থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ৮ মে বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস পালিত হয়। থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের ব্যাধি যা বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে চলেছে। বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া বাহকের উচ্চ প্রকোপ এবং পরিবার ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর রোগের ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই দিনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এটি কেবল একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যাই নয়, বরং একটি সামাজিক উদ্বেগও বটে যার জন্য প্রতিরোধমূলক কৌশল, বিশেষ করে প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং প্রয়োজন। থ্যালাসেমিয়া একটি জেনেটিক ডিসঅর্ডার যা অস্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন উৎপাদনের দ্বারা চিহ্নিত করা হয়, যার ফলে রক্তাল্পতা এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দেয়। এটি অটোসোমাল রিসেসিভ প্যাটার্নে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হয়, যার অর্থ হল একটি শিশু কেবল তখনই গুরুতর থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে যদি তার পিতা এবং মাতা উভয়ই এই রোগের বাহক হন। এই ধরনের ক্ষেত্রে, তাদের সন্তানের ২৫% এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদিও এই শতকরা সম্ভবনা কোন দম্পতির কোন কোন সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবে সেটি নির্দেশ করে না। তথাপি এই সাধারণ জেনেটিক তথ্যটি তুলে ধরে কেন বাংলাদেশের মতো দেশগুলিতে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত।
বাংলাদেশ "থ্যালাসেমিয়া বেল্ট"-এর মধ্যে অবস্থিত, যেখানে এই রোগটি অত্যন্ত প্রচলিত। দীর্ঘকাল ধরে, গবেষণায় দেখা গেছে যে জনসংখ্যার প্রায় ৬-১২% থ্যালাসেমিয়া বা অন্যান্য হিমোগ্লোবিন ব্যাধির বাহক। একটি জাতীয় সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক তথ্য নির্দেশ করে যে বাহকের হার আসলে প্রায় ১১.৪%, যা প্রমান করে দেশব্যাপী প্রায় ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি থ্যালাসেমিয়া বাহক রয়েছে। এই বিশাল বাহক সংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ১৪-৩৫ এর মাঝে, যার মানে দাঁড়ায় এই প্রজন্ম থেকে ভবিষ্যতে যেসব শিশুরা জন্ম নিবে তারা ঝুঁকির মাঝে রয়েছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, যাদের অনেকেরই জীবনব্যাপী রক্ত সঞ্চালন এবং ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
থ্যালাসেমিয়া কেবল একটি রোগ নয় বরং এর গভীর মানসিক সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রতিঘাত রয়েছে। পরিবারগুলি প্রায়শই নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন, আয়রন চিলেশন থেরাপি এবং হাসপাতালে ভর্তির খরচের সাথে লড়াই করে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার সংস্থান ইতিমধ্যেই সীমিত, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ব্যবস্থাপনা সেখানে অপ্রতুল। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ শুধুমাত্র একটি সুস্থ-সবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নয় বরং অর্থনৈতিক কারণেও প্রয়োজনীয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর কৌশলগুলির মধ্যে একটি হল প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং। প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিংয়ের মধ্যে রয়েছে বিবাহের আগে ব্যক্তিদের পরীক্ষা করে দেখা যে তারা থ্যালাসেমিয়া জিনের বাহক কিনা। যদি উভয় অংশীদার বাহক হিসাবে চিহ্নিত হন, তবে তারা জেনেটিক কাউন্সেলিংয়ের সহায়তায় বিবাহ এবং পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিবাহের পূর্বে স্ক্রিনিং-এর মূল উদ্দেশ্য হলো থ্যালাসেমিয়া বাহক এবং বাহকের মাঝে বিয়ে নিরুৎসাহিত করা যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানো যায়।
যেহেতু বাহকরা সাধারণত সুস্থ থাকেন এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকেন, তাই স্ক্রিনিং তাদের সনাক্ত করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়। দুজন বাহকের মধ্যে বিবাহ প্রতিরোধ করে বা কাউন্সেলিং প্রদানের মাধ্যমে, গুরুতর থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের জন্ম উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে কার্যকর স্ক্রিনিং এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া তাত্ত্বিকভাবে ১০০% প্রতিরোধযোগ্য। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন কোনো কর্মসূচি নেই, যদিও ২০১৯ সালে প্রণীত নীতিমালায় এটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অতএব, এই নীতি কার্যকর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব এবং ইরানের মতো বেশ কয়েকটি দেশ বাধ্যতামূলক প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে। এই উদ্যোগগুলি নতুন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে।
বাংলাদেশ এই মডেলগুলি থেকে শিখতে পারে এবং তাদের নিজস্ব আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুসারে মানিয়ে নিতে পারে। নিঃসন্দেহে, একটি থ্যালাসেমিয়া কর্মসূচির সাফল্য গণমানুষের সচেতনতার উপর নির্ভর করে এবং এর উদ্দেশ্যগুলির বাস্তবায়ন সচেতনতার উপর নির্ভরশীল। অন্যথায়, কেবল স্ক্রিনিং রোগের বোঝা কমাতে কার্যকর নাও হতে পারে। এর প্রমাণিত কার্যকারিতা সত্ত্বেও, বাংলাদেশে প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত নয়। প্রধান বাধাগুলির মধ্যে একটি হল সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব। গবেষণায় দেখা গেছে যে শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, যারা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, তাদের অনেকেই থ্যালাসেমিয়া এবং স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান রাখে। সামাজিক বাধা এবং ভুল ধারণাও মানুষকে পরীক্ষা করাতে বা তাদের বাহক অবস্থা প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত করে। দেশজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে বায়োটেড(BioTED)পরিচালিত আমাদের কাজের মাধ্যমে এই সমস্ত চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়েছি।
রক্তের সম্পর্কের মধ্যে বিবাহ (যেমন- চাচাতো ফুফাতো মামাতো খালাতো ভাই-বোনদের মধ্যে বিবাহ) এর মতো সাংস্কৃতিক রীতিনীতি থ্যালাসেমিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। এই ধরনের বিবাহে, উভয় অংশীদার বাহক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা আক্রান্ত সন্তানের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। এই রীতিনীতিগুলি মোকাবেলা করার জন্য স্বাস্থ্য সেবার চেয়ে শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতাই বেশী প্রয়োজন। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হল দেশব্যাপী স্ক্রিনিং কর্মসূচির অভাব এবং সহজলভ্য ডায়াগনস্টিক সুবিধার অভাব। অনেক মানুষ, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, সাশ্রয়ী মূল্যের স্ক্রিনিং পরিষেবাগুলিতে প্রবেশাধিকার পায় না। সরকারি সহায়তা এবং নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া, প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিংকে একটি রুটিন অনুশীলনে পরিণত করা করা কঠিন।
বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করার জন্য একটি ব্যাপক নীতিমালা এবং কর্মসূচি প্রয়োজন। প্রথমত, স্কুল, কলেজ, মিডিয়া এবং কমিউনিটি সংস্থাগুলির মাধ্যমে জনসচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার করা উচিত। তরুণ প্রজন্মকে জেনেটিক রোগ এবং স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করা দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে পারে। দ্বিতীয়ত, সরকারকে একটি জাতীয় প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করা উচিত। যদিও এটিকে বাধ্যতামূলক করা প্রাথমিকভাবে প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে পারে, তবে বিনামূল্যে স্ক্রিনিং একটি কার্যকর কৌশল হতে পারে যার প্রমাণ আমরা আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে পেয়েছি। বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা পরিষেবাগুলিতে, যেমন নিয়মিত মেডিকেল চেক-আপ বা বিবাহ নিবন্ধন প্রক্রিয়ার সাথে স্ক্রিনিং একীভূত করাও অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। তৃতীয়ত, জেনেটিক কাউন্সেলিং পরিষেবাগুলি প্রসারিত করতে হবে। কেবল স্ক্রিনিং যথেষ্ট নয়; ব্যক্তিদের তাদের ফলাফল বুঝতে এবং অবহিত সিদ্ধান্ত নিতে সঠিক নির্দেশিকা প্রয়োজন। কাউন্সেলিং বাহক অবস্থার সাথে যুক্ত ভয়, কলঙ্ক এবং ভুল ধারণা কমাতে সাহায্য করতে পারে। চতুর্থত, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সাথে সহযোগিতা অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে, দেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশকে থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় আনার একটি অনন্য সুযোগ। অতএব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে সচেতনতা এবং প্রতিরোধ শুরু করা যেতে পারে। বাংলাদেশে, যেখানে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেখানে সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠাঙ্কে জড়িত করা হলে প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
এই বছর, বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসের থিম হল "আর আড়াল নয়: রোগ নির্ণয়হীনদের খুঁজে বের করি, অলক্ষ্যে থাকা রোগীদের সহায়তা করি"। থিমটি মূলত অনাবিষ্কৃত বা নির্ণয়হীন থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বসবাসকারী ব্যক্তিদের উপর এবং যাদের ইতিমধ্যে রোগ নির্ণয় করা হয়েছে কিন্তু যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন না তাদের জন্য সহায়তা উন্নত করার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। নিঃসন্দেহে, আমাদের থ্যালাসেমিয়া রোগীদের যত্নের জন্য কাজ করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে তাদের উন্নত জীবনযাত্রার নিশ্চয়তা দিতে হবে যাতে তারা সমাজের সাথে স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে একীভূত হতে পারে। যদিও এটি খুব কমই ঘটে এবং থ্যালাসেমিয়া রোগীরা অনেক কষ্ট ভোগ করে। ফলস্বরূপ, তারা তাদের জীবনে অগ্রগতি করতে পারে না। বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদ এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি দেশের জন্য থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য খুব সামান্য বা কিছুই দিতে পারে না। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচাতে এই চ্যালেঞ্জটি উপলব্ধি করতে হবে এবং প্রতিরোধই একমাত্র বিকল্প যা আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দিতে পারি। থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা ব্যয়বহুল (প্রতি মাসে যা ২০০-৩০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে), নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন অনেক সময় চ্যালেঞ্জিং এবং একমাত্র নিরাময় হল অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন যা বাংলাদেশের বেশিরভাগ রোগীর সাধ্যের বাইরে। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জ বিবেচনা করে, প্রতিরোধ কম ব্যয়বহুল তবে প্রতিরোধ কর্মসূচি কার্যকর করার জন্য সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং একটি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। স্পষ্টতই, এই বছরের থ্যালাসেমিয়া দিবসের প্রতিপাদ্য থ্যালাসেমিয়া বাহকদের জন্যও বাস্তবায়ন করতে হবে, অজানা বাহকদের শনাক্ত করে, ভয়-ভীতি এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতা দূর করে এবং একটি প্রতিরোধ কর্মসূচি সফলভাবে প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দিয়ে।
এই বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবসে, এটা মনে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে প্রতিটি শিশুর একটি সুস্থ জীবন প্রাপ্য। থ্যালাসেমিয়া, যদিও চিকিৎসা জটিল, কিন্তু সম্পুর্নরুপে প্রতিরোধযোগ্য। প্রাক-বিবাহকালীন স্ক্রিনিং সম্পর্কে সচেতনতা বাড়িয়ে এবং কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন করে, বাংলাদেশ এই রোগের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধ কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি একটি সম্মিলিত সামাজিক কর্তব্য। ব্যক্তি, পরিবার, স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী, গবেষক, সমাজসেবক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি থ্যালাসেমিয়া-মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় হোক বিশেষ এই দিনটির অঙ্গীকার।
নির্বাহী পরিচালক
বায়োটেড