• ভ্রাম্যমাণ আদালত কাউন্টারে অভিযান চালিয়ে যাত্রীর টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করছেন
  • লম্বা ছুটি হওয়ায় ঈদযাত্রা স্বস্তির ও নিরাপদ হবে : আশা যাত্রী কল্যাণ সমিতির

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দূরপাল্লার ঘরমুখো যাত্রীদের যাত্রা স্বস্তির ও নিরাপদ করতে ঢাকার বাসটার্মিনালগুলোতে প্রশাসনের তৎপরতা আগের থেকে অনেক বেড়েছে। তবে তাদের কঠোর নজরদারির পরও বাস কাউন্টারে টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা কর্মচারীরা নানা কৌশলে যাত্রীদের কাছ থেকে সরকারনির্ধারিত বাসভাড়ার অতিরিক্ত টাকা প্রকাশ্যে আদায় করতে দেখা গেছে। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ সময় কিছু বাস কাউন্টারে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়ার সত্যতা পান এবং তাৎক্ষণিক ওই টাকা যাত্রীকে ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি কাউন্টারগুলোর কর্মচারীদের সতর্ক করা ছাড়া ভাড়ার তালিকা টাঙানোর নির্দেশনা দেন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোডের বেশ কয়েকটি বাস কাউন্টারে সরেজমিন খোঁজ নিতে গেলে পাওয়া যায় এ চিত্র। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর কোনো কোনো কাউন্টারের কর্মচারীদের বলতে শোনা যায়, ‘প্রশাসনের লোকেরা যত চালাক তার চেয়ে আমরা কিন্তু কম চালাক না। আমি আমার মেশিনে সরকারনির্ধারিত ভাড়া ঠিকই দেখিয়েছি, কিন্তু আগে যে বাড়তি ভাড়া নিয়েছিলাম সেটি তারা দেখার আগেই আমি মেশিন ঘুরিয়ে ফেলেছি। সেটি তারা বুঝতেই পারেনি।’ ভুক্তভোগী যাত্রীরা প্রশাসনের নজরদারি দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলছেন, প্রশাসনের লোকজনের সাথে বাস কাউন্টারের লোকেরা বাসভাড়া বেশি নেয়া নিয়ে চোর-পুলিশের মতো আচরণ করছে। ঈদের সময় প্রশাসন অতিরিক্ত ভাড়া যাত্রীদের কাছ থেকে না নেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তবে এই কাজ করা খুব সহজ হবে না। মঙ্গলবার বেলা দেড়টা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড এলাকা। বাস কাউন্টার থেকে বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীদের ডাকছে। এ সময় নীলাচল এক্সপ্রেস নামক কাউন্টার র‌্যাব-পুলিশ ঘিরে রেখেছে। নীলাচল এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে নোয়াখালী, মাইজদী, সোনাপুর, চেয়রম্যানঘাট-লক্ষ্মীপুর-রামগতি-আলেকজেন্ডার রুটে চলাচল করে থাকে। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে ভ্রাম্যমাণ আদালত এই কাউন্টারে যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায় করার অভিযোগে অভিযান চালান। কাউন্টারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট টিকিট বিক্রির মেশিনটি দেখাতে বলেন। তখন কাউন্টারের ব্যক্তি সেটি দেখান এবং দাবি করেন তিনি সরকারনির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি করছেন। তখন ম্যাজিস্ট্রেট তাকে প্রশ্ন করেন, ভাড়ার মূল্যতালিকা টাঙানোর নিয়ম। সেটি কেন টাঙানো হয়নি? তখন কাউন্টারের ব্যক্তি আভিযানিক দলের প্রধানকে বলেন, তিনি এখনই তালিকা টাঙানোর ব্যবস্থা করছেন। এরপরই পাশের লাল সবুজ পরিবহন ও ইকোনো সার্ভিসের কাউন্টারে চলে যান ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই ফাঁকে নীলাচল কাউন্টারের সামনে এ প্রতিবেদক অপেক্ষমাণ থাকার সময় কাউন্টারের ব্যক্তিটি এক ফাঁকে তার অপর দুই সহকর্মীকে হেসে টিকিট বিক্রির মেশিন দেখিয়ে বলতে থাকেন, তারা আমার মেশিনে যাত্রীর ভাড়া চার্ট দেখতে চেয়েছেন। তাদের দেখিয়েছি, ভাড়া ৫৫০ টাকাই নিয়েছি। আসলে নিয়েছি ৬৫০ টাকা করে। তখন তাকে তার সহকর্মী প্রশ্ন করে তারা দেখেনি? তখন সে বলে, কিন্তু তো তাদের দেখার আগেই মেশিন ঘুরিয়ে ফেলেছি। ভাড়া সেখানে ৬৫০ টাকা করে নেয়ার তথ্য ছিল। এরই মধ্যে এক র‌্যাব সদস্য নীলাচল কাউন্টারের সামনের রাস্তা থেকে এক যুবকের হাত ধরে জানতে চান, লাল সবুজ পরিবহনের লোক কি তুমি? ওই যুবক বলেন, না আমি ইকোনো সার্ভিসের। তখন র‌্যাব সদস্য বলেন, তোমাকেই তো খুঁজছি। এরপর তাকে ধরে ওই কাউন্টারে নেয়া হয়। সেখানে এক যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করার কথা যুবকটি স্বীকার করেন। পরে তার দেয়া তথ্যে বাইরে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ইকোনো বাসে অভিযান শুরু হয়। যাত্রীদের জিজ্ঞাসা করা হয়। তখন সব যাত্রী স্বীকার করেন তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই ৫৫০ টাকার পরিবর্তে ৬৫০ টাকা দামে টিকিটের টাকা নেয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যাত্রীদের কাছ থেকে নেয়া অতিরিক্ত ১০০ টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। যাত্রীরা টাকা ফেরত পেয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর বাসটি গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এরপর ভ্রাম্যমাণ আদালত ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী লন্ডন এক্সপ্রেসসহ একাধিক এসি বাস কাউন্টারে অভিযান চালান। এ সময় এক যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি ভাড়ার টাকা ফেরত দেয়া হয়। দেখা যায়, প্রশাসন শুধু বাড়তি ভাড়ার টাকা যাত্রীদেরকে ফেরত দেয়ার শর্তে আটকদের ছেড়ে দিচ্ছিলেন। এ সময় বাড়তি ভাড়া না নেয়ার জন্য কাউন্টারের লোকদের সতর্ক করে দেন। এ সময় মূল্যতালিকা টাঙানোর নির্দেশ দেয়া হয়।

বাসটার্মিনালে প্রশাসনের অভিযান প্রসঙ্গে একজন যাত্রী নয়া দিগন্তকে বলেন, ওরা জানে প্রশাসনের লোকজন কিছুক্ষণ পরই চলে যাবে। এরপর তারা আবার একই কায়দায় গলাকাটা ভাড়া আদায় করতে পারবে। এ সময় একটি কাউন্টারের একজন কর্মচারীকে বলতে শোনা যায়, একটি টিকিটে মাত্র ৩০ টাকা অতিরিক্ত নিচ্ছি। এর জন্য এত ঝুঁকি নেয়ার দরকার কী। সরকারি যে ভাড়া আছে সেটাই নিবো। ঈদের পরে দেখা যাবে। এখন আর নতুন করে ঝামেলায় জড়াবো না। এসময় পাশে দাঁড়ানো এক ব্যক্তি র‌্যাব পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন, আজকে দুপুরে না এসে বিকেলের পর আসলে তখন তারা অনেক মানুষের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অসংখ্য অভিযোগ পেতেন। কারণ দুপুরের পর গার্মেন্টগুলো ছুটি হবে। এরপর সবাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবে। তখনই ভিড় বাড়বে বাস কাউন্টারগুলোতে। শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চিটাগাং রোড নয় ঢাকার গাবতলী, মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাসটার্মিনালগুলোতেও অন্যান্য দিনের চেয়ে গতকাল র‌্যাব, পুলিশ, বিআরটিএ আর ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

গতকাল বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে অতিরিক্ত বাস ভাড়া আদায় করা প্রসঙ্গে বলেন, এস আলম, সৌদিয়া, শ্যামলীসহ নামীদামি বাস কোম্পানিগুলোই নানা ছুতোয় যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছে। এক্ষেত্রে তারা কৌশল অবলম্বন করছে। যেমন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বাসের যাত্রীদের বলা হচ্ছে চট্টগ্রামের কাপ্তাই পর্যন্ত আমাদের বাস যাবে। তখন যাত্রী নির্দিষ্ট গন্তব্যের কথা বললে তখন তারা বলছে এখানে যাবে না। এমন অজুহাত দেখিয়ে ৬৮০ টাকার ভাড়া ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৭৮০ টাকা নিচ্ছে। সড়ক নৌ রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের যাত্রী হয়রানি বন্ধে টার্মিনাল ভিজিট করা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার মনে হয় তিনি জনগণের জন্য বাস টার্মিনাল ভিজিট করছেন না। তিনি বাস মালিকদের হয়ে সেখানে যাচ্ছেন। যার কারণে ভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য চললেও তিনি সেটি না দেখে বলছেন মালিকরা কোন কোন ক্ষেত্রে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া নিচ্ছে। তিনি যাত্রীদের জন্য মন্ত্রী মহোদয়কে কাজ করার অনুরোধ করেন। ঈদযাত্রায় পথে পথে যাত্রী ভোগান্তি সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এবার ঈদের ছুটি লম্বা হওয়ায় ঈদযাত্রা স্বস্তি ও নিরাপদ হবে বলে আশা করছেন তিনি। টানা সাত দিনের ছুটির গতকাল মঙ্গলবার প্রথম দিনের বিকেল পর্যন্ত ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লেও ভোগান্তির মাত্রা খুব একটা ছিল না বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ছেড়ে যাওয়া এশিয়া এয়ারকন নামের একটিবারের যাত্রী আসাদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ঢাকা থেকে বের হওয়ার পর কোনো জ্যাম নেই। আমার কুমিল্লায় আসতে আড়াই ঘণ্টার মতো সময় লেগেছে। হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, মানুষের ঈদযাত্রাকে নির্বিঘœ করতে আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মহাসড়কের ২৭টি ঝুঁকিপূর্ণ অংশ চিহ্নিত করে তাতে নিরাপত্তা জোরদার করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) জানিয়েছে, গতকাল ১৭ মার্চ থেকে আগামী ২৩ মার্চ সারা দেশে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও লরি চলাচল বন্ধ থাকবে। যানজটসহ যেকোনো প্রয়োজনে ১৬১০৭ হট নম্বরে যোগাযোগ করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করা হয়েছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews