'চাঁদা' নয় 'সমঝোতা'- সড়কমন্ত্রীর বক্তব্য কী বার্তা দিচ্ছে?

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

টার্মিনালে ঢুকতে ও বের হতে প্রতিটি পরিবহনকে টাকা গুনতে হয়

    • Author,

      সজল দাস

    • Role,

      বিবিসি নিউজ বাংলা

  • এক ঘন্টা আগে

  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

"সাতক্ষীরা থেকে ঢাকা মাল নিয়ে যাতি আড়াইশ কিলোমিটার রাস্তায় ছয় জায়গায় টাকা দিতি হয়। ঘাট দিয়ে গেলি লাইন আগে-পিছে করতি টাকা লাগে। নালি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ায় থাকো। ঢাকায় ঢুকার আগেও টাকা লাগে"।

এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ট্রাক চালক মোসলেহ উদ্দীন।

এটা যে শুধু একজন চালকের বা কোনো ব্যক্তিবিশেষের অভিজ্ঞতা, তেমন নয় বিষয়টা। দেশের অন্যান্য সড়কেও বিভিন্ন হারে চাঁদা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

কোথাও শ্রমিক সংগঠনের নামে, আবার কোথাও মালিক সংগঠন বা অন্য কোনো নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ চলছে বছরের পর বছর ধরে।

যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের একটি নির্দিষ্ট ফি দেওয়া একপ্রকার অলিখিত নিয়ম, যেটি আদায় করা হয় শ্রমিক উন্নয়নের নামে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও সড়কে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন এই খাতের কেউ কেউ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রীবাহী পরিবহনের একজন মালিক বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "রোড ট্যাক্সসহ যাবতীয় ফি দেওয়ার পরও রাস্তায় গাড়ি চালাতে গেলে এই টাকা দেওয়াই লাগে, না হলে চালাতে পারবেন না, টিকে থাকতে হলে সংগঠনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই"।

সড়কে চাঁদাবাজি বাংলাদেশে নতুন নয়। এ নিয়ে নানা সমালোচনা, প্রতিবাদ থাকলেও প্রতিকার নেই। বরং দিনে দিনে এটি 'মিউচুয়াল আন্ডারস্টান্ডিং' হিসেবে স্থায়ী রূপ লাভ করেছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা।

সম্প্রতি পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি নিয়ে দেওয়া একটি বক্তব্যে সমালোচনার মুখে পড়েছেন বাংলাদেশের নতুন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

"সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু টাকা তুললে সেটি চাঁদাবাজি নয়, বরং বাধ্য করলে সেটি চাঁদা"- সরকারের দায়িত্বশীল একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্য এই অপরাধকে বৈধতা দেওয়ার সামিল বলেই মনে করেন অনেকে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, এই বক্তব্য দেওয়ার সময় যাত্রী বা ভোক্তাদের ওপর চাঁদার 'চেইন রিঅ্যাকশন' এর কথা বিবেচনায় রাখেননি সড়ক মন্ত্রী। কারণ পণ্য কিংবা যাত্রী যেকোনো ক্ষেত্রেই চাঁদার অর্থ মূলত শোধ করতে হয় ভোক্তাকেই।

এছাড়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে টাকা তোলাকে শ্রমিক উন্নয়নের লেবাস দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলেও মনে করেন তারা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন তখন তারই মন্ত্রিপরিষদের একজনের চাঁদাবাজি নিয়ে এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক।

১৯শে ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী

ছবির উৎস, SCREEN GRAB

ছবির ক্যাপশান,

১৯শে ফেব্রুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী

কোনটা চাঁদাবাজি

দায়িত্ব গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। এসময় রেল ও নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের দুই প্রতিমন্ত্রীও তার সঙ্গে ছিলেন।

যেখানে পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজি নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মি. আলম বলেন, সড়ক পরিবহনে যেটাকে চাঁদা বলা হয় সেটিকে তিনি চাঁদা হিসেবে দেখছেন না।

কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, মালিক ও শ্রমিক সংগঠন বা সমিতিগুলো নিজেদের কল্যাণে সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু টাকা তোলেন।

এটি তাদের জন্য অনেকটা অলিখিত বিধির মতো। ওই টাকা আবার তাদের নিজেদের কল্যাণেই ব্যয় করা হয় বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি উল্লেখ করেন, চাঁদা ওইটাকে বলা যায়, যা কেউ দিতে চায় না বা তাকে বাধ্য করা হচ্ছে।

উদাহরণ দিয়ে মি. আলম বলেন, "মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তোলে, মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয় তা জানি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে"।

"সমঝোতার ভিত্তিতে তারা এটা করে, সেখানে যে মালিক বা দল ক্ষমতায় থাকে, তারা প্রাধান্য পায়। এটা চাঁদা আকারে দেখার সুযোগ হচ্ছে না, কারণ তারা সমঝোতার ভিত্তিতে করছে। তবে চাঁদাবাজি যদি কেউ করতে আসে, সেই সুযোগ নেই," বলেন তিনি।

মি. আলম বলেন, সড়ক পরিবহন খাতে 'পারস্পরিক বোঝাপড়ার' মাধ্যমে টাকা আদায় করা হলে তাকে চাঁদাবাজি হিসেবে বর্ণনা করা যাবে না।

"মালিকরা যদিও সমঝোতার ভিত্তিতে করে আমরা কথা বলে দেখবো কেউ ডিপ্রাইভড বা বঞ্চিত হচ্ছে কি না এবং সেই অর্থের অপব্যবহার হচ্ছে কি না সেটাও আমরা দেখবো," উল্লেখ করেন তিনি।

তারেক রহমান ও বিএনপির এমপিদের শপথ অনুষ্ঠান

ছবির উৎস, BNP Media Cell

ছবির ক্যাপশান,

দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান বারবার তুলে ধরছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা চলছে বিভিন্ন মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্যের বিপরীতে তার মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্যের এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক কি না এমন প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিবিসি বাংলাকে বলছেন, একদিকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতিবিরোধী জোরালো অবস্থানের কথা বলছেন, অন্যদিকে একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী চাঁদাবাজিকে সরলীকরণ করছেন।

তিনি বলছেন, পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের প্রভাব বহুমাত্রিক। এর সঙ্গে পণ্যের দাম, ভোক্তার ব্য়য় যেমন জড়িত, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছতা এবং সড়ক দুর্ঘটনার সময় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতার বিষয়টিও যুক্ত।

"যেভাবেই আপনি চাঁদাবাজিকে নরমালাইজ করতে চান এর পক্ষে সাফাই দেন আদতে এই দুর্নীতির বোঝা জনগণের ওপর গিয়েই পড়ে। বক্তব্য দেওয়ার সময় মন্ত্রী অন্য স্টেকহোল্ডারদের কথা বিবেচনায় নেননি" বলেই মনে করেন মি. ইফতেখারুজ্জামান।

এছাড়া সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেটি ক্ষমতাসীন দলের সংস্কার ও নিজেদের শুদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তাকেই আবারও সামনে এনেছে বলেও মনে করেন তিনি।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের উদাহরণ টেনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলছেন, পরিবহন সেক্টরের নানা অনিয়মের কারণেই ২০১৮ সালে আন্দোলনে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। যার রেশ ২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানেও ছিল।

সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে বার্তা দিতে চাইছেন তার সঙ্গে মন্ত্রীর বক্তব্য সাংঘর্ষিক বলেও উল্লেখ করে মি. ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, "প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন তার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তারই একজন মন্ত্রীর বক্তব্য সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে"।

শাসক দলের নির্বাচনি ইশতেহার যে ফাঁকা বুলি নয় তার প্রমাণ তাদেরকেই রাখতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ে খাদ্য পণ্যের দামেও

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির প্রভাব পড়ে খাদ্য পণ্যের দামেও

চাঁদার বৈধতা দেওয়া হচ্ছে?

টার্মিনাল কর্তৃপক্ষের ফি, কাউন্টারের ব্যয়, পরিবহনের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তারক্ষীদের বেতন, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল, মসজিদের খরচসহ নানান খাত দেখিয়ে পরিবহনখাতে প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় করা একটি সরকারি তদন্ত অনুসারে, কেবল ঢাকা শহরেই ৫৩টি পরিবহন টার্মিনাল এবং স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি টাকা চাঁদাবাজি করা হয়, যা প্রতি মাসে প্রায় ৬৭ কোটি টাকা এবং কখনো কখনো ৮০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়।

পরিবহন খাতে চাঁদা আদায়কে সমঝোতা বা অলিখিত বিধি হিসেবে বর্ণনা করার মাধ্যমে অনিয়মকে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে। মন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সমালোচনা চলছে সামাজিক মাধ্যমেও।

এই টাকা সাধারণ শ্রমিক-চালকদের জন্য নাকি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যয় হচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে তুলে ধরারও আহ্বান জানিয়েছেন কেউ কেউ।

সমঝোতার ভিত্তিতেই হোক আর যেভাবেই বলা হোক না কেন, সড়কে এভাবে চাঁদা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে মনে করেন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান।

এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, "সড়ক ব্যবহারের জন্য মানুষ ট্যাক্স দিচ্ছে, টোল প্লাজায় টোল দিচ্ছে, যা সরকার পাচ্ছে। তাহলে সড়কে দাড়িয়ে আলাদাভাবে কেন টাকা নেওয়া হবে?"

"একদিকে সাধারণ মানুষ ট্যাক্স দিচ্ছে, অন্যদিকে সড়কে যে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে সেটিও যাত্রী বা ভোক্তাদের কাছ থেকেই বাড়তি ভাড়া বা পণ্যের বাড়তি মূল্য দিয়ে তুলে নেওয়া হচ্ছে, এটি তো হতে পারে না," বলেন তিনি।

এছাড়া অলিখিত অর্থের হিসেব সামনে আনা হয় না বলে এর আয়-ব্যয়ের বিষয়েও কারো ধারণা থাকে না। কাজেই এই অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

মি. হাদিউজ্জামান বলছেন, "টার্মিনাল থেকে শুরু করে সড়ক, ফেরিঘাটসহ নানা জায়গায় নানা নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে কিন্তু এর কোনো হিসাব নাই"।

এক্ষেত্রে শ্রমিক বা মালিকদের কল্যাণের জন্য আলাদা ফান্ড তৈরির প্রয়োজন হলে সরকারের সেই ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলছেন, "পরিবহন মালিকরা রোড ট্যাক্স দিচ্ছেন। প্রয়োজন হলে ওই ট্যাক্সের সাথে এই কল্যাণ ফান্ডের টাকা যুক্ত করেন, তাহলো তো সরকারের আয় হয়, সঠিক মানুষ সহায়তা পায় আবার আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ্ব হিসাবও থাকবে"।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews