(পূর্ব প্রকাশের পর)
আজ ১৯৪৭ নিয়ে যে বিতর্ক তুলেছেন স্বয়ং বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সিনিয়র নেতা, সেই বিতর্কের সমাধান বহু পূর্বেই করেছিলেন ঐতিহাসিক বিমলানন্দ শাসমল। তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বাধীন করে দেবার জন্য আমরা ভারতীয়রা কৃতিত্বের দাবি করি এবং শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে সেইজন্য এই সময়ে এশিয়ার মুক্তি সূর্য বলেও অভিহিত করা হোতো। কিন্তু বিনীতভাবে বলতে চাই, যে লোকটির জন্য বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারলো তাঁর নাম মহম্মদ আলি জিন্না। ১৯৪৭ সালের ২০ জুন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা জিন্নার আহ্বহ্বান অগ্রাহ্য করে যদি পাকিস্তানে যোগ না দিতেন এবং ভারতে যোগ দিতেন এবং তারপর দশ-বিশ বছর বাদে যে-কারণে পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন হতে চাইলেন অর্থাৎ ভাষা পার্থক্যের জন্য ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতালাভ করতে চাইতেন, তাহলে শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা বাঙালিরা কি ফুলের মালা দিয়ে পূজা করতাম, না রাস্তায় গুলি করে মারার দাবি জানাতাম? প্রায় একই কারণে শেখ আবদুল্লাকে কত বছর কারাগারে থাকতে হয়েছিল, নিশ্চয়ই সেকথা কেউ ভোলেননি। পাকিস্তানে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে পাকিস্তান পূর্ব বাংলায় যে অত্যাচার করেছিল, আমাদের ভারতবর্ষে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়ে তারপর ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হবার দাবি জানালে ভারতবর্ষ পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি না হোক কম অত্যাচার করতো না।

মিজো-নাগাদের উপর আমরা যে অত্যাচার করে-ছিলাম, পৃথিবীর লোক কোনোদিন সে সংবাদ জানতে পারবে না। এবং ভারতের মত শক্তিশালী দেশের সংগে লড়াই করবার জন্য ক্ষুদ্র পাকিস্তান বা পৃথিবীর কোনো দেশের কার্যকরী সাহায্য পূর্ব বাংলার লোকেরা পেতেন না। ভাগ্যবশত পূর্ব বাংলা পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল, তাই খুব সহজেই স্বাধীন হতে পারলো-না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দূর অস্ত হয়ে থাকতো। সেইজন্যই বললাম, পূর্ব বাংলার মুসলমানরা মহম্মদ আলি জিন্নার ডাকে সাড়া দিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল বলেই সহজে স্বাধীন হোলো। ১৯৪০-এ লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাবে জিন্না একাধিক মুসলমান-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নই দেখেছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে জিন্নার স্বপ্নই সফল হোলো।’ (বিমলানন্দ শাসমল, ভারত কী করে ভাগ হলো, পৃষ্ঠা: ১৬০-১৬১।)

ইতিহাস রচনা ও চর্চায় বাঙালি মুসলমানের আগ্রহ ও দুর্বলতা বরাবরের। ফলে অন্যের ইতিহাস পাঠ ও চর্চা করে সে একটি ঐতিহাসিক মার খেয়েছে বারবার। ঘরে, বাইরে, স্বপ্ন ও চিন্তার জগতেও। এই পর্যুদস্ততা সে বুঝতেও পারে না। ফলে তার স্বাজাত্ম্যবোধ, স্বতন্ত্রতা, সংগ্রাম, শক্তি, বীরত্ব ও আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতনতাও গড়ে ওঠে না। এ কারণে আজকে পশ্চিমবাংলায় হিন্দুত্ববাদের উত্থানকে নিজস্ব অস্তিত্বের প্রশ্নে বিশ্লেষণ করতে অক্ষম। এ কারণে ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বোঝা পড়ার নিরিখে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। স্বার্থের সম্পর্ক সাময়িক কিন্তু আদর্শের সম্পর্ক স্থায়ী।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম স্লোগান ছিল যুদ্ধ বন্ধের। নিজের প্রথম মেয়াদের অভিজ্ঞতা দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় জোরেশোরে বলেছিলেন, ডেমোক্রেটরা সব সময় যুদ্ধ বাঁধিয়েছে, আর আমি যুদ্ধ বন্ধ করেছি। তিনি ক্ষমতায় গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। অথচ সেই প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিপর্যয়কর যুদ্ধে যেতে হয়েছে। কারণ, নির্বাচনে বিজয়ের জন্য তিনি যে ইহুদি লবির আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিলেন, নির্বাচনে বিজয়ের পর তাদের চাপ ব্যক্তিগতভাবে বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ উপেক্ষা করতে সক্ষম হননি। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীরা নির্বাচনে জয় লাভের জন্য মাড়োয়ারি, হিন্দি ভাষী ও গুজরাঠিদের যে সহায়তা নিতে হয়েছে তাকে উপেক্ষা করা পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পক্ষে সম্ভব হবে না। এদের চাপেই একদিন তাকে প্রবল বাঙালি মুসলিম ও বাংলাদেশ বিরোধী রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে। একারণেই এশিয়া গ্রুপের ইন্ডিয়া বিভাগের সভাপতি অশোক মালিক তার এক লেখায় বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় কেবল একটি নির্বাচনী ফলাফল নয়, বরং এটি একটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। এটি গঙ্গা তীরবর্তী পূর্বাঞ্চলে সরকার-বিরোধী মনোভাব, হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দাবির প্রতিফলন; যা আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন রূপ দিচ্ছে।

এ ব্যাপারে বাস্তব দৃষ্টান্ত দিতে ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ-১৮ এর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলের উপরে করা একটি বিশ্লেষণের সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) নথিভুক্ত বর্তমান ভোট শতাংশ অনুযায়ী, বিজেপি ৪৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের ৪০.৯৩ শতাংশ ভোটের চেয়ে চার শতাংশে এগিয়ে রয়েছে। সংখ্যাগতভাবে, এর অর্থ হলো বিজেপি পেয়েছে প্রায় ১.৩৯ কোটি ভোট এবং তৃণমূল পেয়েছে ১.২৬ কোটি ভোট। অর্থাৎ ভোটের ব্যবধান মাত্র ১২ থেকে ১৩ লক্ষ। সাধারণ ধারণা অনুযায়ী, এমন ব্যবধানের ফলে একটি হাড্ডাহাড্ডি বিধানসভা গঠিত হওয়ার কথা। বাংলায় এর ফলে প্রায় ৮৫ থেকে ১০০টি আসনের এক বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। কারণ ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এই নির্বাচনের উপর একটি বড় ছায়া ফেলেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটার বিচারাধীন ছিলেন এবং তাঁদের ভোটাধিকারের জন্য পুনরায় আবেদন করতে হয়েছিল। এমন একটি রাজ্যে যেখানে নির্বাচনী ব্যবধান প্রায়শই খুবই সামান্য থাকে, সেখানে এটি কোনো গতানুগতিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ছিল না। এটিকে একটি ভূকম্পন সৃষ্টিকারী হস্তক্ষেপের মতো মনে হয়েছে।

চূড়ান্ত ভোটের ব্যবধান মাত্র ১২-১৩ লাখের সঙ্গে তুলনা করলে, বাদ পড়া ভোটারদের এই ব্যাপকতা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাদ পড়া ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি কোনো নির্দিষ্ট দিকে ঝুঁকে থাকত, তাহলেও নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক ফলাফলের ওপর তার পরবর্তী প্রভাব ভিন্ন বা ব্যাপক হতে পারত। ২০ থেকে ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার থাকা ১১২ আসনের ১০৬টি গতবার জিতেছিল মমতা বন্দোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। এটিই সেই আপাত-বিরোধিতা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে, যেখানে তুলনামূলকভাবে সামান্য ভোটের ব্যবধানও ভূমিধসের মতো আসন বদলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভারতের বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় ব্লগার ধ্রুব রাঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এ সংক্রান্ত একটি পোস্টে লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গে ২৭ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এরা কোনো ‘মৃত ব্যক্তি’ বা ‘বাংলাদেশি’ ছিলেন না। এরা ছিলেন সত্যিকারের মানুষ, যাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আগেই আবেদন করেছিলেন। এই ভোটারদের আবেদনের শুনানি ট্রাইব্যুনাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন স্থগিত রাখতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। এই নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্ব পর্যন্ত সময়মতো মাত্র প্রায় ১৬০৭ জন ভোটারের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুনানি হওয়া প্রায় প্রতিটি আবেদনই অন্যায়ভাবে নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা বলে প্রমাণিত হয়েছে। যেকোনো কার্যকর গণতন্ত্রে, যেখানে বিপুল সংখ্যক ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার হারিয়েছেন, সেটিকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বলে গণ্য করা যায় না। আমি বলছি না যে, তৃণমূল কংগ্রেসের নাম ফিরিয়ে দেওয়া হলে তারা নিশ্চিতভাবে জিতে যেত, হয়তো বিজেপিও জিততে পারত, কিন্তু প্রশ্নটা এই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন একটি বিস্তৃত পরিসর। দিল্লি-মহারাষ্ট্র-বিহার-বাংলার পর থেকে এই পরিসরের কাঁটাটি ক্রমশই অন্যায্যতার দিকে ঝুঁকেছে। প্রতিবারই বিরোধী দলগুলো কোনো না কোনোভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যথারীতি অংশগ্রহণ করে, এই ভেবে যে নির্বাচন কমিশন, ইডি, সিবিআই ইত্যাদির আপোস সত্ত্বেও তারা জয় ছিনিয়ে আনতে পারবে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর প্রতিবারই তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, কোন পর্যায়ে গিয়ে তারা অনুভব করবে যে, এই অন্যায়ের মাত্রা এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, নির্বাচন বর্জন করা উচিত? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ওই ২৭ লক্ষ আপিলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত টিএমসি’র এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানো উচিত ছিল।

হয়তো অতি আত্মবিশ্বাস কিংবা মুসলিমদের নিয়ে ভোটের ফাঁকা রাজনীতির গ্যাড়াকলে তিনি আটকে গিয়েছেন। সে আলোচনায় আজ যাব না। তবে উল্লিখিত দুটি বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, এই ৯১ লক্ষ বাদ পড়া ভোটার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয় বা যাকে তারা হিন্দুত্ববাদের উত্থান বলে দাবি করছে, তা নির্ধারণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। এটা শুভেন্দু অধিকারী থেকে কেন্দ্রীয় বিজেপি পর্যন্ত জানে। তারা এটাও জানে, এই ৯১ লক্ষ মানুষ পুনরায় ভোটাধিকার পেলে বিজেপিকে আবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে গৈরিক পতাকা গোটাতে হবে। সে কারণে তারা কখনোই এই ৯১ লক্ষ ভোটারকে পুনরায় ভারতীয় ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে দেবে না। হয়তো নানা ঘষামাজার মাধ্যমে বা আদালতের নির্দেশে কিছু মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিলেও সংখ্যা খুব বেশি হবে না। ফলে এই জনগণের ব্যাপারে বিজেপিকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের হাতে একটাই অপশন আছে, বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া। ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ নির্দিষ্ট ক্যাম্পে আটকে রেখে রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর অনুপস্থিতির সময়ে বাংলাদেশে ঠেলেদেয়ার যে কৌশলের কথা আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা বর্ণনা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিকেও হয়তো সেই রাস্তায় যেতে হতে পারে। কিংবা তারা যখন জানে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে পারেনি, রোহিঙ্গাদের ফেরাতে পারেনি, অপ্রিয় হলেও বলা ভালো এই মুহূর্তে ফেরানোর সক্ষমতা নেই, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সার্বিক দুর্বলতা ও খুঁটিনাটি যখন তাদের কাছে দিনের আলোর মত প্রতিভাত তখন রাতের অন্ধকারে কেন, দিনের আলোতেই তারা ঠেলে দিতে সক্ষম এবং সে পথেও এগোতে পারে। অথবা এটাকে কার্ড হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা অনিবার্য ভবিষ্যৎ বাস্তবতা। এটা ঘটবেই কাল অথবা আরেকটু পর। তাই বাংলাদেশকে এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই তার নিজের পথ ও পন্থা নির্ধারণ করে নিতে হবে। (সমাপ্ত)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews