ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহিমান্বিত ইবাদত। এই ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কোরবানির পশু নির্বাচন। অনেকেই বাজারে গিয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্য বা কম দামের দিকে নজর দিলেও ইসলামি শরিয়তে কোরবানির পশুর কিছু নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। সেই শর্ত পূরণ না হলে কোরবানি সহিহ হয় না, এমনকি আল্লাহর কাছে কবুলও নাও হতে পারে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী কোরবানির পশু অবশ্যই সুস্থ, ত্রুটিমুক্ত এবং নির্দিষ্ট বয়সের হতে হবে। হাদিস ও ফিকহের কিতাবে এমন কিছু ত্রুটির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, যেগুলো থাকলে সেই পশু কোরবানি করা জায়েজ নয়।
যে ধরনের পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়
অন্ধ বা প্রায় অন্ধ পশু
যে পশুর একটি চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে বা এতটাই দুর্বল যে স্পষ্টভাবে দেখা যায় না, সেই পশু কোরবানির জন্য উপযুক্ত নয়। হাদিসে স্পষ্টভাবে অন্ধ পশুকে নিষিদ্ধ বলা হয়েছে।
মারাত্মক অসুস্থ পশু
যে পশুর শরীরে স্পষ্ট রোগ দেখা যায়, জ্বর, দুর্বলতা বা সংক্রামক রোগ রয়েছে—এমন পশু কোরবানি করা জায়েজ নয়। কারণ কোরবানির উদ্দেশ্য আল্লাহর রাস্তায় উত্তম জিনিস উৎসর্গ করা।
খোঁড়া বা চলাফেরায় অক্ষম পশু
যদি পশুটি এমনভাবে খোঁড়া হয় যে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না বা পাল থেকে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে সেটি কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য হবে না।
অত্যন্ত দুর্বল ও হাড্ডিসার পশু
এতটাই দুর্বল যে শরীরে মাংস নেই বা দাঁড়াতে কষ্ট হয়—এমন পশুও কোরবানির জন্য অনুপযুক্ত। ইসলাম সৌন্দর্য ও সুস্থতার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে।
কান বা লেজের বড় অংশ কাটা
যদি পশুর কান বা লেজের এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি অংশ কাটা থাকে, তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে সেই পশু দিয়ে কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
দাঁত ভেঙে যাওয়া পশু
যে পশুর অধিকাংশ দাঁত পড়ে গেছে এবং খাবার খেতে কষ্ট হয়, সেটিও কোরবানির জন্য জায়েজ নয়। কারণ এটি পশুর স্বাভাবিক সক্ষমতার ঘাটতি নির্দেশ করে।
জন্মগত বিকলাঙ্গ পশু
জন্ম থেকেই পা বিকৃত, চোখ নষ্ট বা গুরুতর শারীরিক ত্রুটি রয়েছে—এমন পশু কোরবানির জন্য পরিহার করতে বলা হয়েছে।
কোরবানির পশুর বয়স নিয়েও রয়েছে বিধান
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী—
গরু ও মহিষের বয়স কমপক্ষে ২ বছর হতে হবে
ছাগল ও ভেড়ার বয়স কমপক্ষে ১ বছর হতে হবে
উটের বয়স কমপক্ষে ৫ বছর হতে হবে
তবে কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবান ও বড় আকারের ছয় মাস বয়সী ভেড়ার অনুমতি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতামত রয়েছে।
শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, দেখতে হবে হালাল উপার্জনের দিকও
ইসলামি স্কলারদের মতে, কোরবানির পশু যেমন হালাল ও বৈধ হতে হবে, তেমনি সেটি কেনার অর্থও হতে হবে হালাল উপার্জনের। হারাম উপার্জনের অর্থ দিয়ে কোরবানি করলে ইবাদতের মূল চেতনাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বাজারে পশু কেনার সময় যেসব বিষয়ে খেয়াল রাখবেন
কোরবানির পশু কেনার আগে কিছু বিষয় যাচাই করা জরুরি—
পশুটি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে কি না
চোখ পরিষ্কার ও সচল কি না
শরীরে ক্ষত, ফোড়া বা চর্মরোগ আছে কি না
খাবার খেতে সমস্যা হচ্ছে কি না
অতিরিক্ত দুর্বল বা অসুস্থ কি না
দাঁত ও বয়স ঠিক আছে কি না
বর্তমানে অনেক হাটে অসুস্থ বা ওষুধ দিয়ে মোটাতাজা করা পশুও বিক্রি হয়। তাই সচেতনভাবে পশু নির্বাচন করা ধর্মীয় ও স্বাস্থ্যগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
কোরবানির মূল শিক্ষা ত্যাগ ও তাকওয়া
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” অর্থাৎ কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তরিকতা ও আল্লাহভীতি। তাই শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়, শরিয়তসম্মতভাবে সহিহ কোরবানি আদায় করাই একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
ঈদুল আজহার আগে সঠিক জ্ঞান অর্জন ও সচেতনতা বাড়লে যেমন ইবাদত শুদ্ধ হবে, তেমনি প্রতারণা থেকেও রক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।