সরকার এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতবিরোধ গোত্রীয় শত্রুতায় পরিণত হলে বিদেশী শক্তিগুলোর কাজ সহজ হয়ে যায়। এ অবস্থায় বিদেশী শক্তিগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিদ্যমান সরকার বা শাসনব্যবস্থাকে অপসারণ করে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার (রেজিম চেঞ্জ) মাধ্যমে সে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ পেয়ে যায় এবং তারপর সেখানে প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট শুরু করে দেয়। ভেনিজুয়েলায় রেজিম পরিবর্তনের অভিযানের শঙ্কা সবার চোখে পড়ছিল; কিন্তু ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর চোখে তা পড়ছিল না। তিনি তার দেশের নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন।
তবে ডিসেম্বর, ২০২৫-এ মারিয়া সমুদ্রপথে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই নাটকীয় পলায়নের অর্থ হচ্ছে, এখন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর অবস্থা ভালো নয়; কিন্তু তিনি অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভোগছিলেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক জেনারেল নরিয়েগাকেও আমেরিকা সেনা অভিযানের মাধ্যমে গ্রেফতার করে এবং মিয়ামির আদালতে মামলা চালিয়ে তাকে শাস্তি দেয়া হয়। নরিয়েগা কোনো এক সময় সিআইএর জন্য কাজ করতেন। যখন তিনি জেদি ও অবাধ্য হয়ে উঠলেন, তখন তাকে শাস্তি দিতে আমেরিকা তার দুই ডজন সৈন্য উৎসর্গ করে। আমেরিকা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে কয়েক বছর পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। অতঃপর তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে ২০০৩ সালে এক রেজিম চেঞ্জ অভিযানে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০১১ সালে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মোয়াম্মার গাদ্দাফির সাথেও এমনই আচরণ করা হয়। মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ভেনিজুয়েলা থেকে পলায়নের পর আমেরিকার মিডিয়াতে এ সংবাদ আসতে থাকে, ইরান ভেনিজুয়েলায় একটি নৌঘাঁটি পেয়েছে এবং ভেনিজুয়েলা ইরান থেকে মুহাজির সিক্স নামের ড্রোন বিমান কিনেছে। অন্যদিকে, মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ইরানসহ হিজবুল্লাহ ও হামাসের সাথেও সম্পর্ক যুক্ত করার চেষ্টায় ব্যস্ত। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ও তার স্ত্রীর অপহরণে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে মারিয়া বলেন, ভেনিজুয়েলার ওপর তো আগে থেকেই ইরান, হিজবুল্লাহ ও হামাস দখল রেখেছিল। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ২০১৫ সালে এরপর ২০২২ সালে ইরান সফর করেন।
ভেনিজুয়েলা বিশে^ সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদনকারী দেশ; কিন্তু হুগো শ্যাভেজের সময় থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার শিকার। হুগো শ্যাভেজ ২০০৬ সালে লেবাননে ইসরাইলের বর্বরোচিত বোমাবর্ষণের পর ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করেছিলেন এবং ২০০৯ সালে গাজায় ইসরাইলের বোমাবর্ষণের পর ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে ভেনিজুয়েলা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে তার মৃত্যুর পর মাদুরো ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হন। ২০২৫ সালে ইসরাইল ও আমেরিকা এক হয়ে ইরানে হামলা করলে ইরান জবাবি হামলার মাধ্যমে ইসরাইলের সামরিক শক্তির মিথ্যা অহমিকা ভেঙে দেয়। ইরান ও ইসরাইলের যুদ্ধের পর ভেনিজুয়েলা ইরানি মিসাইলের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠে।
ভেনিজুয়েলা ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা সামরিক সহযোগিতা আমেরিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কেননা, ভেনিজুয়েলা ও আমেরিকার মধ্যে দূরত্ব বেশি নয়। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ইরানের সাথে বাড়তে থাকা সম্পর্কের পর মার্কিন মিডিয়ায় তার ড্রাগ মাফিয়ার সাথে সম্পর্কের কাহিনী সামনে আসে এবং ২০২৫ সালে তাকে ধরিয়ে দেয়ার পুরস্কারের মূল্য ২৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার করা হয়। এখন একটু ভাবুন, যে ব্যক্তির মাথার মূল্য ৫০ মিলিয়ন ডলার ধার্য করা হয়েছিল, তাকে আমেরিকানরা কত সহজে তার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে তুলে নিয়ে গেল। উসামা বিন লাদেনের মাথার মূল্য ছিল ২৫ মিলিয়ন ডলার। মার্কিন বাহিনী উসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। অথচ প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ধারণা ছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে তেমন অভিযান করতে পারবে না যেমন অভিযান পানামাতে জেনারেল নরিয়েগা বা অ্যাবোটাবাদে উসামা বিন লাদেনের বিরুদ্ধে হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট মাদুরো মনে করতেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে রেখেছেন; কিন্তু তারপরও ট্রাম্প সেই পরোয়ানাপ্রাপ্ত অপরাধীর সাথে দেখা করেন এবং তার সাথে দাঁড়িয়ে মিডিয়ার সামনে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট মাদুরোর ধারণা ছিল, নেতানিয়াহুর মতো পরোয়ানাপ্রাপ্ত অপরাধীর সাথে বন্ধুত্ব নিয়ে গর্ব করা ট্রাম্প তার ওপর হস্তক্ষেপ করবেন না; কিন্তু মাদুরো বোকার স্বর্গে বাস করছিলেন। ট্রাম্প তাকে স্ত্রীসহ প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে গেছেন। এখন তার বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা চলবে এবং শাস্তিও দেয়া হবে। নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির বিরোধিতা সত্তে¡ও তার মুক্তি মিলবে না। চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, কিউবা ও ইরানসহ বহু দেশ ভেনিজুয়েলায় এই রেজিম চেঞ্জ অপারেশনকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। কিন্তু আমেরিকা এমনই এক অপারেশন ইরানেও করতে চাচ্ছে।
কিছু তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকা আফগানিস্তানের জন্যও এমনই এক অভিযানের পরিকল্পনা করে রেখেছে, তবে এ অভিযান হবে ইরানে সফল হওয়ার পর। আসল কথা হচ্ছে, ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে অংশগ্রহণের অনুমতি দেননি। ভেনিজুয়েলার নির্বাচনে প্রকাশ্য কারচুপি হয়েছে, যার ফলে সরকার ও বিরোধীদের রাজনৈতিক লড়াইয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের সুযোগ হয়ে গেল। বাহ্যত আমেরিকা ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে এমন এক ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে গেছে, যার মাথার মূল্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ধার্য করা হয়েছিল। কিন্তু সবাই জানেন, আমেরিকার আসল লক্ষ্য ভেনিজুয়েলায় তেলের খনি। রেজিম পরিবর্তনের পর ভেনিজুয়েলায় তেলের খনিগুলো আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলোর হাতে চলে এসেছে। ভেনিজুয়েলার পর ইরানের পালা। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযানে ইসরাইলও যুক্ত হবে। রাশিয়া ও চীন এ পরিস্থিতিতে নীরব থাকবে না এবং বিশ্ব একটি বড় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের জন্য একই সময় আমেরিকা ও চীনকে সন্তুষ্ট রাখা খুব কঠিন হবে। পাকিস্তান ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার জন্য তার সেনা প্রেরণ করতে প্রস্তুত নয়। ইরানের বিরুদ্ধে রেজিম চেঞ্জ অভিযানেও পাকিস্তান বেশ গুরুত্বপূর্ণ হবে। পাকিস্তানকে এমন কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ থেকে দূরে থাকতে হবে, যা পাকিস্তানে ঘৃণার আগুন উসকে দেয়ার কারণ হতে পারে। পাকিস্তান ট্রাম্পের দুঃসাহসিক অভিযানের অংশ হতে অস্বীকার করলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্রও শুরু হতে পারে। এ জন্য পাকিস্তানের উচিত তার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর মনোযোগ দেয়া। পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও বিভাজন বিপদের সব ধরনের রেডলাইন অতিক্রম করেছে এবং সরকারবিরোধীদের মধ্যে কারো জন্য কোনো মারিয়া কোরিনা মাচাদো খুঁজে নেয়া কঠিন হবে না। এ পরিস্থিতিতে রানা সানাউল্লাহ পাকিস্তানের পাঁচ শীর্ষ নেতার মধ্যে আস্থা তৈরির জন্য কিছু পদক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার বক্তব্য, প্রেসিডেন্ট জারদারি তার এ প্রস্তাবের পক্ষে আছেন; কিন্তু আমাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট জারদারি এ মুহূর্তে ইমরান খানের সাথে সমঝোতার জন্য প্রস্তুত নন এবং খোদ খান সাহেবও প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সমঝোতায় রাজি নন। রাজনৈতিক মতভেদকে গোত্রীয় শত্রুতায় পরিণত করা বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। পাকিস্তানের সরকার ও বিরোধী দলের উচিত ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নেয়া।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট