ইদানিং একটি কথা মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়: ‘ক্লাস রুম ফাঁকা কোচিং সেন্টার ঠাঁসা’। নগরীর অলিগলিতে স্কুল-কলেজের চেয়ে কোচিং সেন্টার বেশি। স্কুলগুলোর দায়িত্ব শুধু সার্টিফিকেট দেওয়া আর পড়া শোনার দায়িত্ব মনে হয় কোচিং সেন্টারগুলোর। কিন্তু অভিভাবকদের মাসিক বেতন দিতে হবে দুই জাগাতেই। হতবাক হতে হয় এজন্য যে, কোচিং সেন্টারের মাসিক বেতন আবার স্কুল-কলেজের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আরও হতবাক হতে হয় এ কারণে যে, স্কুলের শিক্ষকরাই কোচিং সেন্টারগুলোর শিক্ষক-শিক্ষিকা। দুই জায়গা থেকেই একজন শিক্ষকের আয়ের সুযোগ থাকছে কোচিং সেন্টারগুলো ব্যবসায়িক কায়দায় গড়ে ওঠার কারণে। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত অভিভাবক সমাজ দুই জায়গায় টাকা দিতে গিয়ে ফতুর হয়ে যাচ্ছে। এতে তাদের অর্থ যেমন লোপাট হচ্ছে তেমনি সময়েরও প্রচুর অপচয় হচ্ছে। বিশ্বের উন্নত কয়েকটি দেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে আমার। সেখানে কোচিং সেন্টার নেই। পড়াশোনা সব স্কুল-কলেজেই হয়। অনেক স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল সে দেশগুলোর সরকারের অনুদানে চলে। বাসায় এসে ঘরের কাজ এবং নিজের কাজ নিজেকে করতে হয় শিক্ষার্থীদের। অনেক স্কুলে বইপত্র ক্লাসে রেখে আসতে হয়। উন্নত বিশ্বের শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলা, রাষ্ট্রের একমাত্র চিন্তা বলে মনে হয় আমার কাছে। ঐ সমস্ত দেশের অভিভাবকরা মহা খুশি। কারণ, তাদের বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। অন্যদিকে অর্থেরও সাশ্রয় হয়। আমরা জুলাই আন্দোলন করলাম প্রায় পৌনে দুই বছর হতে চললো কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে বৈষম্য এখনো চলমান। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক বিষয়ে বৈষম্য বিদূরিত না হয়ে প্রতিদিনই তা বাণিজ্যে রূপ ধারণ করছে। বাংলাদেশে মাথাপিছু বছরে গড় আয় মাত্র ২,৬৮৯ ইউএস ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ায় পঞ্চম স্থান। প্রথম স্থান মালদ্বীপের। সেখানে গড় আয় ১৮,২০৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে যদি শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং ন্যায়বিচার ইত্যাদি মানবিক কর্মকা- বাণিজ্যিক রূপ নেয় তাহলে দুর্নীতিতে দেশটি পুনরায় বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রূপ ধারণ করবে। আমরা বিগত সময়ে দুর্নীতিতে ৫ বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন খ্যাতি অর্জন করেছি এটা খুবই লজ্জাজনক ব্যাপার।

বাংলাদেশে এমন কিছু কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে যেখানে বছরে কয়েক লাখ টাকা ডোনেশন দিতে হয়। উদাহরণ স্বরূপ লালমাটিয়ায় একটি কোচিং সেন্টারে আছে যেখানে বছরে দুই লাখ টাকা প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে নেওয়া হয়। কাগজে-কলমে আইনী বিধানে লেখা আছে, আবাসিক এলাকায় কোনো কোচিং সেন্টার, স্কুল-কলেজ-হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ব্যবসা-বাণিজ্যি থাকতে পারবে না। উল্লেখ্য, আবাসিক এলাকায় বসতবাড়ি ও খেলার মাঠ ছাড়া আর কিছুই থাকতে পারবে না, কিতাবি আইনে এরকম কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে সেটা দেখা যায় না। কিন্তু প্রায় তিন দশক ধরে ঢাকার নামি দামি আবাসিক এলাকাগুলো বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছে। এসব কারণে আবাসিক এলাকায় যানজট দানবরূপ ধারণ করছে এবং আবাসিক এলাকা তার চিরাচরিত সৌন্দর্য হারাচ্ছে। এসব কারণে আবাসিক এলাকাগুলো বহুমাত্রিক দূষণে আক্রান্ত হচ্ছে। রোগব্যাধি লেগেই থাকে আবাসিক এলাকাগুলোতে। কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসা প্রাইভেট কারগুলি প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা রাস্তার দুই পাশে ৮ থেকে ১০ ফুট জায়গা দখল করে বসে থাকে। এখানেও চাঁদাবাজি চলে। আছে তরিতরকারি বিক্রেতার আনাগোনা। এ কারণে যানজট লেগেই থাকে আবাসিক এলাকাগুলোতে।

কোচিং সেন্টার বর্তমানে শিক্ষা ও ব্যবসা উভয়ের সংমিশ্রণ হলেও, এর বাণিজ্যিক দিকটিই প্রবল হয়ে উঠেছে। এটি দুর্বল ছাত্রদের সহায়তার একটি মাধ্যম হিসেবে মনে করা হলেও নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য কোচিং বাণিজ্যকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারের অনিয়ন্ত্রিত এই বাণিজ্য শিক্ষাব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবেও দেখা দিয়েছে। বিস্তারিত বিষয়সমূহ: (১) শিক্ষামূলক দিক: দুর্বল ছাত্র- ছাত্রীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অর্জন, সিলেবাস সময়মতো শেষ করা এবং ভালো ফলাফলের জন্য কোচিং সহায়তা করে। (২) ব্যবসায়িক দিক: কোচিং সেন্টারগুলো মূলত একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষকরা বিদ্যালয়ে যথাযথভাবে না পড়িয়ে কোচিংয়ে বেশি সময় দেন। (৩) নীতিমালা ও সমস্যা: বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিষিদ্ধ হলেও হাজার হাজার সেন্টার চালু আছে। (৪) পরিণতি: ছাত্ররা এখন মুখস্থ-নির্ভর হয়ে পড়েছে এবং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। সব মিলিয়ে কোচিং এখন আর শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। তাহলে কোচিং বাণিজ্য কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বিকল্প একটি ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে উঠছে? প্রশ্নটি এসেই যায়।

স্কুল টাইম ফাঁকি দিয়ে রমরমা বাণিজ্য নতুন শিক্ষা আইনের খসড়ায় প্রাইভেট ও গাইড বইয়ের বৈধতা দেয়া হচ্ছে। কোচিং সেন্টারের বাাইরেও হাল আমলে জমজমাট অনলাইন কোচিং ব্যবসার লাগাম টানা যাচ্ছে না। বিগত সময়ে আইন করেও কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা কিংবা স্কুল শিক্ষকদের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের বাইরে টাকার বিনিময়ে পাঠদান বন্ধ করা যায়নি। বরং নানা কৌশলে ভিন্ন ভিন্ন নামে অবাধে চলছে এই ব্যবসা। অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও ক্লাসরুমে আরো বেশি সময় নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার দাবি ছিল। কিন্তু চাপপ্রয়োগ করে কিংবা আইনের দোহাই দিয়েও তা আজও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বাস্তবে বিভিন্ন স্কুলের ক্লাসরুমে আকাল থাকলেও স্কুল বা কলেজ সংলগ্ন কোচিং সেন্টারগুলি ঠাঁসা থাকে শিক্ষার্থী।

শিক্ষা এখন আর কেবল জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম বা সেবা নয়, বরং তা একটি লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার গুণগতমানের চেয়ে মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাণিজ্যিকীকরণের ফলে শিক্ষা ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শিক্ষা বাণিজ্যের প্রধান দিকগুলো হলো:
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য: বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চ টিউশন ফি ও নানা ফি-এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থা। বেশি মুনাফার আশায় অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মান উন্নয়নের চেয়ে অবকাঠামোগত জাঁকজমক প্রদর্শনে বেশি মনোযোগী। উচ্চমূল্যের শিক্ষা শুধুমাত্র ধনী পরিবারের সন্তানদের জন্য সহজলভ্য হচ্ছে। ফলে মেধার চেয়ে অর্থের জোরে শিক্ষা অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে। সামগ্রিকভাবে, শিক্ষা বাণিজ্যে পরিণত হওয়ায় তা একটি মৌলিক অধিকার থেকে পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা সমাজ ও জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি সিট নিজের দখলে নেওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীর মাঝে চলে ভর্তি যুদ্ধ। প্রতি বছর প্রায় আড়াই লক্ষ্যের বেশি শিক্ষার্থী এই ভর্তি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই সময়টিতে চলে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের রমরমা বাণিজ্য। যেখানে ভর্তি হতে হলে একজন শিক্ষার্থী গুনতে হয় মোটা অংকের অর্থ, যা একজন উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানের জন্য খুব বেশি মনে না হলেও, মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত সীমিত আয়ের পরিবারের কাছে অনেক বেশি। আবার কোচিংয়ে ভর্তি হয়েও অনেকে তাদের পছন্দসই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় না। এর ব্যর্থতার দায় শুধুমাত্র ওই শিক্ষার্থীর নয়। কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাস শেষ করানো হয় এমনভাবে, তা দিয়ে কেন একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতি নিতে পারে না। কেন তাকে কোচিংয়ে ভর্তি হতেই হবে? তাই বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, স্কুল-কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা উন্নত করে কোচিং ব্যবসার লাগাম টানার জন্য।

লেখক: গ্রন্থকার, গবেষক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews