বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি। সরকার গঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক অধ্যায় সামনে এগিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী বিতর্ক পুরোপুরি স্তিমিত হয়নি। ভোটগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে মতভেদ যেমন রয়েছে, তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন উঠেছে ভোট গণনা ও ফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি পরিচিত বাক্য আবারো আলোচনায় এসেছে, ‘দিনে নির্বাচন, রাতে গণনায় কারচুপি’, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’। এ বাক্য সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত, এটি নিঃসন্দেহে আস্থাহীনতার প্রতিফলন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ আস্থাহীনতা কি কমানো যেত? ভোট গণনায় প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার কি নির্বাচন আরো স্বচ্ছ, দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য করতে পারত?
প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার; প্রযুক্তি কখনো রাজনৈতিক সততা বা প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির বিকল্প নয়। যদি প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল হয় বা রাজনৈতিক সংস্কৃতি পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তা হলে শুধুমাত্র যন্ত্র বসিয়ে গণতন্ত্র নিখুঁত করা যায় না। কিন্তু তাই বলে প্রযুক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা অগ্রাহ্য করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশগুলোর একটি হলো ভোট গণনা। এখানে সন্দেহের জন্ম হয়, এখানে আস্থার পরীক্ষা হয়।
যদি প্রতিটি কেন্দ্রে অন দ্য স্পট ব্যালট স্ক্যানিং ব্যবস্থা থাকত এবং ভোট প্রদানের সাথে সাথে ব্যালট ডিজিটালভাবে রেকর্ড হতো, তা হলে অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটতে পারত। প্রথমত, গণনায় মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে যেত। দ্বিতীয়ত, কাগুজে ও ডিজিটাল— দুই ধরনের সমান্তরাল রেকর্ড তৈরি হতো, যা ভবিষ্যতে অডিটযোগ্য। তৃতীয়ত, ভোটগ্রহণ ও ফল ঘোষণার মধ্যকার দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান কমে যেত, ফলে ‘রাতের গণনা’ নিয়ে অভিযোগ বা সন্দেহের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হতো।
বাস্তবে অনেক সময় কারচুপি না হলেও, প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা সন্দেহ তৈরি করে। যখন ব্যালট বাক্স বন্ধ কক্ষে নিয়ে দীর্ঘ সময় গণনা করা হয় এবং পরে ফল ঘোষণা করা হয়, তখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে প্রশ্ন উঠবেই। প্রযুক্তিনির্ভর তাৎক্ষণিক গণনা সেই সন্দেহের জায়গা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পারত।
অবশ্য প্রযুক্তি নিজেও তদারকি ছাড়া নিরাপদ নয়। স্ক্যানিং ব্যবস্থা চালু করতে হলে বহুদলীয় পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন প্রযুক্তিগত অডিট, উন্মুক্ত যাচাইব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে ম্যানুয়াল পুনর্গণনার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিও নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই মূল বিষয়।
বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে ভোট গণনায় প্রযুক্তির ব্যবহার সুপ্রতিষ্ঠিত। কানাডার অন্টারিও প্রদেশে নির্বাচন কমিশন-ইলেকশন্স অনটারিও অপটিক্যাল স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যালট দ্রুত ও নির্ভুলভাবে গণনা করে, যেখানে কাগুজে ব্যালট সংরক্ষিত থাকে ভবিষ্যৎ যাচাইয়ের জন্য। আমেরিকার বহু অঙ্গরাজ্যে অপটিক্যাল স্ক্যানিং সিস্টেম ব্যবহৃত হয় এবং এসব প্রযুক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ডোমিনিওন ভোটিং সিস্টেমস, ইএসঅ্যান্ডএস (ইলেকশন সিস্টেমস অ্যান্ড সফটওয়ার) এবং হার্ট ইন্টারসিভিক। এসব ব্যবস্থায় কাগুজে ব্যালট স্ক্যানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফল তৈরি হয়, পাশাপাশি অডিটের জন্য ব্যালট সংরক্ষণ করা হয়। অর্থাৎ প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিজ্ঞতা ও পরীক্ষিত প্রস্তুতকারক— দু’টিই বিশ্বে বিদ্যমান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন কোনো ব্যবস্থা বিবেচনা করতে হলে অবশ্যই স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্র, স্বাধীন প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন এবং বহুদলীয় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নয়, ভবিষ্যতে সিটি করপোরেশন, মেয়র, পৌরসভা ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ধাপে ধাপে প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ভোট গণনা পদ্ধতি চালুর বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে।
গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ভোট দেয়ায় নয়; সেই ভোটের ফলের প্রতি জনগণের নিঃশর্ত আস্থায়। নির্বাচন সঠিক হওয়া যেমন জরুরি, তেমনি সেটি সঠিকভাবে হয়েছে— এ বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার সেই আস্থা পুনর্গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত সন্দেহ, গুঞ্জন ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক অনেকাংশে দূরীভূত করতে সক্ষম হতে পারে।
আস্থাহীন গণতন্ত্র ভঙ্গুর। আস্থাভিত্তিক গণতন্ত্র টেকসই। সেই আস্থা শক্ত পাটাতনে দাঁড় করাতে আধুনিক প্রযুক্তি হতে পারে একটি বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় সহায়ক শক্তি।
পরিশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, শুধু ‘পাতানো নির্বাচন’ বললেই কি দায় শেষ? অভিযোগ তোলা সহজ; কিন্তু কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ দেখানো বেশি দায়িত্বশীল কাজ। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ বলা যায়, কিন্তু কীভাবে নির্বাচন প্রকৌশল রোধ করা যায়, সেই সুস্পষ্ট প্রস্তাবও দিতে হয়।
এ প্রসঙ্গে ‘পাতানো নির্বাচন’ বললেই কি দায় শেষ— এই শিরোনামে নয়া দিগন্ত পত্রিকার মতামত কলামে এ লেখকের একটি নিবন্ধে নির্বাচন প্রকৌশল বন্ধে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা, বহুদলীয় তদারকি এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু অভিযোগ নয়, সমাধানের দিকেও এগোতে হবে। প্রযুক্তি সেই সমাধানের একটি অংশ হতে পারে যদি আমরা তা সৎ উদ্দেশ্য, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং সর্বজনীন আস্থার ভিত্তিতে প্রয়োগ করতে পারি।
লেখক : কানাডা প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক