সাধারণ মাথাব্যথা বা মাইগ্রেন ভেবে রোগ পুষে রাখার প্রবণতাই দেশের যুবকদের ঠেলে দিচ্ছে ব্রেইন টিউমারের বড় ঝুঁকিতে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন চিকিৎসা- গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্তদের প্রায় ৬০ শতাংশই পুরুষ যাদের ৪২ শতাংশের বয়সই ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। সবচেয়ে কর্মক্ষম এই জনগোষ্ঠী সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না করায় শেষ মুহূর্তে এসে পরিবারগুলো চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রায় নিঃস্ব হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা ।
বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনস এবং দেশের টার্শিয়ারি হাসপাতালগুলোর সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার মানুষ নতুন করে ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে আক্রান্তদের বড় অংশই এমন বয়সী, যখন একজন মানুষ তার ক্যারিয়ার বা সংসারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে থাকেন। ঘরের মূল উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এই জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় শত শত পরিবার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যায়।
চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ব্রেইন টিউমার রোগীদের নিয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, তীব্র মাথাব্যথা (৭২%) এবং বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া (৬০%) ছিল রোগীদের প্রাথমিক প্রধান লক্ষণ। এছাড়া প্রায় ৪৮ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে খিঁচুনি এবং ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে চোখে ঝাপসা দেখার সমস্যা দেখা গেছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, কপালে বা মস্তিষ্কের সামনের অংশে (ফ্রন্টাল কনভেক্সিটি) টিউমার হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় ৩২ শতাংশ।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মো. মাজেদ সুলতান বলেন, ‘আমাদের কাছে আসা ব্রেইন টিউমার রোগীদের একটি বড় অংশই যুবক এবং পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এই বয়সের রোগীরা সাধারণত তীব্র মাথা ব্যথাকে কাজের চাপ, মাইগ্রেন বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা ভেবে অবহেলা করেন এবং মাসের পর মাস পেইনকিলার খেয়ে রোগটি পুষে রাখেন। ফলে একদম শেষ মুহূর্তে যখন তারা আমাদের কাছে আসেন, ততক্ষণে টিউমারটি অনেক বড় হয়ে যায়, যা চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি এবং খরচ দুই-ই অনেক বাড়িয়ে দেয়। তবে আশার কথা হচ্ছে, আক্রান্তের বয়স ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও আধুনিক অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হলে সেক্ষেত্রে সুস্থতার হার অনেক বেশি।
চমেক হাসপাতাল প্রদত্ত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সময়মতো রোগ নির্ণয় করে অস্ত্রোপচার করা রোগীদের মধ্যে ৮৪শতাংশই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকগণ আরও আশার কথা জানিয়েছেন যে বর্তমানে চট্টগ্রামেও অত্যন্ত দক্ষ ও তরুণ নিউরোসার্জনরা জটিল সব অপারেশন সফলভাবে সম্পন্ন করছেন। প্রসঙ্গত দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ হাজার ব্রেইন টিউমার সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ নিউরোসার্জন ডা. মো. মাজেদ সুলতান বলেন, ‘ব্রেইন টিউমার মানেই অবধারিত মৃত্যু, এই ধারণা এখন ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে চমেক হাসপাতালেই এখন অত্যন্ত আধুনিক অস্ত্রোপচার হচ্ছে। যুবকদের প্রতি আমাদের পরামর্শ, ঘুম থেকে ওঠার পর তীব্র মাথাব্যথা, ঘন ঘন বমি বমি ভাব, খিঁচুনি কিংবা দৃষ্টিশক্তির আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত নিউরো সার্জনদের শরণাপন্ন হোন। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে জীবন এবং পরিবার- দুটোই রক্ষা করা সম্ভব।’
বিশ্ব ব্রেইন টিউমার দিবস আজ
আজ ৮ জুন (সোমবার), বিশ্ব ব্রেইন টিউমার দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ’। ব্রেইন টিউমার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী দিবসটি প্রতিবছর পালিত হচ্ছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জার্মান ব্রেইন টিউমার অ্যাসোসিয়েশন নামের দাতব্য সংস্থার উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। সারাদেশের মতো চট্টগ্রামেও নানা আয়োজনে দিবসটি পালিত হবে। এ উপলক্ষে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসকদের সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও র্যালি বের করা হবে।
পূর্বকোণ/নুসরাত