যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনার নির্ধারিত ৬০ দিনের মেয়াদ কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে।
এ প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের মারাত্মক অভিযোগ তুলে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার আলোচিত আলটিমেটামের বিষয়টি এখন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। গত ১৭ জুনের দ্বিপক্ষীয় স্মারক স্বাক্ষরের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় আমেরিকা চুক্তি ভঙ্গ করায় কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছে দেশটি। গতকাল অনুষ্ঠিত নিয়মিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এসব তথ্য জানান।
বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন, “স্মারকপত্রে ‘৬০ দিনের কোনো সময়সীমা’ বা আলটিমেটামের বাধ্যবাধকতা ছিল না। ইরান কখনো কোনো ধরনের চাপ, আলটিমেটাম কিংবা সময়সীমার মুখে নিজের নীতি নির্ধারণ করে না।” তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, চুক্তি অনুযায়ী মূলত দুটি বিষয়Ñ‘নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার’ এবং ‘পারমাণবিক নীতি’Ñনিয়ে আলোচনার জন্য একটি ৬০ দিনের মেয়াদী কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা প্রয়োজনবোধে উভয় পক্ষের সম্মতিতে বাড়ানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র শুরুতেই চুক্তি লঙ্ঘন করায় কোনো আলোচনাই এগোয়নি, ফলে ওই সময়সীমার কোনো ভিত্তিই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সংবাদ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালী, পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরে ইরানের ‘সার্বভৌম অধিকার’ বজায় রাখার বিষয়ে দেশটির দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন ইসমাইল বাঘাই। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিতে ইরানি পার্লামেন্টের চলমান আইনি পদক্ষেপের প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দেশের সংবিধান অনুযায়ী পার্লামেন্টের অবস্থান পরিষ্কার। বিদ্যমান আইন এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় পার্লামেন্টকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও বিশেষজ্ঞদের মতামত দেওয়া অব্যাহত রাখবে।’
এবার ওমানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের : এবার ওমানকে কঠোর সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে ওমান কোনো ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়ালে দেশটির ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। গতকাল ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক ট্রেই ইংস্টকে ট্রাম্প অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, ‘যদি ওমান আমাদের পথের বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে আমরা বোমা মেরে তাদের ছাতু বানিয়ে ছাড়ব।’ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ হিসেবে পরিচিত ওমানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের এ ধরনের প্রচ্ছন্ন হুমকি এবারই প্রথম নয়। এর আগে গত মে মাসে এক ক্যাবিনেট বৈঠকেও ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘ওমানকে সাধারণ সবার মতোই আচরণ করতে হবে, তা না হলে আমাদের তাদের উড়িয়ে দিতে হবে।’ একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে, তার প্রশাসন ইরানের শক্তিশালী ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে একটি সরাসরি গোপন যোগাযোগ মাধ্যম চালু করেছে। তবে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে তিনি কোনো তাড়াহুড়ো করছেন না বলে মন্তব্য করেন। ইরানকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘তারা বেশ দক্ষ পোকার খেলোয়াড়, কিন্তু তারা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমার কোনো নির্ধারিত সময়সূচি নেই এবং আমি কোনো তাড়াহুড়োর মধ্যেও নেই।’
নাবিকদের দুর্দশার কথা স্বীকার করলেন শীর্ষ মার্কিন এডমিরাল : মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ৯ মাসেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন থাকা মার্কিন বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের করুণ পরিস্থিতি নিয়ে অবশেষে মুখ খুলেছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তা এডমিরাল ব্র্যাড কুপার। জাহাজে নাবিকদের জীবনযাত্রার কঠিন মান ও মানসিক চাপের কথা স্বীকার করার পাশাপাশি তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন তিনি। রোবববার জাহাজটি পরিদর্শনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে এডমিরাল ব্র্যাড কুপার বলেন, ‘দীর্ঘ সময় সাগরে সেবা দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়।’ তবে মার্কিন নৌবাহিনীর ১১টি সক্রিয় যুদ্ধজাহাজের মধ্যে আব্রাহাম লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কেস তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম বলে দাবি করেন তিনি। প্রায় ৫,০০০ নাবিক নিয়ে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের সমর্থনে নিয়োজিত রয়েছে সান ডিয়েগো-ভিত্তিক এই বিশাল বিমানবাহী জাহাজটি। দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে অবস্থান করায় জাহাজে পানির সংকট, প্লামিং সমস্যা ও পানির দুষণসহ নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবক্ষয়ের খবর উঠে এসেছে। যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক আইন প্রণেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এডমিরাল কুপার স্বীকার করে বলেন, ‘এর মানে এই নয় যে সবকিছু নিখুঁত চলছে। সাগরে দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েন অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও কঠিন। আমাদের প্রত্যেকেই একেকভাবে মানসিক চাপ মোকাবিলা করে।’
হরমুজ নিয়ে আলোচনা চলছে : হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নৌপথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। তবে এ আলোচনা প্রণালিটি পুনরায় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনিচ বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনাটি মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন নৌপথ নির্ধারণের কারিগরি বিষয় নিয়ে। আগের নৌপথগুলো বর্তমানে কার্যকর না থাকায় একটি অস্থায়ী নৌপথ নির্ধারণের কাজ চলছে, যা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী করা হতে পারে। তিনি বলেন, ওমানের সঙ্গে এ বিষয়ে দ্রুত একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নতুন নৌপথ নির্ধারণ করা হলেও এর অর্থ এই নয় যে হরমুজ প্রণালি সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা এবং এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলেই প্রণালিটি পুনরায় খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রত্যেক মার্কিন সেনার জন্য ৩০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা : মার্কিন সেনাকে হত্যা বা আটক করে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারলে ৫০০ কোটি তুমান বা প্রায় ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল আমির হাতামি। রোববার (১৬ আগস্ট) জাতীয় সাংবাদিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে। হাতামি বলেন, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত একটি উদ্যোগের আওতায় এ পুরস্কার দেওয়া হবে। তার ঘোষণার অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি ‘আগ্রাসী মার্কিন সেনাসদস্যকে’ হত্যা বা আটক করে ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করতে পারলে তাকে ৫০০ কোটি তুমান পুরস্কার দেওয়া হবে।
২০০টিরও বেশি শত্রু বিমান ভূপাতিত করার দাবি আইআরজিসি’র : চলতি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি ‘শত্রু বিমান’ ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। আইআরজিসি-র ডেপুটি কমান্ডার-ইন-চিফ মেজর জেনারেল মোস্তফা ইজাদি সম্প্রতি এক বক্তব্যে এই বড় ধরনের দাবি উত্থাপন করেন। তিনি জানান, ইরানি জাতির প্রতিরোধ ও সামরিক বাহিনীর সফল মনস্তাত্ত্বিক ও সফট-ওয়ারফেয়ার পদক্ষেপের ফলেই এই বিশাল সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমাদের জাতির এই মূল্যবান পদক্ষেপ এবং সাইকোলজিক্যাল অপারেশনের ফলে শত্রু বাহিনীর ভূপাতিত বিমানের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে গেছে। এই প্রতিরোধ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।’
হরমুজ দিয়ে গোপনে তেল পরিবহন করছে একাধিক দেশ : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে গোপনে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কুয়েতের তেলবাহী ট্যাংকারগুলো গত কয়েক মাস ধরে তাদের লোকেশন ট্র্যাকিং সিস্টেম বা ‹ট্রান্সপন্ডার› বন্ধ রেখে অত্যন্ত গোপনে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করছে। এই গোপনীয়তার কারণে বর্তমানে ঠিক কী পরিমাণ তেল পরিবহন করা হচ্ছে তা নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা কঠিন। তবে বাজার গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হলেও বাস্তব সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। সূত্র : আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, গালফ, মেহের নিউজ।