• দুদক আইন সংশোধনে সুপারিশ আমলে নেয়া হয়নি
  • স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ৪৭টি সুপারিশ করা হয়েছিল

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠিত হয় দুদক সংস্কার কমিশন। রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ দেয়। কিন্তু সে সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই আমলে নেয়া হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশে স্থান পায়নি।

এ দিকে দুদকের আব্দুল মোমেন কমিশন পদত্যাগ করার তিন মাস পরে নতুন কমিশন গঠনের জন্য সম্প্রতি সার্চ কমিটি গঠন করেছে সরকার। কিন্তু এই সার্চ কমিটিও গঠন হয়েছে আগের নিয়মেই; অর্থাৎ রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছিল, তা আমলে না নিয়ে আগের নিয়মেই দুদক পরিচালিত হতে যাচ্ছে। ফলে দুদক আদৌ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, এবং দুদক সংস্কার নিয়ে সরকার কি ভাবছে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদ পূরণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ দুই কমিশনার। এর পর থেকে নেতৃত্বশূন্য স্বাধীন সংস্থাটি। এতে থমকে গেছে ভিভিআইপি ও ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ৪৭টি সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত দুদক সংস্কার কমিশন। সেই সরকারের জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকার দুদক আইন সংশোধনে নতুন যে খসড়া করেছে, সেখানে সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো আমলে নেয়া হয়নি।

এর প্রেক্ষিতে দুদকের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্কার কমিশনের যে সুপারিশগুলোতে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, আইনের খসড়ায় সেসব বিষয় বিবেচনায় না নেয়াকে হতাশাজনক মনে করছেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান।

গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দুদক সংস্কার কমিশন গঠন করে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করা, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ ব্যবস্থাসহ ৪৭টি সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের অন্যতম সুপারিশের মধ্যে ছিল- দুদকের বিতর্কিত চাকরিবিধির ধারা বাতিল [বিধিমালার ৫৪(২)], কমিশনের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা, পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজস্ব জনবল নিয়োগ, প্রতি জেলায় দুদকের কার্যালয় চালু এবং বিদ্যমান বাছাই কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ইন্টিগ্রিটি ইউনিট চালু, বাজেট অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা কমানো, অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ করা, কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং দুদকের কার্যক্রমে জন-আস্থা ফেরানোর বিষয়েও কমিশন গুরুত্ব দেয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংস্কার কমিশনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ সেখানে বাদ পড়েছে বা দুর্বলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

সংস্কার কমিশন দুদক কমিশনের সদস্য তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করার প্রস্তাব করেছিল। একই সাথে কমিশনে আবশ্যিকভাবে নারী সদস্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া কমিশন দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

সংস্কার কমিশন দুদকের কমিশনার পদে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশা কিংবা সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে, এমন ব্যক্তিদের নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা নেই।

দুদক আইনে কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত দুই দশকে তা হয়নি। সংস্কার কমিশন প্রাথমিকভাবে ১০-২০ শতাংশ হারে নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব প্রসিকিউশন গঠনের সুপারিশ করে ধাপে ধাপে প্রতি বছর ১০ শতাংশ নিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছিল। কিন্তু সংশোধিত খসড়ায় নিজস্ব প্রসিকিউশন গঠনে কোনো প্রস্তাব নেই।

দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) বিধিতে বলা আছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই দুদকের কোনো কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ দিয়ে অথবা ৯০ দিনের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে। সংস্কার কমিশন এই বিধি বাতিলের সুপারিশ করলেও খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা নেই।

নতুন খসড়ায় সংস্কার কমিশনের একটি পরামর্শের সাথে মিল রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৩২ক ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ধারায় জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে দুদককে আবশ্যিকভাবে আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিএফআইইউ, নিবন্ধন অধিদফতর থেকে দুদককে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়ার সুপারিশ করেছিল সংস্কার কমিশন। তবে সংশোধিত আইনের খসড়ায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশে দুদককে তথ্য সরবরাহ ও সহযোগিতা করার বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০০৪ সালের দুদক আইনে কমিশন গঠনের জন্য ‘সার্চ কমিটি’ করার বিধান আছে। আইন সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের বিধান করা হয়। এ কমিটিতে অন্য সদস্যদের সাথে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন করে প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছিল। নতুন খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমাতে সংস্কার কমিশন উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় দুদকের সচিব নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। একই সাথে যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার ছুটি নিয়ে দুদকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ রাখার সুপারিশ করেছিল কমিশন।

কিন্তু খসড়ায় এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়নি। নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে দুদক সচিবের ক্ষমতা আরো বাড়ানোর প্রস্তাব করে একটি উপধারা যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো কারণে কমিশনে শূন্যতা দেখা দিলে বিশেষ প্রয়োজনে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে কমিশন সচিব মহাপরিচালকদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

তবে সচিবের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবকে আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন দুদকের কর্মকর্তারা। নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রস্তাবে কমিশনকে দীর্ঘদিন শূন্য রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং দুদক সচিবকে কমিশনের সব কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। এটি হলে স্বাধীন, স্বশাসিত ও নিরপেক্ষ কমিশন হিসেবে দুদকের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে।

এ বিষয়ে দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনের খসড়ায় দুদকের কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মী পর্যায়ে গতি আনতে সহায়ক কিছু ইতিবাচক বিষয় রয়েছে, যা বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কমিশনহীন অবস্থায় এখন যারা দুদকের নেতৃত্বে আছেন, তাদের কাছে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত, বাস্তবে স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কমিশন নিয়ে সুপারিশ আশা করার কোনো যুক্তি নেই; বরং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধিকতর আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দৃশ্যমান। এ জন্যই কমিশনহীন বর্তমান অবস্থার সুযোগে সচিবের হাতে কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতা অর্পণের সুপারিশ করা হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পুরো কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে এখন এককভাবে সচিবের হাতে অর্পণের সুপারিশ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রস্তাব গৃহীত হলে শুধু কমিশনহীন অবস্থায় নয়, বরং কমিশন থাকাকালীন আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের অধিকতর ক্ষমতায়ন হবে এবং কমিশনের ক্ষমতা আরো খর্ব হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews