ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হজ। হজের আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা বা সংকল্প করা। আর্থিক ও শারীরিক দিক থেকে সামর্থ্যবান মুসলমানদের জীবনে একবার হজ করা ফরজ। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে তার ওপর আল্লাহর এই ঘরে হজ করা ফরজ, যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে (সুরা আলে ইমরান : আয়াত ৯৭)।’ দেশ, অঞ্চল, ভাষার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামের অনুসারীগণ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আরাফাতের ময়দানে এই মহামিলন মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। প্রতি বছর ৯ জিলহজ আরাফাত দিবসে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক ইন্নাল হামদা ওয়ান নিয়ামাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক’ ধ্বনিতে মুখর হয় আকাশবাতাস। হজ কবুল হওয়ার জন্য হজে অংশগ্রহণ করা প্রাথমিক শর্ত। অথচ এক হতদরিদ্র মুসলমান মুচি হজে অংশগ্রহণ করেননি, অথচ মহান আল্লাহ তাঁর হজ কবুল করেছেন।

ঘটনাটি হলো, আলী ইবনে মোয়াফেক নামে দামেস্কের অধিবাসী এক দরিদ্র মুচি দীর্ঘ ৩০ বছর তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ থেকে সঞ্চয় করেছিলেন হজ করার জন্য। তিনি যখন হজে যাবেন, তার আগের দিন তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘আমি মাংস খাব।’ তিনি বললেন, ‘আমার কাছে বাড়তি টাকা নেই মাংস কেনার মতো। হজের টাকা থেকে যদি মাংস কিনি, তবে আমার হজে যাওয়া হবে না।’ তিনি স্ত্রীর আবদার রাখতে গিয়ে পাশের বাড়িতে গেলেন একটু মাংস আনার জন্য। তিনি তাঁর প্রতিবেশীকে বললেন, ‘আপনার বাড়ি থেকে মাংস রান্নার ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের একটু মাংস দিন। আমি হজে যাব। আমার স্ত্রী মাংস খেতে চাচ্ছে; বাজার থেকে যদি মাংস কিনে আনি, তবে আমার হজে যাওয়ার টাকা কম হয়ে যাবে।’ তখন ওই ব্যক্তি বললেন, ‘ভাই! এ মাংস আমাদের জন্য হালাল, কিন্তু আপনাদের জন্য হারাম। কারণ সাত দিন ধরে আমরা অনাহারে আছি। অবশেষে অনাহারক্লিষ্ট ছেলেমেয়েদের কান্নাকাটি সহ্য করতে না পেরে নদীর পানিতে ভেসে যাওয়া একটা মরা গাধা তুলে এনে তার মাংস রান্না করে খাচ্ছি। কাজেই এটা আমাদের মতো অনন্যোপায় ব্যক্তিদের জন্য হালাল, কিন্তু আপনাদের জন্য হালাল নয়।’ আর্থিক ও শারীরিক এ কথা শুনে হজে যেতে প্রস্তুত ব্যক্তিটি স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভাবলেন, হায়রে, আমি কেমন মুসলমান! আল্লাহর বান্দাদের এমনিভাবে অভুক্ত রেখে হজে গিয়ে আমার কী লাভ হবে? অতঃপর আলী ইবনে মোয়াফেক হজে না গিয়ে তাঁর সঞ্চিত সব টাকা ওই পরিবারের লোকদের দিয়ে দিলেন। ফলে আলী ইবনে মোয়াফেকের হজে যাওয়া হলো না। সেই বছর হজ সম্পন্ন হওয়ার পর আরবের বিখ্যাত বুজুর্গ, আল্লাহর অলি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) খানায়ে কাবায় ঘুমিয়ে ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি স্বপ্নে দেখেন ঊর্ধ্বলোক থেকে দুজন ফেরেশতা অবতরণ করে তাঁর সম্মুখে দাঁড়িয়ে একজন অন্যজনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার কতজন লোক হজ করতে এসেছে?’ অপর ফেরেশতা বললেন, ‘ছয় লাখ।’ প্রশ্নকারী ফেরেশতা আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর মধ্যে কতজনের হজ কবুল হয়েছে?’ অপর ফেরেশতা বললেন, ‘এবার কারও হজ কবুল হয়নি। তবে একজন ব্যক্তির হজ কবুল হয়েছে। দামেস্ক শহরের আলী ইবনে মোয়াফেক, যদিও তিনি হজ করতে আসেননি। আর আলী ইবনে মোয়াফেকের অসিলায় মহান আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের হজের সওয়াব দিয়েছেন, যারা হালাল অর্থ দিয়ে নেক নিয়তে হজ করেছেন।’ এ স্বপ্ন দেখে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-এর ঘুম ভেঙে যায়। তিনি আলী ইবনে মোয়াফেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। তিনি দামেস্কের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সেখানে পৌঁছে তিনি আলী মুচির দ্বারস্থ হলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আলী! আপনি এমন কী কাজ করেছেন, যাতে খুশি হয়ে হজে না যাওয়া সত্ত্বেও মহান রাব্বুল আলামিন আপনার হজ কবুল করেছেন?’ এ মহা আনন্দের সংবাদ শুনে আলী ইবনে মোয়াফেকের জজবা হয়ে যায়। তিনি আল্লাহর এশকে বেহুঁশ হয়ে গড়াগড়ি খেতে থাকেন। হুঁশ ফিরে এলে আলী ইবনে মুয়াফেক হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.)-কে সব ঘটনা খুলে বললেন। অতঃপর হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) আলীকে আরও জানান যে ‘হে আলী! হজের জন্য ৩০ বছরে জমানো টাকা সাত দিনের অনাহারিকে দান করায় মহান আল্লাহ আপনার হজ এমনভাবে কবুল করেছেন যে তিনি আপনার পক্ষে হজ করার জন্য একজন ফেরেশতাকে নিয়োগ করেছিলেন, যে আল্লাহর সন্তুষ্টি মোতাবেক হজ সুসম্পন্ন করেছেন (তাজকেরাতুল আউলিয়া-প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৬৮)।’

এই ঘটনা প্রমাণ করে যে মানব প্রেমের মাঝেই আল্লাহর সন্তুষ্টি নিহিত। রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের মালিক (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন (আবু দাউদ ও তিরমিজি শরিফের সূত্রে মেশকাত শরিফ, পৃষ্ঠা ৪২৩)।’

♦ লেখক : গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews