ইবনে হাসান

পবিত্র মাহে রমযান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছে। রমযান শেষে ঈদের হাসিমাখা বাঁকা চাঁদ আনন্দের জোয়ার সৃষ্টি করেছে ঘরে ঘরে। খুশির ঢেউ যেন আছরে পড়ছে দর্শনীয় ও পর্যটন স্পটগুলোতে। সর্বস্তরের মানুষ উল্লাসে আবেগ আপ্লুত। রমযানের সময় যে নিয়ন্ত্রণটা ছিল সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে তা যেন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়ছে। অবস্থা পর্যালোচনায় মনে হয় এক মাসের সিয়াম পালনকালে যে শৃঙ্খলা ও সংযম ছিল, কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল ধিরে ধিরে তা উধাও হয়ে যাচ্ছে। রোজার মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন শুধু রমযান মাসের জন্যই ছিল। এখন আর তার চর্চা অতজরুরি নয়। এখন মুক্ত স্বাধীন বাধাবন্ধনহীন। প্রশ্ন হলো আমরা রোজা পালন করি যে তাকওয়া অর্জনের জন্য তাকি শুধু ঐ একটি মাসের জন্য? যদি না হয় তাহলে রমযান শেষ হওয়ার পরপরই আমাদের এমন হাল হয় কেন? পুরো রমযান মাসে কত যত্ন সহকারে সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে আমরা রোজা পালন করি। রোজা নষ্ট হয় বা রমযানের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হয় ভুলেও সে কাজ কেউ করে না। রমযান মাসে পানাহার যৌনাচার ও যাবতীয় অশ্লীলতা কঠোরভাবে পরিহার করে রোজা পালন করতে হয়। রোজা ত্রুটিমুক্ত রাখতে সাবধানতার মাত্রাটা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। ক্ষুৎ-পিপাসায় প্রচণ্ডভাবে কাতর হয়ে পড়লেও দরজা বন্ধ করে লোভনীয় আহার নাগালে থাকা সত্ত্বেও কেউ মুখে তুলতে পারে না বা মুখে নেয় না। নদী বা পুকুরে গোসলে নেমে পিপাসার্ত অবস্থায় ডুব দিয়ে এক ঢোক পানিও কেউ পান করে না। কারণ রোজাদার জানে নির্জনে বা পানির নীচে দুনিয়ার কেউ না দেখলে বা না জানলেও মহান প্রভুর দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়া যায় না। এমন তীব্র অনুভূতিই তাকওয়ার দাবি। তাই চেতনার সর্বোচ্চ সতর্কতাকেই তাকওয়া বলা যায়। এটা সৃষ্টি হয় মূলত আল্লাহর ভয় থেকে। অর্থাৎ আল্লাহকে যে যত বেশি ভয় করে সে তত তাকওয়াবান বা মুত্তাকী। রমযানের রোজা ফরজ করা হয়েছে এই বলে যে, আশা করা যায় তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে। এখন প্রশ্ন হলো তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি? আসল সমস্যাটা এখানেই। রোজা পালনের মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করি। সেজন্য প্রতি মুহূর্তে সতর্কতা অবলম্বন করে চলি যাতে রোজার কোন ক্ষতি না হয়, এর পবিত্রতা ক্ষুণ্ন না হয়। রোজা পালনের সমস্ত নিয়মকানুন অত্যন্ত নিষ্ঠা আন্তরিকতা ও ধৈর্য্যরে সাথে অনুসরণ করা হয় যে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়ার অবকাশও থাকে না। অন্যান্য ফরজ ইবাদাতের ন্যায় রোজা বা সিয়ামও একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত। অর্থাৎ রোজা পালনই মূল কথা নয় প্রকৃত উদ্দেশ্য ভিন্ন। আর সে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে অনবহিত বা গাফেল থাকলে পুরো সাধনাই যে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য তা আমরা আমলেই নেই না। ফলে রমযান শেষ হওয়ার পর তাকওয়ার চেতনা স্থায়ী হয় না বা শিথিল হয়ে যায়। এমন হওয়ার কারণ রোজা পালনকে কঠোর আনুষ্ঠানিকতায় বন্দী করে ফেলা হয়েছে। ফলে রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য লক্ষ্যের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়ার প্রয়োজনই বোধ হচ্ছে না। এতে এ পবিত্র আমল পালন অনেকটা বেকার হয়ে যাচ্ছে না ত?

রমযান মাসের এত গুরুত্ব ও মর্যাদা কেন লাইলাতুল ক্বদরের এত সম্মান কেন। প্রকৃতপক্ষে রমযানে রোজা পালন করে তাকওয়া অর্জনের তাকিদ দেয়া হয়েছে অনেক বড় ও অপরিহার্য উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য। পবিত্র কালামে পাকে সেকথা মহান আল্লাহ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন। দৃষ্টিটাত সে দিকেই নিবদ্ধ করতে হবে। অন্যথা অনেক ধনসম্পদ অর্জন করে সিন্ধুকে রেখে দিলে তা থেকে না নিজে না অন্যরা উপকৃত হতে পারে। ঠিক তেমনি মূল উদ্দেশ্য ভুলে গেলে বা উপেক্ষা করলে তাকওয়া অর্জন করে তার সত্যিকার ফায়দা কখনো হাসিল হবে না। এত নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে রোজা পালনের পরও তাই ব্যক্তি সমাজ জাতির মধ্যে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দেখা যায় না। তাকওয়ার সুফল থেকে অনেক অনেক দূরে আমাদের অবস্থান।

আমরা জানি, রমযান মাসের ও লাইলাতুল ক্বদরের রজনীর সীমাহীন মর্যাদা ও সম্মান কেবল এজন্য যে এ মাসে ও ক্বদরের রজনীতে মহান রাব্বুল আলামিন সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপবিত্র মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল করেছেন তাই উক্ত সম্মান আর মর্যাদার সবটুকুই এ মহাগ্রন্থের সাথে জড়িয়ে আছে। পবিত্র রমযান মাসত অন্যান্য মাসের মতই একটি মাস আর ক্বদরের রজনীও অন্যান্য রাতের মতই একটি রাত। পার্থক্যটা শুধু পবিত্র কুরআন নাজিলের কারণেই। যেমন আমরা সাধারণত পবিত্র কুরআন হাতে নিয়ে ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে তাতে চুম্বন করি। সেই চুম্বনটা অঙ্কিত হয় কুরআনে পাকের মলাট অথবা জুজদান বা আবৃত করে রাখা কাপড়ের ওপর। আসলেত আমরা ওই মলাট বা কাপড়ের টুকরাকে সম্মান জানাই না। পবিত্র কুরআনকে জড়িয়ে আছে বলেই হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা ও সম্মানের চুম্বন মলাট বা কাপড়ের টুকরা পেয়ে যাচ্ছে। সুতরাং কুরআনে করীমের এমর্যাদা বুঝতে কারো কষ্ট হয় না।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কুরআনের কারণে লাইলাতুল ক্বদর ও রমযনের মর্যাদাকে আমরা যথাযথ মূল্যায়নের চেষ্টা করি। কিন্তু পবিত্র কুরআনের প্রতি আমরা যে আচরণ করছি তাকি মেনে নেয়া যায়। আমাদের আচরণটা এমন যে বরের দিকে নজর না দিয়ে বরযাত্রাীদের সেবায় অন্ধের মত ব্যস্ত থাকা। এটা কুরআনের সাথে চরম বেয়াদবি ছাড়া আর কি বলা যায়। এ জন্য নিষ্ঠার সাথে রোজা রেখে তাকওয়া অর্জন করেও আমাদের ব্যক্তি পরিবার ও সমাজে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।

রোজা পালন করে তাকওয়া অর্জনের মূল কথা কি সেটা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছে, পবিত্র কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত গ্রন্থ। রমযানের রোজা পালনের মাধ্যমে মুত্তাকী হওয়া যায়। রোজা পালন করে মুত্তাকী হলাম কিন্তু কুরআন থেকে হেদায়েত গ্রহণ করলাম না তাহলে মুত্তাকী হওয়ার সার্থকতা কোথায়। প্রকৃতপক্ষে তাকওয়া এমন একটি মহৎ গুণ যেটা অর্জন ছাড়া কুরআনের পথে চলা যায় না। যেমন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ যুদ্ধ করতে পারে না। সে বিবেচনায় প্রত্যেক মুসলিমই একজন সত্যের সৈনিক সত্যকে ধারণ, সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কোন বিকল্প নেই। সারাজীবন তাকে এ সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়। সে জন্য সবচেয়ে ২টি অপরিহার্য্য অস্ত্র হাতছাড়া করতে পারেই না। তা হচ্ছে-তাকওয়া ও আলকুরান। তাকওয়ার গুণাবলীতে উজ্জীবিত হয়ে আল কুরআন বুকে ধারণ করে তাকে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হতে হবে। রোজার মাধ্যমে অর্জিত তাকওয়া তার অন্তর্চক্ষু খুলে দিয়ে সত্যানুশীলনের দুর্দমনীয় চেতনা ও প্রেরণার সৃষ্টি করে। আর আল কুরআনের আলো তাকে পথের দিশা দেয়। ন্যায় অন্যায় ভাল মন্দ কল্যাণ অকল্যাণ সঠিক বেঠিক সবকিছু সুস্পষ্টভাবে তার সামনে তুলে ধরে আল কুরআন।

পৃথিবীতে যাকিছু আছে সব কিছুই মোহনীয় লোভনীয় আকর্ষণীয়। চাকচিক্যময় করেই সাজানো হয়েছে পৃথিবীটাকে। অপর দিকে মানুষ সৃষ্টি করা হয়েছে মূলত পরীক্ষা করার জন্য। তার মধ্যে দু’টি সত্ত্বা রয়েছে যেটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। পাশবিক ও মানবিক তথা নৈতিক সত্ত্বা। পাশবিক সত্ত্বা অর্থাৎ পাশবিক প্রবৃত্তি দমন ও নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক নৈতিক সত্ত্বার বিকাশে তাকওয়ার চেয়ে বড় হাতিয়ার আর কিছু নেই। মানব রচিত আইন-কানুন নিয়মবিধি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অচল। মানুষের মধ্যে লোভ লালশা কামনা বাসনা ও জৈবিক চাহিদা অত্যন্ত প্রবল। শুধু বাহ্যিক শাসনের দ্বারা তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সে কারণে কঠোর আইন কানুন ও জেল জরিমানা বা তার চেয়ে কঠিন দণ্ডও তাকে সব সময় আটকাতে পারে না। এ প্রবণতা যাদের মধ্যে প্রবল তারা অবলিলায় মারামারি কাটাকাটি খুনাখুনী হিংসা বিদ্বেষ জুলুম নির্যাতন চুরি ডাকাতি ধোঁকাবাজি প্রতারণা ইত্যাকার সকল রকমের অপরাধ অবলিলায় করে যায়। কেবল তীব্র অন্তর্নিহীত চেতনাই তাকে ফেরাতে পারে এহেন অপকর্ম থেকে। সে চেতনার নামই তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহ ভীতি যেটা অর্জিত হয় রোজা বা সিয়াম সাধনার মাধ্যমে। এ তাকওয়া মানুষের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে তার নৈতিকতার বিকাশ ঘটায় এবং তাকে মৌলিক গুণাবলী অর্জনে সহায়তা করে।

প্রবৃত্তি দমন ও নৈতিক গুণাবলী অর্জন ছাড়া কারো পক্ষে সত্য ও ন্যায়ের অর্থ্যাৎ কুরআনের পথে চলা সম্ভব নয়। কুরআনের পথে চলা কুরআনের বিধান বাস্তবায়নই মুমীন জীবনের মূল লক্ষ্য। সে জন্য প্রয়োজন কুরআনের ব্যাপক চর্চা ও অনুশীলন। মহান রব রমযান মাসে কুরআন নাজিলের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, এ কুরআন মানুষের জন্য পথের দিশা বা হেদায়েত এবং হেদায়েতের সুস্পষ্ট দলিল এবং সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশকারী। অতএব শান্তি মুক্তি ও ইনসাফের সমাজ ও জাতি গঠনে আল কুরআনের নির্দেশিত পথে চলা অপরিহার্য্য। তাকওয়া অর্জনের মূল দাবি সেটাই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews