বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ নিজেদের প্রধান ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন একটি কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যালঘু শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ২১১টি সদস্যসংস্থার উন্নয়ন তহবিল তিন গুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।
ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে নতুন প্রতিষ্ঠানটি ফিফার সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ফিফাই দায়িত্বে থাকবে এবং নতুন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাও তাদের হাতেই থাকবে। পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে হলে ফিফার ৩৭ সদস্যের কাউন্সিল এবং অধিকাংশ সদস্যদেশের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করে। সংস্থাটি জানায়, এফএফইর সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হবে। এর মাধ্যমে ‘ফিফা ফাস্ট ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম’ (এফএফএফপি) নামে নতুন অর্থায়ন প্রকল্পের জন্য ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফিফা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান এ প্রকল্পে তাদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই জশুয়া কুশনারের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটারনাল সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিতে পারে।
তিন গুণ বাড়বে উন্নয়ন অনুদান
পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে আগামী চার বছরে ফিফার উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। নতুন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি সদস্যসংস্থা বিশেষ ও জরুরি প্রকল্পের জন্য ঐচ্ছিকভাবে ২ কোটি ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ পাবে, যা শেয়ার বিক্রির অর্থ থেকে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া নিয়মিত ফিফা ফরওয়ার্ড প্রোগ্রামের অনুদানও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে প্রতিটি সদস্যসংস্থা যেখানে ৮০ লাখ ডলার পায়, সেখানে আগামী চক্রে তা বেড়ে হবে ২ কোটি ডলার। ২০৩১-৩৪ মেয়াদে এ অনুদান বাড়িয়ে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০৩৫-৩৮ মেয়াদে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমানের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি অর্থ পাবে সদস্যদেশগুলো।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, পুরো পরিকল্পনাটি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে এবং তিনি কয়েক মাস ধরে এটি নিয়ে কাজ করছেন।
ফিফার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইনফান্তিনো বলেন, বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী প্রবৃদ্ধির জন্য এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হবে এবং সেখান থেকে অর্জিত আয় বিশ্বজুড়ে আরও সমানভাবে বণ্টন করা সম্ভব হবে।
তিনি এটিকে বিশ্ব ফুটবলে আরও বিস্তৃত উন্নয়ন ও সুযোগ তৈরির একটি উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আগে ব্যর্থ হয়েছিল একই ধরনের উদ্যোগ
বেসরকারি বিনিয়োগ এনে ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্পদ কাজে লাগানোর চেষ্টা ইনফান্তিনোর নতুন নয়। ২০১৮ সালে সৌদি অর্থায়নে পরিচালিত জাপানি প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংকের সহায়তায় ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন পেলে-মেসিকে ছাড়িয়ে ইয়ামালের নতুন ইতিহাস
-6a69b2f669425.jpg)
বর্তমান প্রকল্পে জেপি মরগানের পাশাপাশি ইতালিভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ওপেনইকোনমিকস এবং ব্যান ভেঞ্চার্সের প্রধান নির্বাহী গ্রেগ মাফেইও উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন।
উয়েফার কড়া আপত্তি
ফিফার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সরব হয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। সংস্থাটি মনে করছে, ফুটবলের বাণিজ্যিক সম্পদের মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়া ফুটবলের শাসনব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, ফুটবলের পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর এমন একটি সীমা রয়েছে, যা অতিক্রম করা উচিত নয়। ফুটবলের আত্মা কিংবা এর পরিচালনা ব্যবস্থা বিক্রির বিষয় হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেছে তারা।
সমর্থকদের মধ্যেও বিতর্ক
ফিফার এই পরিকল্পনা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক অ্যান্ডি বার্নহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, বিশ্বকাপ কোনো পণ্য নয় এবং এটি বিক্রির জন্য কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। তার মতে, ফুটবল সব সময়ই সমর্থকদের এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবে।
তবে অনেকের মত ভিন্ন। তাদের মতে, স্পেন ও ফ্রান্সের শীর্ষ লিগসহ বিশ্বের বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থা ইতোমধ্যেই বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে সংখ্যালঘু শেয়ার বিক্রি করেছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে ফিফার পরিকল্পনা নতুন কিছু নয়।
অর্থ সংকটে নয় ফিফা
ফিফা বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে রয়েছে। সর্বশেষ চার বছরের চক্রে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপ থেকে সংস্থাটির আয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে, যা আগের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন বাণিজ্যিক কাঠামো কার্যকর হলে ভবিষ্যতে ফিফার আয় আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের পরিধি আরও সম্প্রসারণ এবং নারী ফুটবলেও বড় ধরনের বিনিয়োগের পথ তৈরি হতে পারে।
এদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস দাবি করেছে, নতুন প্রতিষ্ঠান এফএফইর নেতৃত্বে থাকতে পারেন ইনফান্তিনো নিজেই। যদিও ফিফার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পরিকল্পনা অনুমোদিত হলে নতুন প্রতিষ্ঠানে ফিফার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সভাপতি ও প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।