অর্থনীতি, পরিবেশ ও সমাজের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারকারী বিশাল বিনিয়োগ ও জটিল কাঠামোর উদ্যোগগুলোই মেগা প্রকল্প। পদ্মা সেতু এবং ঢাকা মেট্রোরেলের মতো অবকাঠামো এর চমৎকার উদাহরণ; যা দেশীয় যোগাযোগের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশের মেগা প্রকল্পের গুরুত্ব বৃহৎ পরিসরের। এ উদ্যোগগুলো সাধারণত পরিবহন, জ্বালানি ও স্বাস্থ্যখাতে নেওয়া হয়। সড়ক ও রেলপথের প্রসারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভ্রমণের সময় ও খরচ কমায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পগুলো দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়ক। বর্তমানে ঢাকা শহরের জন্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাসহ নানাবিধ জটিলতার কারণে গৃহীত প্রকল্পগুলো নির্ধারিত মেয়াদে শেষ হতে পারছে না। ফলে প্রতিনিয়তই প্রকল্পের খরচ বাড়ছে। একই সাথে গণভোগান্তিও পিছু ছাড়ছে না।
দেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে অচলাবস্থা নতুন কিছু নয় বরং এ সমস্যা এখন রীতিমত স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। সর্বোপরি আমাদের দেশের প্রকল্পগুলোতে ধীরগতি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা, যার পেছনে মূলত দায়ী দুর্বল ব্যবস্থা ও সম্ভাব্যতা যাচাই, দুর্নীতি, নকশায় ত্রুটি এবং ঠিকাদারদের মন্থরগতি ও লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা। সরকারি টাস্কফোর্স রিপোর্ট অনুযায়ী, বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের খরচ ও সময় বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত। প্রকল্পের সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সাধারণ জনজীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। মূলত, প্রায়শই বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন না করেই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ফলে কাজের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে নকশা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক সময় মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বাড়িয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়, যা মেগা দুর্নীতির বড় একটি উৎস হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন বিদেশী ও স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের অভাব, সেসাথে প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ধীরগতি দেখা দেয়। সময়মতো প্রকল্প শেষ না হলে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় শুরু হয় না। ফলে অনেক প্রকল্পে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ সৃষ্টি হয়। একটি বৃহৎ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা প্রায় কয়েকশো’ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা ম্লান করে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা প্রয়োগ করা জরুরি। একই সাথে বন্ধ করতে হবে দুর্নীতি ও লুটপাট।
একথা কারো অজানা নয় যে, আমাদের দেশে মেগা প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতা একটি অন্যতম বড় জাতীয় সমস্যা। সরকারি টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৬৮% বেড়ে যায়, যার পেছনে মূল কারণ ছিল ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই, অতিমূল্যায়ন, এবং দুর্নীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠিকাদারদের সাথে অস্বচ্ছ চুক্তি, নকশা পরিবর্তনের অজুহাতে বাজেট বাড়ানো এবং কাজ না করেই বিল তুলে নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে দেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সরকারের আয়ের একটি বড় অংশ শুধুমাত্র এ বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ ও সুদ পরিশোধেই চলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে The Business Standard এর খবর থেকে জানা যায়, অতিব্যয় ও দুর্নীতির ঝুঁকি কমাতে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ বা রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ফেরাতে সরকার অনেক সময় বিভিন্ন তদন্ত কমিশন ও টাস্কফোর্স গঠন করে।
সার্বিক দিক বিবেচনায় একথা দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দেশের সব মেগা প্রকল্প একইভাবে রোগাক্রান্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্যতম মেগা অবকাঠামো ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মেগা-ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। বিদেশী ঋণে ১৬ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা খরচের এ মেগা প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ এখন সাত বছর আগের এক ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার বেড়াজালে বন্দী। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, নকশাগত ত্রুটি, ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদের প্রায় ৮৯ শতাংশ সময় অতিক্রম হলেও ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং অর্থ ব্যয় হয়েছে ২৬ দশমিক ১৩ শতাংশ। প্রকল্পটির ওপর ইএসিআর সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ছয় ধরনের পরামর্শকের পেছনে খরচ হবে ৩৫৩ কোটি ১৮ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রায় ২৪৭ কোটি ৬২ লাখ ২১ হাজার ৭৩.১২ টাকার তিনটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম রয়েছে। যা প্রকল্পের লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাটের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রকল্প সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকা এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও নির্বিঘ্নভাবে পরিচালনার সুবিধা সৃষ্টি করা, মহাসড়কের উভয় পাশে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণের মাধ্যমে স্থানীয় যানবাহন ও ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে সাসেক করিডোর, বিমসটেক করিডোর ও সার্ক করিডোরের সাথে সংযোগ জোরদার করে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি একনেক সভায় ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বয়স্ক, নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের (EWCD) জন্য উপযোগী অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ মহাসড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সড়ক দুর্ঘটনা ও সড়কজনিত ঝুঁকি কমিয়ে আনা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় বছরে প্রকল্পটি সমাপ্ত করা। এই প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণ রয়েছে ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি ৬৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের জোগান দেয়ার কথা।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ঢাকা (কাঁচপুর) থেকে সিলেট পর্যন্ত ২০৯.৩২৮ কিলোমিটার দুই লেন-বিশিষ্ট মহাসড়ক (এন-২) চার লেনে উন্নীতকরণ, চার লেন-বিশিষ্ট মহাসড়কের উভয় পাশে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য ৫.৫ মিটার প্রস্থে পৃথক সার্ভিস লেন নির্মাণ, ৬৬টি সেতু নির্মাণ, ৩০৫টি কালভার্ট নির্মাণ, সাতটি ফ্লাইওভার বা ওভারপাস নির্মাণ, ছয়টি রেলওভার ব্রিজ, ৩৭টি ইউটার্ন, আটটি রাউন্ড এবাউট এবং ২৬টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ এসব প্রকল্পের আওতাভুক্ত রয়েছে। কিন্তু প্রকল্পগুলোর আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে চলমান প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ।
সমীক্ষার তথ্যে দেখা গেছে, সাত বছর আগে সম্পাদিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সাথে বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির কোনো মিল নেই এমন নকশা দিয়ে প্রকল্পটি শুরু করা হয়। নকশা প্রণয়নের সময় প্রকল্প এলাকার ভূপ্রকৃতি ও মাটির নিচের গভীর বৈশিষ্ট্য (Sub-soil) সঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি। ফলে কাজ শুরু করতে গিয়ে সড়ক এলাইনমেন্টে ক্ষতিকর স্লাজ ও অর্গানিক সয়েলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এখন নতুন করে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত, অতিরিক্ত সাব-সয়েল টেস্ট ও গ্রাউন্ড ইম্প্রুভমেন্টের কাজ করতে গিয়ে মূল নির্মাণকাজের গতি পুরোপুরি শ্লথ হয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সময় কৃষিজমি হিসেবে থাকা অনেক জমি এখন বাণিজ্যিক বা আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে জমির মালিকরা সরকারের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ মানতে রাজি হচ্ছেন না এবং আদালতের আশ্রয় নিচ্ছেন।
আইএমইডি বলছে, নির্মাণ ঠিকাদারদের কাজ করার জন্য যে ন্যূনতম ফাঁকা জায়গা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এর প্রধান কারণগুলো হলো : এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ (৩১৯.১৫ একর)। জমির বাস্তব শ্রেণি পরিবর্তন হওয়ায় মালিকপক্ষের আপত্তি ও আইনি মামলার কারণে চূড়ান্ত জমি হস্তান্তর আটকে আছে। তিতাস গ্যাস পাইপলাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি মাত্র ০.৭৮ শতাংশ, জালালাবাদ গ্যাসের ১৫.৬৮ শতাংশ এবং বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরের অগ্রগতি ৪৬.২০ শতাংশ। আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতার কারণে এই দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
পর্যবেক্ষক সংস্থা ইএসিআর সার্ভিস বলছে, প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে চার লেনের মহাসড়ক, উভয় পাশে সার্ভিস লেন, ৬৬টি সেতু, ৩০৫টি কালভার্ট, ফ্লাইওভার ও ফুটওভার ব্রিজ। অথচ সাড়ে পাঁচ বছরে মূল সড়কের অগ্রগতি মাত্র ১১.৫০ শতাংশ, সার্ভিস লেনের ১৬.৩৩ শতাংশ, সেতুর ৩১.১৪ শতাংশ এবং কালভার্টের ৫৮.৭৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। এদিকে বেশিরভাগ নির্মাণসামগ্রীর মান ঠিক থাকলেও কিছু সেকশনে রিজিড পেভমেন্টের কনক্রিটের সংকোচন শক্তি নির্ধারিত নকশা মানদণ্ডের নিচে পাওয়া গেছে; যা মহাসড়কের স্থায়ীত্বের জন্য বড় হুমকি। ইএসিআর সার্ভিসের সরেজমিনের তথ্য বলছে, নির্মাণাধীন সড়কে তীব্র যানজট ও ধুলোবালুর কারণে স্থানীয় জনগণের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী পরিধানে অনীহা এবং পর্যাপ্ত সেফটি ব্যারিয়ার বা সাইনেজের অভাবে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
প্রকল্পের ধীরগতির জন্য দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও কম দায়ী নয়। এডিবির গাইডলাইন অনুসারে দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই তিন থেকে সাড়ে ছয় মাস অতিরিক্ত সময় নষ্ট হয়েছে। এমনকি দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি সম্পাদনে ১১ থেকে ১৯ মাস পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে। এছাড়া ঠিকাদারদের আর্থিক তারল্য সংকট ও দুর্বল সাইট ব্যবস্থাপনাও দৃশ্যমান। আর প্রশাসনিক জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে বড় দুর্বলতা। প্রকল্পের অধীনে উত্থাপিত ১৯টি অডিট আপত্তির মধ্যে ১৫টিই এখনো অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরেই প্রায় ২৪৭ কোটি ৬২ লাখ ২১ হাজার ৭৩.১২ টাকার তিনটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম রয়েছে।
পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠান ইএসিআর সার্ভিসের প্রকল্পটি সম্পর্কে বলছে, ছয় বছরের প্রকল্প, সাড়ে পাঁচ বছরে অগ্রগতি সামগ্রিকভাবে আশাব্যঞ্জক নয়। প্রকল্প মেয়াদের ৮৯ শতাংশ সময় অতিক্রান্ত হলেও ভূমি অধিগ্রহণ ও অবমুক্তির হার মাত্র ৩৭.৬১ শতাংশ, পাশাপাশি বৈদ্যুতিক লাইন স্থানান্তরে ৪৬.২০ শতাংশ, তিতাস গ্যাসের ০.৭৮ শতাংশ এবং জালালাবাদ গ্যাসের ১৫.৬৮ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। এ ধীরগতির কারণে ঠিকাদারদের পর্যাপ্ত ‘ওয়ার্কিং উইন্ডো’ প্রদান করা সম্ভব হয়নি; যা এ মেগা প্রকল্পের কাক্সিক্ষত গতি অর্জনের মূল অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এছাড়া সাত বছর আগে করা সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সাথে বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্যতা বড় দায়ী। পাশাপাশি ক্ষতিকর কাদা ও ভারবহনে অনুপযুক্ত মাটির (Sludge & Organic Soil) উপস্থিতি, নকশাগত জটিলতা, এডিবির গাইডলাইন অনুযায়ী দরপত্র প্রক্রিয়াকরণে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং ঠিকাদারদের অভ্যন্তরীণ আর্থিক তারল্য সংকট ও দুর্বল সাইট ম্যানেজমেন্টও প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত করার ক্ষেত্রে সমানভাবে দায়ী।
সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, জমি অধিগ্রহণ একটা বড় ধরনের জটিলতার বিষয়। জমি অধিগ্রহণের কারণেই প্রকল্পটি এতটা বিলম্বিত হয়। সরকার পরিবর্তনের পর জমি অধিগ্রহণ নিয়ে পদক্ষেপ নেয়ায় প্রকল্পটি এখন নতুন করে গতি ফিরে পেয়েছে। কারণ প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ দ্রুতই শেষ হবে। তারা বলছেন, যে সময় আছে তাতে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে না। তাই সময় বাড়ানোর প্রয়োজন।
মূলত, অবক্ষয়, দুর্নীতি, অনিয়ম, লুটপাট ও উদাসীনতা আমাদের রাষ্ট্রাচারের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। তাই সরকারি কোনো কাজই স্বাভাবিক গতিতে হচ্ছে না বরং নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এজন্য মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা মোটা দাগে দায়ী। আর এ শনির আছর থেকে মুক্ত থাকেনি আমাদের দেশের মেগা প্রকল্পগুলো। কোনো প্রকল্পই নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হওয়ার রেকর্ড কালেভদ্রেও দেখা যায় না।
তাই সরকারি মেগা প্রকল্পগুলোকে দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতা মুক্ত করতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে। তড়িঘড়ি কোনো প্রকল্প গ্রহণ না করে সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় ব্যয় ও প্রকল্পের সময় নির্ধারণ করতে হবে অতি সতর্কতার সাথে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আনতে হবে জবাবদিহিতার আওতায়। প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। অন্যথায় মেগা প্রকল্পগুলোর অচলাবস্থা দূর করা যাবে না।
www.syedmasud.com