এবিএম ফজলুর রহমান
প্রখ্যাত সাংবাদিক আব্দুল গনি হাজারী, সৈয়দ আসাফ উদ দৌলা সিরাজি, ফজলে লোহানী, কামাল লোহানী, মহানয়িকা সুচিত্রা সেন, উপ-মহাদেশের প্রখ্যাত গীতিকার গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী, ওস্তাদ বারীন মজুমদার, কবি বন্দে আলী মিয়া, অধ্যাপক মনসুর উদ্দিন আহমেদসহ অসংখ্য গুনি সাংষ্কৃতিক ও সাহিত্যিকের জন্মভুমি বৃহত্তর পাবনা।
ব্রিটিশ পরবর্তি শাসনামলপুর্ব এ অঞ্চলে সাহিত্য, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটে। পঞ্চাশের দশকে হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিকতা শুরু করেন। তারই ধারবাহিকতায় ১৯৬১ সালে এক দল সাংবাদিক প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী পাবনা প্রেস ক্লাব। পরবর্তীতে ওই বছরের ৮ ও ৯ মে সারা পূর্বপাকিস্তানের মফস্বল সাংবাদিকদের সমাবেশ হয় পাবনায়। সেখানে মফস্বল সাংবাদিকদের দাবি আদায়ে গঠিত হয় পূর্বপাকিস্তান সাংবাদিক সমিতি।
পাবনার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার গৌরব ও অহংকারের নাম পাবনা প্রেস ক্লাব। আজ ১ মে পাবনা প্রেস ক্লাব পাবনা তথা সারা দেশের মফস্বল সাংবাদিকদের মুখ উজ্জ্বল করে ৬৬ বছরে পা রাখছে। মহান ভাষা আন্দোলন, খাপড়া ওয়ার্ড আন্দোলন, ভুট্টা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পাবনা প্রেস ক্লাবের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এই প্রেস ক্লাবের অন্তত ১২ জন সদস্য সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এ ছাড়া ৫ জন একুশে পদক লাভ করেন।
১৯৬১ সালের ১ মে পাবনা শহরে প্রেস ক্লাবের গোড়াপত্তন ঘটে। সেই থেকে অনেক স্মৃতি, নানা ইতিহাস ও গৌরবময় ঘটনার সঙ্গে পাবনা প্রেস ক্লাবের নাম জড়িয়ে রয়েছে। সারা দেশে সাংবাদিকদের মধ্যে বিভেদ, অনৈক্য ও সাংবাদিকদের একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেও পাবনা প্রেস ক্লাব সে ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এই প্রতিষ্ঠান এখনো দেশের মধ্যে ঐক্যের অন্যন্য নজির। তার বাস্তব উদহরণ বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি গত ৮ এপ্রিল পাবনা প্রেস ক্লাবে এসে সারা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনারা পাবনা প্রেস ক্লাব পরির্দশন করুন ; ভাড়া আমি দেব। আর পাবনা প্রেস ক্লাব কর্তৃপক্ষ আপনাদের আপ্যায়ন করবে। সাংবাদিকদের ঐক্যের নজির কাকে বলে দেখে যান”। একজন তথ্যমন্ত্রীর সরল স্বীকৃতি সারা দেশের সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তা দেয়।
পদ্মা যমুনা বিধৌত এবং ইছামতি নদী তীরে গড়ে উঠা পাবনার জনপদে সাংবাদিকতার সুত্রপাত ঘটে উনিশ শতকের প্রথম দিকে। এ অঞ্চলের বিরাজমান সমস্যা সমাধানে দিক নির্দেশনায়, সৎ বস্তুনিষ্ট ও বলিষ্ঠ লেখনির মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে এবং অসহায় নির্যাতিত মানুষের চালচিত্র নি:শঙ্কভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরার ব্রত নিয়ে সর্বপরি সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীতা অনুভব করেন। সাংবাদিকতায় লালিত এই ঐতিহ্যের ধারায় বিশ শতকের ষাটের দশকের শুরুতে তৃনমূল পর্যায়ের সাংবাদিকতা পেশার স্বীকৃতির দাবীকে সামনে রেখে ১৯৬১ সালের ১ মে পাবনা শহরে স্থাপিত হয় পাবনা প্রেস ক্লাব।
পাবনা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পাক হিতৈষী’র প্রকাশক-সম্পাদক, দৈনিক আজাদ ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অব পাকিস্তানের (এপিপি) এর পাবনা প্রতিনিধি একেএম আজিজুল হক পাবনা প্রেস ক্লাবের প্রথম সভাপতি এবং সংবাদ প্রতিনিধি রণেশ মৈত্র সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ ছাড়া দৈনিক ইত্তেফাকের পাবনা প্রতিনিধি এম আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট চিকিৎসক মেজর (অব.) ডা. মোফাজ্জল হোসেন, লোক শিক্ষক শহীদ মাওলানা কছিমুদ্দিন আহমেদ, ফটোগ্রফার হিমাংশু কুমার বিশ্বাস প্রমুখ অন্যতম প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। বর্তমানে পাবনা প্রেস ক্লাবের সদস্য সংখ্যা ৬২।
এর মধ্যে সম্মানীয় আজীবন সদস্য স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান স্যামসন এইচ চৌধুরী, ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন, সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মাশাল (অব.) একে খন্দকার প্রয়াত হয়েছেন।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু পাবনা প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য রয়েছেন।
পাবনা প্রেস ক্লাবের অতীত ঐতিহ্য ও সোনালি ইতিহাস থাকলেও আজও পাবনা প্রেস ক্লাবের নিজস্ব ভবন হয়নি। পরিত্যক্ত সম্পত্তি ওপর গড়ে উঠা ক্লাবটির শরীরে শীর্ণতা থাকলেও মর্যাদা ও আভিজত্যে এখনও অটুট।
লেখক : সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেস ক্লাব