কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে ডুবে পচে নষ্ট হওয়ার উপক্রম ফসলের মাঠ, ধানের খলা ও ফসল শুকানোর জন্য ব্যবহৃত মাঠজুড়ে ফসলহানির বিষাদের গল্পের মলাটে অবশেষে দুদিনের টানা রোদের ঝিলিক দেখা দিয়েছে। আর এ সুযোগে শ্রম-ঘাম আর বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্জিত অবশিষ্ট স্বপ্নের সোনালি ফসল রক্ষায় শেষমেশ প্রাণপণ সংগ্রামে জড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন কিষান-কিষানিরা।

কেউ নেমে পড়েছেন পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হতে চলা ফসল উদ্ধারে, কেউ ছুটছেন খলায় স্তূপ করে রাখা চারা গজাতে থাকা ধানের ভালো অংশ উদ্ধারে, আর কেউ বা ছুটছেন উদ্ধারকৃত ফসল রোদে শুকিয়ে চাল করে খাদ্য উপযোগী করে তোলার সংগ্রামে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে কিশোরগঞ্জের অন্যতম হাওড় উপজেলা ইটনার ঢাকী ইউনিয়নের শান্তিপুরের সামনের এবং ইটনা উপজেলা সদর ইউনিয়নের নূরপুরের সামনের বিস্তীর্ণ বোরো ফসলের মাঠ ও খলা পরিদর্শনে কিষান-কিষানিদের এমন জীবনসংগ্রাম চোখে পড়ে।

ইটনা উপজেলার সদর ইউনিয়নের দীঘির পাড় গ্রামের কৃষক দাউদ সালেক মিয়া জানান, এবার ৮ একর জমিতে বোরো ফসল চাষ করেন তিনি। এর মধ্যে মাত্র ৩ থেকে সাড় ৩ একর জমির ফসল কেটে ঘরে তুলতে পারেন। বাকি সাড়ে ৪ একর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। জমির স্বপ্নের ফসল ডুবে বিনষ্ট হওয়ায় তার পরিবারে চলছে আহাজারি-হাহাকার। তিনি আরও জানান, এ বোরো ফসল করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। কিন্তু এবার মহাজনি ঋণ এবং ব্যাংক ঋণ শোধের কোনো সুযোগই থাকল না। একসময় অকাল বন্যায় ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেলে ‘তে ভাগাতে’ এলাকার নিম্ন আয়ের লোকজন কিংবা শ্রমিকদের এসব ডুবন্ত ফসল কেটে তুলে এক ভাগ তাদের দিয়ে দুই ভাগ নিজেরা পেতাম। এছাড়া ভয়াবহ ফসলডুবির সময় এ সুযোগও না থাকলে ওই নিম্ন আয়ের এবং শ্রমিক শ্রেণির লোকদের ‘নয়ন ভাগায়’ পুরো ডুবন্ত ফসল কেটে নিয়ে যেতে বলা হতো আর আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতাম। কিন্তু এবার ‘তে ভাগা’ তো দূরের কথা, ‘নয়ন ভাগা’তেও আগ্রহ নেই ওই শ্রমজীবীদের। কেননা বর্তমানে কাঁচা ধান ৪শ টাকা মনও বিক্রি করা যাচ্ছে না। যে সময়ে যে পরিমাণ ফসল তারা তুলবে-এ সময় অন্য কাজে তিন-চারগুণ বেশি টাকা উপার্জন করতে পারবে। তবে দুদিন ধরে রোদ ওঠায় আমরা খলায় স্তূপী করে রাখা চারা গজানো ধান থেকে ভালো ধানগুলো বেছে রোদে শুকাচ্ছি। এমনকি বাধ্য হয়ে পানিতে ডুবে বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম ফসলের কিছু অংশও কষ্ট করে সংগ্রহ করে অন্তত বছরের খাবারের মতো ধান সংগ্রহের সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছি।

ইটনা উপজেলা সদরের নূরপুরের কৃষি শ্রমিক কালা মিয়া বলেন, আমরা এখন ১ হাজার টাকা দিনমজুরিতে কাজ করি। পানির নিচে তলিয়ে থাকা ধান কেটে যে টাকা পাব তাতে আমরার চলত না। অহন রইদ উডায় ক্ষেতের মালিকরাই যে যদ্দূর ফারছে, পানির নিচে থাইকা ফসল কাইটা আনছেন।

এ সময় এ দুই কৃষক পরিবারের প্রধান আরও বলেন, সরকার কৃষক রক্ষায় যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে-সেসব কর্মসূচি দিয়ে কৃষক ও কৃষিকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। এজন্য কৃষকদের আপৎকালীন খাদ্যনিরাপত্তা, মহাজনি, ব্যাংক ও এনজিও’র ঋণ মওকুফের পাশাপাশি চাই বন্যা এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান। এ সময় তারা ব্যক্তিগত মুনাফা ও উন্নয়নের নামে বিগত পতিত স্বৈরাচারী সরকারের অপরিকল্পিত-পরিবেশ বিনাশী অলওয়েদার সড়কপথসহ অন্যান্য লোক দেখানো উন্নয়নের দিকে আঙুল তোলেন।

অবাধ পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে কিশোরগঞ্জে ৫০ হাজারেরও বেশি বোরো চাষির ২৫৯ কোটি টাকা মূল্যের সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির ফসলহানি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির অসম্পূর্ণ চলমান প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। তবে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনে এ ক্ষয়ক্ষতির চিত্র আরও বেড়ে যাবে বলেও জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামার বাড়ি) তথ্যমতে, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলসহ জেলার ১৩টি উপজেলায় উঠতি বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলার প্রায় ১৩ হাজার ১২২ হেক্টর জমির ধান পানি নিচে তলিয়ে রয়েছে। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার কৃষক। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৫৯ কোটি টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এমন তথ্যমতে, ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে অন্যতম হাওড় উপজেলা হিসাবে পরিচিত ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় এবং অন্যান্য উপজেলার খাল-বিল ও নিচু এলাকার ফসল। এর মধ্যে ইটনা উপজেলায় ১১ হাজার ৫০টি পরিবারের ৩ হাজার ২৬১ হেক্টর জমি তলিয়ে প্রায় ৭৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। অষ্টগ্রামে ৯ হাজার ১৫০টি পরিবারের ২ হাজার ৭০৩ হেক্টর জমিতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৬২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তাড়াইলে ১ হাজার ২২৪ হেক্টর জমিতে ক্ষতি ২৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, নিকলীতে ৯২৩ হেক্টরে ক্ষতি ২১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং করিমগঞ্জে ৮৩০ হেক্টরে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এছাড়া মিঠামইনে ৬৯০ হেক্টরে ১৫ কোটি ৯৯ লাখ টাকা, কটিয়াদীতে ৫৮৫ হেক্টরে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, সদর উপজেলায় ২৭৫ হেক্টরে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ভৈরবে ২১১ হেক্টরে ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা এবং বাজিতপুরে ১৬২ হেক্টরে ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কুলিয়ারচরে ৬৫ হেক্টরে প্রায় ১৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা এবং হোসেনপুরে ৪৭ হেক্টরে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকার ফসলহানি হয়েছে।

তবে বোরো চাষিদের দাবি, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক জরিপে পূর্ণাঙ্গ ক্ষয়ক্ষতির তথ্য উঠে আসেনি বলেও অভিযোগ রয়েছে তাদের।

কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রণয়নের কাজ এখনো চলমান।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews