শামস উদ্দিন: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পশ্চিমবঙ্গ অংশ প্রায় ২,২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে এখনও প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত পুরোপুরি বেড়াবিহীন।
দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির রাজনৈতিক বক্তব্যে এই বাস্তবতাকে অনেকটা “বাংলাদেশ-সমস্যা” হিসেবে তুলে ধরা হলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন চিত্র সামনে আনছে। পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্য সরকার সম্প্রতি প্রায় ৬০০ একর জমি বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্টও জমি হস্তান্তরে গতি আনতে হস্তক্ষেপ করেছে। অর্থাৎ, কাঁটাতারের সবচেয়ে বড় জট ছিল ভারতের নিজেদের ভেতরেই: জমি, ক্ষতিপূরণ, মিউটেশন এবং সীমান্তবাসীর আপত্তি।
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা বয়ানে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ অঞ্চলকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। গবাদিপশু, অস্ত্র ও মাদক পাচারের পাশাপাশি কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ ঠেকানোর যুক্তিও সামনে আনা হয়। কিন্তু এই বড় নিরাপত্তা-আখ্যানের নিচে চাপা পড়ে যায় সীমান্তের মানুষের বাস্তব জীবন।
জলপাইগুড়ির দক্ষিণ বেরুবাড়ি তার বড় উদাহরণ। এখানে ১৯ কিলোমিটার সীমান্ত এখনও বেড়াবিহীন থাকার অন্যতম কারণ জমির মিউটেশন-সংক্রান্ত জটিলতা। ছিটমহল বিনিময়ের পর বহু কৃষকের জমির রেকর্ডে এখনও বাংলাদেশের ‘বোদা’ থানার উল্লেখ রয়ে গেছে। তারা ভারতে ভোট দেন, ভারতে কর দেন, কিন্তু জমির আইনি জটিলতার কারণে আজও ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। ফলে প্রশাসন জমি চাইছে, কিন্তু কৃষক আইনি নিশ্চয়তা ছাড়া জমি ছাড়তে রাজি নন।
উত্তর ২৪ পরগণার বনগাঁ ও বসিরহাট অঞ্চলের সংকট আবার ভিন্ন। সেখানে বহু উর্বর কৃষিজমি বিদ্যমান কাঁটাতারের ওপারে পড়ে গেছে। কৃষকদের প্রতিদিন নিজেদের জমিতে যেতে বিএসএফের গেটে পরিচয়পত্র জমা দিতে হয়। কোথাও কোথাও পরিবারগুলো পুনর্বাসনের চেয়ে পৈতৃক ভিটেমাটি আঁকড়ে থাকতে চাইছে। কারণ তাদের কাছে কাঁটাতার শুধু নিরাপত্তা নয়, জীবিকার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রতীকও।
এই বাস্তবতার আরেকটি দিক ভারতীয় মূলধারার মিডিয়ায় খুব কমই আলোচিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তের বড় অংশজুড়ে বহু দশক ধরে গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক সীমান্ত অর্থনীতি। গবাদিপশু পাচার থেকে শুরু করে নানা ধরনের চোরাচালাননির্ভর স্থানীয় স্বার্থগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই সর্বাত্মক কাঁটাতারে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। সীমান্তবর্তী এলাকায় যারা ফেনসিডিল ও ইয়াবা কারখানায় বিনিয়োগ করেছে, তারা কেন চোরাচালানের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে এমন কাঁটাতারের বেড়ার পক্ষে থাকবে? ফলে দিল্লির নিরাপত্তা নীতি, পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় রাজনীতি এবং সীমান্ত অর্থনীতির বাস্তবতার মধ্যে সবসময়ই একটি নীরব দ্বন্দ্ব ছিল।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভৌগোলিক বাস্তবতা। ইছামতী নদীসংলগ্ন এলাকা, চরাঞ্চল, নদীভাঙনপ্রবণ সীমান্ত এবং সুন্দরবনঘেঁষা বহু অঞ্চলে প্রচলিত ধাঁচের কাঁটাতারের অবকাঠামো নির্মাণ প্রযুক্তিগতভাবেও কঠিন। ফলে পুরো সীমান্তকে একই ধরনের “হার্ড বর্ডার” বানানোর রাজনৈতিক বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না।
কিন্তু এই অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো যত সামনে আসছে, ততই কিছু ভারতীয় মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহল বিষয়টিকে “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ” বা “ঢাকার আপত্তি”র ফ্রেমে নিয়ে যেতে চাইছে। এতে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, ক্ষতিপূরণ বৈষম্য এবং সীমান্তবাসীর অসন্তোষ আড়াল করা সহজ হয়। দিল্লির কাঁটাতারে পশ্চিমবঙ্গের যে বাস্তব ক্ষত তৈরি হয়েছে, তার রাজনৈতিক দায়ও তখন সুবিধাজনকভাবে ঢাকার দিকে ঠেলে দেওয়া যায়।
অথচ বাংলাদেশের অবস্থান শুরু থেকেই সংযত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করেছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের প্রশ্ন হলে তা কূটনৈতিক চ্যানেলেই আলোচনা হবে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের বাইরে ভারত নিজস্ব ভূখণ্ডে অনুমোদিত নকশায় বেড়া নির্মাণ করলে বাংলাদেশের আপত্তি নেই। বাংলাদেশের আপত্তি তখনই, যখন দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা উপেক্ষা করে সংবেদনশীল এলাকায় একতরফা পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বাস্তব চিত্রটি তাই “ভারত বনাম বাংলাদেশ” নয়; বরং অনেক বেশি “দিল্লির নিরাপত্তা নীতি বনাম পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবাসীর জীবন-জীবিকা”। সীমান্তে কাঁটাতার হয়তো রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারে, কিন্তু সীমান্তবাসীর আস্থা অর্জন করতে পারে না। সেই আস্থা আসে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, মানবিক পুনর্বাসন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সীমান্তের মানুষকে সন্দেহ নয়, নাগরিক হিসেবে দেখার মধ্য দিয়ে।
লেখক: সদস্য সচিব, স্বাধীনতা সুরক্ষা মঞ্চ
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)