা সহজলভ্য পানি কমিয়ে দেয়। তবে পুরোপুরি শুকানো হয় না, কারণ গাঁজনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা প্রয়োজন। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যই চেপা শুটকির সফলতার একটি বড় রহস্য।

এরপর মাছগুলো মাটির তৈরি পাত্র বা মটকার মধ্যে স্তরে স্তরে চাপ দিয়ে সাজানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাছের ওপর ভারী বস্তু চাপিয়ে দেওয়া হয়, যাতে বাতাস বের হয়ে যায় এবং ভেতরে অক্সিজেন না থাকে। এরপর পাত্রের মুখ কাদামাটি, ছাই বা তেল দিয়ে সিল করে দেওয়া হয়। এর ফলে একটি অ্যানারোবিক (oxygen-free) পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা গাঁজন প্রক্রিয়ার জন্য আদর্শ। এই অবস্থায় মাছ কয়েক মাস-কখনো ৩ মাস থেকে ১২ মাস পর্যন্ত-সংরক্ষণ করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অণুজীববিজ্ঞান। মাছের গায়ে, অন্ত্রে এবং পরিবেশে থাকা বিভিন্ন অণুজীব গাঁজন প্রক্রিয়া শুরু করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া-যেমন Lactobacillus, Pediococcus এবং Leuconostoc। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মাছের গ্লাইকোজেন বা শর্করা ভেঙে ল্যাকটিক অ্যাসিড তৈরি করে, যার ফলে খাদ্যের pH কমে প্রায় ৪.৫-৫.৫ এর মধ্যে নেমে আসে। এই অম্লীয় পরিবেশ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে এবং খাদ্যকে নিরাপদ রাখে।

গাঁজন প্রক্রিয়াটি মাইক্রোবিয়াল সাকসেশন বা ধাপে ধাপে অণুজীবের পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে বিভিন্ন ধরনের অণুজীব সক্রিয় থাকে এবং এই সময় দূষণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দ্বিতীয় ধাপে ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশকে অম্লীয় করে তোলে। তৃতীয় ধাপে প্রোটিওলাইটিক ও লিপোলাইটিক ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে মাছের প্রোটিন ও চর্বি ভেঙে জটিল রাসায়নিক যৌগ তৈরি করে।

প্রোটিওলাইসিস প্রক্রিয়ায় মাছের প্রোটিন ভেঙে অ্যামিনো অ্যাসিড তৈরি হয়, যার মধ্যে গ্লুটামিক অ্যাসিড উমামি স্বাদের জন্য দায়ী। অন্যদিকে, লিপোলাইসিস প্রক্রিয়ায় মাছের চর্বি ভেঙে ফ্যাটি অ্যাসিড, অ্যালডিহাইড, কিটোন এবং এস্টার তৈরি হয়, যা চেপা শুটকির তীব্র গন্ধের মূল উৎস। ট্রাইমিথাইলামিনের মতো যৌগ এই গন্ধকে আরও তীব্র করে তোলে।

চেপা শুটকির সংরক্ষণে পানি সক্রিয়তা (water activity-aw) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাজা মাছের aw প্রায় ০.৯৮-০.৯৯, যা অণুজীব বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কিন্তু আংশিক শুকানোর ফলে চেপা শুটকির aw কমে গিয়ে প্রায় ০.৬০-০.৭৫ এর মধ্যে নেমে আসে। এই মাত্রা intermediate moisture food হিসেবে পরিচিত। এই aw স্তরে অধিকাংশ রোগজীবাণু বৃদ্ধি করতে পারে না, তবে কিছু ইস্ট ও ছত্রাক টিকে থাকতে পারে। তাই ধি কমানোর পাশাপাশি অন্যান্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

এই কারণেই চেপা শুটকিতে “হাডল টেকনোলজি” কাজ করে। এখানে কম aw কম pH, অক্সিজেনের অভাব এবং উপকারী অণুজীব একসঙ্গে কাজ করে খাদ্যকে নিরাপদ রাখে। এই বহুস্তরীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা চেপা শুটকিকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য করে তোলে।

তবে ঝুঁকিও রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হলে Escherichia coli, Salmonella বা Staphylococcus aureus থাকতে পারে। এছাড়া ছত্রাক জন্মালে মাইকোটক্সিন তৈরি হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, পরিষ্কার পানি, সঠিক শুকানো এবং পাত্র জীবাণুমুক্ত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পুষ্টিগুণের দিক থেকে চেপা শুটকি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এতে উচ্চমাত্রার প্রোটিন রয়েছে, যা শরীরের কোষ গঠন ও মেরামতে সহায়তা করে। ছোট মাছ ব্যবহারের কারণে এতে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের পরিমাণ বেশি থাকে। গাঁজন প্রক্রিয়ার ফলে পুষ্টি উপাদানের জৈবপ্রাপ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য সহজপাচ্য হয়।

চেপা শুটকি বাঙালির সংস্কৃতির একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। এটি প্রমাণ করে কিভাবে মানুষ পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে খাদ্য সংরক্ষণের উপায় উদ্ভাবন করেছে। বর্ষাকালে যখন মাছ ধরা কঠিন, তখন এই সংরক্ষিত খাদ্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এর গন্ধ ও স্বাদ বাঙালির স্মৃতি, আবেগ ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

এই খাদ্যের উৎপাদন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কাঠামো রয়েছে। মাছ সংগ্রহের কাজ সাধারণত পুরুষ জেলেরা করে থাকেন। অন্যদিকে, প্রক্রিয়াজাতকরণ-যেমন পরিষ্কার করা, শুকানো, মটকায় রাখা, সংরক্ষণ-এসব কাজ প্রধানত নারীরাই করে থাকেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মাছের post-harvest প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরাই প্রধান শ্রমশক্তি। এই দক্ষতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে নারীদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা চেপা শুটকিকে একটি নারী-নির্ভর লোকজ শিল্পে পরিণত করেছে।

সবশেষে বলা যায়, চেপা শুটকি হলো প্রাচীন জ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান, পরিবেশ ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ সমন্বয়। প্রায় হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করে এটি আজও বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক স্বাস্থ্যবিধি ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যকে আরও নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করে তোলা সম্ভব।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews