‘টিউবওয়েলে যখন পানি আসে না, তখন পানি তোলার জন্য বাইরে থেকে পানি এনে ঢালতে হয়। আমরাও দেশের অর্থনীতি চাঙা করতে বাজেটের পরিমাণ বড় রাখার চেষ্টা করেছি। কোথাও না কোথাও থেকে টাকা এনে অর্থনীতিতে ঢালতে পারলে দেখবেন আমাদের অর্থনীতিও স্মুথলি রান করবে।’ বলছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেটের সুপারিশমালা’ তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার সময় জাতীয় বাজেট নিয়ে দীর্ঘ কথা বলার সুযোগ হয়। তিনি খুব আগ্রহভরে কৃষি অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করেন। জানতে চান মাঠের কথা, কৃষকের কথা।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষি। যুগের পর যুগ ধরে দেশের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষি খাত অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট এমন একটি সন্ধিক্ষণে প্রণীত হয়েছে, যখন বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে। এই উত্তরণকালীন অর্থনীতিতে কৃষি খাতের আধুনিকীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে। জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ, সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার, বাস্তবায়িত উদ্যোগ এবং ভবিষ্যতের অবশ্যম্ভাবী করণীয়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেশের সামগ্রিক খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী, কৃষিকে কেবল জীবন ধারণের উপায় হিসেবে না দেখে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার গ্যারান্টি প্রদান করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ এবং ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কৃষির প্রতি যে সরকার গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগ রেখেছে, তা প্রমাণ করে।
পাশাপাশি, কৃষিতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ফলন বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে। যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা এবং তরুণ প্রজন্মকে কৃষিতে আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও আধুনিক সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির কথাও ইশতেহারে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। এই অঙ্গীকারগুলোর মূল সুর হলো, একটি টেকসই এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা যেকোনো বৈশ্বিক বা প্রাকৃতিক সংকটে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হবে।
কৃষি খাতকে একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ুসহিষ্ণু ও প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এই লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য বাজেটে মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আমাদের জিডিপির দশমিক ছয় তিন শতাংশ ।
কৃষি খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩ থেকে চালু করা হয় ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি। আগামী অর্থবছরে প্রাথমিকভাবে কৃষক কার্ড বাবদ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়। প্রান্তিক চাষি ও দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বস্তি দিতে শুল্ক কাঠামোতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে সরকার। রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করা ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় কৃষকের মাঝে বিতরণ করা হবে। এবং খাদ্যগুদামের ধারণক্ষমতা ২৪.৫০ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্লু-ইকোনমি অর্থাৎ সুনীল অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ‘জাল যার জলা তার’ নীতির ভিত্তিতে জলমহালগুলো স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করে জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে ১৫ লাখ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আনা হবে।
তবে সার্বিক কৃষি খাতের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একসময় জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি কৃষিতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও বর্তমানে তা ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
বর্তমান কৃষিব্যবস্থা বহুমুখী সংকটের সম্মুখীন। আকস্মিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি জ্বালানি, সার, বীজ ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির কারণে কৃষক চিন্তিত। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯.৪২ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির কারণে বাজেটে যে সামান্য বরাদ্দ বাড়ছে, তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আসলে কমে যাচ্ছে। সরকারি বিনিয়োগের গতি কমে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা খাদ্য আমদানিনির্ভরতা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তবে আশার কথা হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে দেশীয় উৎপাদকদের জন্য কীটনাশক ও বালাইনাশক উৎপাদনে ৩৬টি কাঁচামাল আমদানিতে মূসক পুরো উঠিয়ে শূন্য করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জিংক সালফেট সার উৎপাদনে জিংক অ্যাশ আমদানিতে শূন্য শুল্ক করা হয়েছে। গবাদিপশুর জন্য ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের বদলে জেনেরিক পণ্য আমদানিতে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক ১ ও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করবে। আমদানিকৃত পাঙাশ মাছের ফিলেটে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হয়েছে। পোলট্র্রি ও ডেইরিশিল্পের খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের তালিকায় আরও ৩টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত করে শূন্য শতাংশ হারে রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। পোলট্র্রি ও ডেইরিশিল্পের যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে উপকরণ আমদানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কৃষিতে ব্যয় কমাতে সার ব্যবসায়ীদের সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কীটনাশক আমদানিতে সাড়ে ৭ শতাংশ আগাম করও প্রত্যাহার করা হলো। দেশীয় তেলবীজ থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদকদের ৫ বছর কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। উচ্চমূল্যের হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক বসানো হয়েছে। আমদানি হয়ে আসা গাছ বা গাছের অংশ কিংবা সুগন্ধ গাছের নির্যাস আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূসক বসানো হয়েছে।
সরকারের নানামুখী উদ্যোগ এবং বাজেটে বরাদ্দ সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি খাত বেশ কিছু কাঠামোগত এবং প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ভবিষ্যতের কৃষিকে টেকসই করতে এবং কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নে কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব (লবণাক্ততা, খরা, জলমগ্নতা ইত্যাদি) মোকাবিলায় নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন এবং এর গবেষণায় বাজেট ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলায় কোল্ড স্টোরেজ, পরিবহনসুবিধা, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং কৃষক সমবায়ভিত্তিক আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। ফসলের অপচয় রোধ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্য সংযোজনের জন্য অ্যাগ্রো-প্রসেসিং জোন স্থাপন করা প্রয়োজন। এজন্য বাজেটে কর অবকাশ ও সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা দিতে হবে। বন্যা বা সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতি থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সহজলভ্য শস্যবিমা বা কৃষিবিমার কার্যকর বাস্তবায়ন সময়ের দাবি।
সবশেষে কৃষিতে তরুণ ও শিক্ষিত সমাজের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রথাগত কৃষিকে যখন আইওটি, সেন্সর, ড্রোন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা যাবে, তখনই শিক্ষিত তরুণরা এই খাতে উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসবে। ‘স্মার্ট কৃষি’ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত শিক্ষার প্রসার এবং কৃষিতে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরি করা।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি খাত নিয়ে সরকারের যে রূপরেখা প্রতিফলিত হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারগুলোর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে বাজেটের অর্থের সঠিক ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহারের ওপর।
♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব